‘আত্মরক্ষার্থে গুলি’ সন্দেহজনক: সিনহা হত্যা নিয়ে সাবেক আইজিপিদের অভিমত

প্রকাশিত: ২৮ অগাস্ট, ২০২০ ১০:১৯:৩৮

‘আত্মরক্ষার্থে গুলি’ সন্দেহজনক: সিনহা হত্যা নিয়ে সাবেক আইজিপিদের অভিমত

কক্সবাজারের টেকনাফে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান নিহতের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা যেসব বক্তব্য দিয়েছেন তা সন্দেহজনক- এমন মন্তব্য সাবেক আইজিপিদের। দেশের একটি শীর্ষ দৈনিককে দেয়া সাক্ষাৎকারে তারা জানান- অভিযুক্তদের কেউ কেউ বলেছেন, আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানো হয়েছে। তাদের এ বক্তব্যে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এ ধরনের আরও ঘটনা ঘটছে। তাই পুলিশ বাহিনীতে শুদ্ধি অভিযান চালানো জরুরি। যেসব ব্যক্তির কারণে পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ ব্যক্তির দায় কোনো বাহিনী নিতে পারে না। হত্যার ঘটনায় ফৌজদারি এবং প্রশাসনিক যে তদন্ত হচ্ছে সেই তদন্ত কাজে সবার সহযোগিতা করা উচিত বলেও মনে করেন সাবেক পুলিশ প্রধানরা।

সিনহা হত্যার ঘটনাটি একটি ফৌজদারি অপরাধ বলে মনে করছেন সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ নুরুল হুদা। তিনি বলেন, মামলা হয়েছে। তদন্ত হচ্ছে। কিছু কর্মকর্তা আইনবিরোধী কাজ করেছেন বলে সন্দেহ আছে। আদালতের মাধ্যমে এ সন্দেহ দূর করতে হবে। যারা দোষী তাদের সবাইকে দ্রুত সময়ের জন্য বিচারের আওতায় আনতে পারলেই পুলিশের ভাবমূর্তির জন্য ভালো হবে। তিনি বলেন, যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সিনহার সহকর্মী শিপ্রার ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও ছড়িয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। আত্মরক্ষার্থে সিনহাকে গুলি করা হয়েছে বলে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা প্রচার করলেও এখন দৃশ্যত সেরকম মনে হচ্ছে না। পুলিশের বক্তব্য যে সঠিক ছিল তা তাদের আদালতেই প্রমাণ করতে হবে। তিনি বলেন, মেজর সিনহাকে যখন গুলি করা হয়, তখন তার সঙ্গে কেউ ছিল না। তার সহকর্মী সিফাতকে আগেই পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়। মেজর সিনহার সঙ্গে যদি অস্ত্র থেকেও থাকে তাহলে তার একার পক্ষে এত অস্ত্রধারী পুলিশ সদস্যকে মোকাবেলা করা সম্ভব ছিল না। তাই সন্দেহের তীর পুলিশের দিকেই যায়। তিনি বলেন, ব্যক্তির দায় প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপানো ঠিক নয়। কারণ, প্রতিষ্ঠান কাউকে অপকর্ম করতে বলেনি। তবে প্রতিষ্ঠানকে এমন ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে।
নুরল হুদা বলেন, যে কোনো প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিকভাবে চলতে হলে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ ব্যবস্থা কার্যকর থাকা উচিত। পুলিশের জন্য এটা খুবই জরুরি। কারণ তাদের হাতে অনেক ক্ষমতা। যখন যেখানে যতটুকু প্রয়োজন তখন সেখানে ততটুকু ক্ষমতাই প্রয়োগ করতে হবে। কিন্তু কিছু কিছু পুলিশ সদস্য মাঝে মধ্যেই এর ব্যত্যয় ঘটান। তিনি বলেন, সিনহা হত্যায় ফৌজদারি মামলার তদন্তের পাশাপাশি প্রশাসনিকভাবে একটি তদন্ত হচ্ছে। ওই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেই ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’র বিষয়টি বেরিয়ে আসতে পারে। তিনি বলেন, পুলিশের যারাই দুর্নীতি-অপকর্মে জড়িত তাদের সবার বিরুদ্ধেই যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। যেখানে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন সেখানে তা নিতে হবে। বিভাগীয় ব্যবস্থায় কাজ না হলে ফৌজদারি আইনের আওতায় আনতে হবে। তিনি আরও বলেন, সিনহা হত্যার ঘটনাটি যে একটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সে বিষয়ে জোর সন্দেহ রয়েছে। কিন্তু আদালতে বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সেটি প্রমাণ করতে হবে।


কিছু অফিসার ‘দানবে’ পরিণত হয়েছে

সাবেক আইজিপি আবদুল কাইয়ুম বলেন, সিনহা হত্যার ঘটনাটি অত্যন্ত গর্হিত। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড একবার শুরু হলে এর লাগাম টেনে ধরা খুব মুশকিল। খারাপ লোক মারলাম, কি ভালো লোক মারলাম- এটা বড় কথা নয়। যে কাজটি হয়েছে সেটি অবৈধ। এটি একটি জঘন্য ও বিরাট অপরাধ। আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যে ধারণা তৈরি হয়েছে সেটি মস্ত বড় ভুল ধারণা। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড যখন সীমা লঙ্ঘন করে তখন এর রাশ টেনে ধরা যায় না। সিনহা হত্যার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। কিছু কিছু পুলিশ অফিসার দানবে পরিণত হয়েছে। তারই পরিণতিতে এ ঘটনা। সুতরাং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড একেবারে বন্ধ করা এখন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জিরো টলারেন্স (শূন্যসহিষ্ণু) নীতির কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা কার্যকর করা হয়নি। সিনহা হত্যার ঘটনাটি শুধু গণতন্ত্র ও মানবতার বিরুদ্ধেই নয়, এটি পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তিকে কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ন করেছে। শুধু একটি ঘটনাই নয়, এরকম বহু ঘটনা আছে। অন্য ঘটনাগুলো রাজনৈতিক কারণে সামনে আসেনি। মেজর সিনহা সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য হওয়ায় বিষয়টি সবার নজর কেড়েছে।
আবদুল কাইয়ুম বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান নয়। এটা দানব সৃষ্টি করে। পরে সে দানবকে আর নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তিনি বলেন, সিনহা হত্যার ঘটনায় শুরুতে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের লক্ষ্য করে সিনহা অস্ত্র তাক করেছিলেন। তাই আত্মরক্ষার জন্য তারা (অভিযুক্ত পুলিশ) গুলি ছুড়েছে। কিন্তু তাদের এ বক্তব্যকে ঘিরে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। কারণ আত্মরক্ষার জন্য গুলি করলে এক-দুটি গুলিই যথেষ্ট ছিল। তাই জড়িত পুলিশ সদস্যদের বক্তব্যকে বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। অতীতে আমরা দেখেছি, সেখানে একজন কাউন্সিলরকে কিভাবে হত্যা করা হয়েছে? অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা আবদুল কাইয়ুম বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর সিনহার সহকর্মী, সিনহার ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করে পুলিশ একটি জঘন্য গর্হিত কাজ করেছে। এটা কোনো নিয়মনীতিতে পড়ে না। পুলিশের এ আচরণ কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তারা রক্ষক। তারা নিরপেক্ষ থাকবে। কিন্তু সারা দেশে বাহিনীর কিছু কিছু পুলিশ সদস্যের আচরণে মনে হচ্ছে, তারা একটি পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তিনি বলেন, সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তার কোনোটিই সঠিকভাবে হয়নি। তাদের কাজগুলো রহস্যে ঘেরা। যারা এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা উচিত বলে মনে করেন আবদুল কাইয়ুম। পুলিশে যেসব নিবেদিতপ্রাণ কর্মী রয়েছেন তাদের স্বার্থেই সিনহা হত্যায় দোষীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
তিনি আরও বলেন, কিছু লোকের জন্য পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হোক এটা কাম্য নয়। তাই বাহিনীতে এখনই শুদ্ধি অভিযান চালানো জরুরি হয়ে পড়েছে। বাহিনীতে আমূল সংস্কার আনতে হবে। প্রত্যেকটি কাজের জন্য পুলিশ সদস্যদের জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকতে হবে। পুলিশ বাহিনীতে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ নষ্ট হয়ে গেছে। তাই সবার আগে এটা ফিরিয়ে আনতে হবে। এ ব্যবস্থা দৃশ্যমান হতে হবে। অন্যায় করলে শুধু তাকে ক্লোজ বা সাময়িক বরখাস্ত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, পুলিশ কোনো অন্যায় করলে তারা তা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করবেই। এ জন্য পুলিশের ওপর নজরদারি রাখতে অন্য সংস্থাকে নিয়োজিত রাখতে হবে।


সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ বলেন, সব প্রতিষ্ঠানই আইনকানুন ও বিধিবিধানের মধ্যে চলে। এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই যেখানে সবাই ভালো বা সবাই খারাপ। কেউ বেআইনি কাজ করলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার বিধান রয়েছে। সিনহা হত্যার বিষয়ে প্রশাসনিক অনুসন্ধানের পাশাপাশি ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত হচ্ছে। যারা দোষী প্রমাণিত হবে, তাদের নিশ্চয়ই শাস্তি হবে। তিনি বলেন, অন্য কোনো সার্ভিসে কোনো সদস্য অপকর্ম করলে প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা হয় না। কেবল পুলিশের কেউ অন্যায় করলে এর দায়িত্ব বাহিনীর ওপর চাপানোর অপচেষ্টা করা হয়। এটা ঠিক না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জনগণকে নিয়েই পুলিশকে কাজ করতে হয়। অনেক চাপের মধ্যে তাদের কাজ করতে হয়। তাদের কাজের ‘টাইম ফ্রেম’ নেই। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়। তাই তাদের মধ্যে ভুলভ্রান্তি হতেই পারে। সবাই মিলে কাজ করলে ভুলভ্রান্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত যেসব তথ্য জানতে পারছি, তা বেশির ভাগ গণমাধ্যম থেকে। আসলে প্রকৃত ঘটনা কী হয়েছিল, তা তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই জানা যাবে। পুলিশকে অস্ত্র দেয়া হয়েছে গুলি করার জন্য। কিন্তু গুলি কখন কোন অবস্থায় কীভাবে করা হবে, তার প্রশিক্ষণও দেয়া হয়েছে। মানুষের জানমাল রক্ষায় পুলিশ গুলি করতে পারে। প্রতিপক্ষ যদি পুলিশের ওপর গুলি ছোড়ে, গুলি করতে উদ্যত হয়, তখন পুলিশের গুলি করা ঠিক আছে। মেজর (অব.) সিনহার ঘটনায় কী ঘটেছিল, তা আমার কাছে এখনও পরিষ্কার নয়। পুলিশ যদি প্রকৃত অর্থে আত্মরক্ষার জন্য গুলি করে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা ডিফেন্স করার সুযোগ পাবেন। না হলে তাদের ডিফেন্সের সুযোগ কম।

সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক বলেন, মেজর (অব.) সিনহার এ অস্বাভাবিক মৃত্যু আমরা কেউ কামনা করি না। গোটা জাতি এতে মর্মাহত। এ মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করে জড়িতদের যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক- এটা সবাই চান। এক্ষেত্রে কারও আপস করার সুযোগ নেই। আদালতের নির্দেশে যে মামলা হয়েছে এর তদন্ত যেন সঠিক ও নিরপেক্ষভাবে হয়, সেটি প্রত্যাশা করি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে উচ্চ পর্যায়ের যে কমিটি হয়েছে সেই কমিটি যেন বাধাহীনভাবে তদন্ত করতে পারে সেজন্য সবাইকে সহায়তা করা উচিত। সত্য ঘটনা বের করতে হলে অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। তিনি বলেন, সিনহা হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিছু কিছু মিডিয়ায় মনগড়া অনেক প্রতিবেদন প্রচার বা প্রকাশ করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও অনেক ভিত্তিহীন তথ্য পরিবেশন করা হয়েছে। এসব তথ্য পরিবেশন না করাই ভালো। একটি তদন্তাধীন বিষয়ে এ ধরনের প্রতিবেদন বা তথ্য প্রচার-প্রকাশ হলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বিভ্রান্ত হন। তাই সবাইকে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে। একেএম শহীদুল হক আরও বলেন, দুই বাহিনীর মধ্যে দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক রয়েছে। জাতির দুর্দিনে একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছে। এ সম্পর্ক যেন কেউ কোনোভাবে নষ্ট করতে না পারে সেদিকে সবাইকে সজাগ এবং সতর্ক থাকা উচিত।

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



A PHP Error was encountered

Severity: Notice

Message: Undefined index: category

Filename: blog/details.php

Line Number: 417

Backtrace:

File: /home/projonmonews24/public_html/application/views/blog/details.php
Line: 417
Function: _error_handler

File: /home/projonmonews24/public_html/application/views/template.php
Line: 199
Function: view

File: /home/projonmonews24/public_html/application/controllers/Article.php
Line: 87
Function: view

File: /home/projonmonews24/public_html/index.php
Line: 315
Function: require_once

বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ












ব্রেকিং নিউজ