হেফাজতের সমাবেশ: ৫ মের ‘অপারেশন শাপলা’

এখনো ভয়-আতঙ্কে ভীত ঢা’বি শিক্ষার্থী বিল্লাল

প্রকাশিত: ২৩ এপ্রিল, ২০১৬ ০৬:০০:০০

এখনো ভয়-আতঙ্কে ভীত ঢা’বি শিক্ষার্থী বিল্লাল

২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্ত্বরে হেফাজত ইসলামের সমাবেশে অবস্থানকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী বিল্লাল হুসাইন ভয় আর আতঙ্কে আতকে উঠেন। কোনোভাবেই ভুলতে পারছেননা ভয়াল ‘অপারেশন শাপলা’র সেই দৃশ্য।

এ ঘটনাটি স্বাধীনতার পর নিজ দেশের নাগরিকদের দমনে ন্যাক্কারজনক ও ভয়ঙ্করতম দিন। কারণ আওয়ামিলীগ সরকার শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে জড়ো হওয়া সাধারণ নাগরিক ও ইসলামপ্রেমীদের উপর যে নির্মম, ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে তা নজিরবিহীন।

হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশ ২০১৩ সালের ৫ মে তাদের ১৩ দফা দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ঢাকা অবরোধের ডাক দেয়। এদিন রাজধানী মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম এর শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালিত হচ্ছিল। সব ঠিক থাকলেও হঠাৎ মধ্যরাতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাতের অন্ধকারে ঝটিকা অভিযান শুরু করে র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবি’র প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার সদস্যের যৌথ টিম। অপারেশনের নাম দেয়া হয় ‘অপারেশন শাপলা’। যাদের সমন্বয়ে গভীর রাতে আওয়ামী লীগ সরকার এই দেশের ইতিহাসের বর্বরতম হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়েছে।

পূর্বঘোষিত কর্মসূচী অনুযায়ী, রাজধানীর মতিঝিলে অবস্থান ধর্মঘট করছিলো অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।  কর্মসূচীতে অংশ নেয়া সাধারণ মানুষ, আলেম-ওলামা ও মাদ্রাসা ছাত্ররা সুশৃঙ্খলভাবে অবস্থান করেছিল। হঠাৎ কর্মসূচী চলা এলাকায় চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যেখানে ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও সাঁজোয়া গাড়ির বহর যুক্ত ছিল। মনে হয়েছে আন্দোলনকারীদের হঠাতে সরকার তার সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছে।

বিল্লাল হুসাইন জানান, ‘অপারেশন ফ্রিডম’ বা ‘অপারেশন শাপল‘ নামের এ অভিযানে অংশ নেয় প্রায় দশ থেকে বারো হাজার আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য। এরমধ্যে পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাব সদস্যদের সাথে গুপ্তবাহিনী সদস্যেরাও অংশ নেন। সম্মিলিত আক্রমনে মতিঝিল শাপলা চত্বরে মুহূর্তেই গুলিবিদ্ধ হন অসখ্য নিরীহ শান্তি প্রিয় বিক্ষোভকারী। নিমিষেই  ছত্র-ভঙ্গ হয়ে যায় দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে আসা সাধারণ মুসল্লি ও মাদ্রাসা ছাত্ররা। আগতরা শুধুমাত্র ধর্মকে ভালোবেসেই এ সমাবেশে এসেছিলেন বলেও জানান তিনি।

তার মতে, এই গণহত্যাকে লুকিয়ে রাখতে সমাবেশস্থলের সমস্ত মিডিয়া কর্মীদের অপারেশন শুরুর আগেই বাধ্যতামূলকভাবে সরিয়ে নেয়া হয়। সরকারী নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সম্প্রচার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ায় হত্যাকাণ্ড চলাকালীন মধ্যরাতেই সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয় দুটি নিবন্ধিত টেলিভিশনের। টিভি চ্যানেল দুটি হলো-দিগন্ত টিভি এবং ইসলামিক টিভি।

বিল্লাল হোসাইন, তৎকালীন সময়ে যিনি দেশের অন্যতম ধর্মীয় ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্য। তিনিও অবস্থান করছিলেন হেফাজত ইসলামের সেই সমাবেশে। তিনি জানান, অবস্থান কর্মসূচীতে সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল। আমরা সবাই স্বাভাবিকভাবেই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচী পালন করছিলাম। মধ্যরাতে সব বৈদ্যুতিক বাতি নিভে গেলো। আশপাশে বোমা, সাউন্ড গ্রেনেট আর মূর্হ মূর্হ গুলির শব্দ শুনতে শুরু করলাম। আমরা তখনও বুঝে উঠতে পারিনি যে আসলে কি ঘটছে। মুহুর্তেই অভিযান আমাদের কাছে চলে আসলো। লোকজন ছুটাছুটি করছে। আমার সামনেই অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়েছে, আবার রক্তাক্ত অবস্থাতেই দৌড়ে পালাচ্ছে। কেউবা নিরুপায় হয়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় চলতে পারছেনা, পড়ে আছে।

ভয়াল সেই রাতে ডান পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মক আহত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী বিল্লাল হুসাইনও। লুকিয়ে থাকা ও আহতদের ধরতে পুলিশের সাড়াশি অভিযান চলে। পুলিশের ভয়ে কোনো হাসপাতাল আহত বিল্লালকে ভর্তি বা চিকিৎসা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। অনেক চেষ্টার পর ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল শাহজাহানপুর শাখায় প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।

সেই রাতে শাপলা চত্ত্বরে আহত অনেককেই পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পুলিশ গ্রেফতার করে। অনেক হাসপাতালে সরকারি দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ হেফাজত কর্মীদের চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগে হামলা চালায়। এই বাস্তবতায় ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃবৃন্দ বিল্লাল হুসাইনকে কোন হাসপাতালে ভর্তি করা নিরাপদ মনে করেনি। ঘরোয়াভাবেই তার চিকিৎসা চালিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

ভয়াল সে অভিযানের ৩ বছর পার হলেও বিল্লাল হুসাইন এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। বার বার তাকে তাড়া করে ফিরে ভয়াল রাতের সে ‘অপারেশন শাপলা’র বিভীষিকাময় দৃশ্য।

প্রজন্মনিউজ২৪/আলী/রাইসুল

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ