৬ দশকেও রাবি লাইব্রেরিতে জায়গা হয়নি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের

প্রকাশিত: ২২ অগাস্ট, ২০২৬ ০৩:১৬:৩৪

৬ দশকেও রাবি লাইব্রেরিতে জায়গা হয়নি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের

রাবি প্রতিনিধি: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার—প্রতিদিন যেখানে শত শত শিক্ষার্থী পড়াশোনা, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার জন্য ছুটে আসেন। কেউ পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন, কেউ গবেষণার বই খোঁজেন, আবার কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা রিডিং রুমে বসে পড়াশোনা করেন। তবে এই চিত্রে যেন অদৃশ্য একটি দেয়াল রয়েছে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অনেকের কাছেই কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার এখনো প্রবেশের আগেই শেষ হয়ে যায়।

প্রবেশপথে নেই র‍্যাম্প, দোতলায় ওঠার জন্য নেই লিফট, এমনকি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উপযোগী ওয়াশরুমেরও ব্যবস্থা নেই। ফলে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী শিক্ষার্থীদের জন্য গ্রন্থাগারে প্রবেশ কার্যত অসম্ভব। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্যও নেই আলাদা কর্নার কিংবা ব্রেইলভিত্তিক প্রয়োজনীয় সুবিধা।

প্রায় ছয় দশক আগে, ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রাবির কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। লাইব্রেরি প্রশাসকের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ পাঠকক্ষ, দুটি ডিসকাশন রুম ও রেফারেন্স রুম মিলিয়ে এখানে পাঁচ শতাধিক আসন রয়েছে। কিন্তু এত আসনের মধ্যেও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য নেই নির্দিষ্ট ও উপযোগী পড়ার ব্যবস্থা।

বর্তমানে রাবিতে ৩০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। এর মধ্যে বিভিন্ন বিভাগে প্রায় তিন শতাধিক শিক্ষার্থী শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৭৩ বছর পেরিয়ে গেলেও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্রে তাদের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে উচ্চশিক্ষায় সমান সুযোগের বাস্তবায়ন নিয়ে।

আইন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. রিফাত রহমান হুইলচেয়ারে চলাফেরা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছরের শিক্ষাজীবনে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের প্রয়োজন হলেও তিনি কখনো ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি।

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রিফাত বলেন, “চার বছরে আমি লাইব্রেরির বারান্দায় গিয়েছি, কিন্তু লাইব্রেরির ভিতরে ঢোকার আমার সাধ্য হয়নি। ঢুকিনি বলতে আমি ঢুকতে পারিনি। তার মানে এই নয় যে আমার কোনো দরকার লাগেনি বা আমি পড়াশোনায় ভালো না। বিষয়টা হচ্ছে, আমি ঢুকতে পারিনি। ঢোকার মতো পরিবেশ আমার জন্য সেখানে ছিল না।”

তিনি বলেন, গ্রন্থাগারের দোতলায় ওঠার জন্য কোনো লিফট বা র‍্যাম্প নেই। দীর্ঘসময় পড়াশোনা করতে গেলে প্রয়োজনীয় ওয়াশরুম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য উপযোগী ব্যবস্থা নেই।

রিফাতের ভাষায়, “বিষয়টি কোনো অনুকম্পা বা করুণার বিষয় নয়; বরং এটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার।”

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩-এর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষার ক্ষেত্রে সবার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। অন্য শিক্ষার্থীরা যখন গ্রন্থাগারে গিয়ে পড়াশোনা করতে পারছেন, তখন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

প্রশাসনের কাছে দ্রুত র‍্যাম্প বা লিফট স্থাপন এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব ওয়াশরুম তৈরির দাবি জানান তিনি।

জন্ম থেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী নাঈম হোসেন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে সবচেয়ে বেশি কষ্টের বিষয়গুলোর একটি হলো প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা কোনো পড়ার ব্যবস্থা না থাকা।

তিনি বলেন, “আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য কোথাও আলাদা কোনো কর্নার নেই। লাইব্রেরিতে পড়ার কোনো পরিবেশ নেই। আমরা যে সেখানে গিয়ে পড়ব, তেমন কোনো পরিবেশ নেই। প্রতিনিয়ত আমরা এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।”

অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল সিস্টেমসহ বিভিন্ন সুবিধা থাকলেও রাবিতে তা নেই বলেও জানান তিনি। দ্রুত এসব সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানান নাঈম।

প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা করেছেন বলে জানিয়েছেন রাকসুর সমাজকল্যাণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মাসুদ।

তিনি বলেন, “দেড় মাস আগেও ভিসি স্যারের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। উনি তখন বলেছিলেন, এক সপ্তাহের মধ্যে কাজ করে দেবেন। তবে এখনো কোনো কাজ দেখতে পাইনি।”

তিনি জানান, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন যন্ত্রপাতির তালিকাও প্রশাসনের কাছে দেওয়া হয়েছে। এসবের বাজেট অনুমোদনের কথা জানা গেলেও এখনো সরঞ্জাম কেনা হয়নি।

তার মতে, হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী কিংবা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে অক্ষম শিক্ষার্থীদের জন্য লিফট অথবা নিচতলায় পড়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব।

বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের প্রশাসক অধ্যাপক ড. মো. হাবিবুল ইসলাম।

তিনি বলেন, “ওদের দাবির প্রেক্ষিতে আমরা প্রশাসনকে বিষয়টি জানিয়েছি। প্রশাসনও আন্তরিকভাবে বিষয়টি দেখছেন। হয়তো কয়েক দিনের ভেতরে আমরা এর একটা রেজাল্ট পেয়ে যাব।”

প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বর্তমান লাইব্রেরি ব্যবস্থায় কী ধরনের অবকাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন, তা প্রকৌশলীদের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে বলেও জানান তিনি।

প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম।

তিনি বলেন, “এটা খুবই দুঃখজনক। তবে ওদের জন্য বাজেট বরাদ্দ হয়ে গেছে। কিছুদিন সময় লাগবে।”

একসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন উন্নয়নকাজ চলায় দক্ষ জনবলের সংকট রয়েছে উল্লেখ করে উপাচার্য বলেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই গ্রন্থাগারের কাজ শেষ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, “শুধু লাইব্রেরি না, প্রত্যেকটা জায়গায় ওয়াশরুমে তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া লিফট, র‍্যাম্প—যা লাগে, তা ব্যবস্থা করা হবে।”

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার শুধু বই রাখার জায়গা নয়; এটি শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। সেখানে যদি একজন শিক্ষার্থী শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রবেশই করতে না পারেন, তাহলে শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিতের প্রশ্নটি থেকেই যায়।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাজেট বরাদ্দ ও দ্রুত র‍্যাম্প, লিফট, উপযোগী ওয়াশরুমসহ প্রয়োজনীয় সুবিধা তৈরির আশ্বাস মিলেছে। এখন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অপেক্ষা—৬ দশকের পুরোনো গ্রন্থাগারে তাদের জন্য প্রতিশ্রুত সমান সুযোগটি বাস্তবে কবে নিশ্চিত হয়।

এ সম্পর্কিত খবর

মিরপুরে দক্ষিণ জামায়াতের ইউনিট প্রতিনিধিদের নিয়ে শিক্ষা বৈঠক অনুষ্ঠিত

৬ দশকেও রাবি লাইব্রেরিতে জায়গা হয়নি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর হতে হবে সমমর্যাদার: বিরোধীদলীয় নেতা

জাতীয় স্মৃতিসৌধে নবনিযুক্ত ৫ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে সরকার ফ্যাসিবাদের তৈরি পুরোনো পথে হাঁটছে’

সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে শপথ নেবেন ২৩তম রাষ্ট্রপতি

সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপনের নির্দেশ

পাইকগাছায় ফ্রেন্ডশিপের দেশের প্রথম ওডিআর সেন্টার চালু

রাবিতে সাড়ে ছয় বছরে আত্মহত্যায় ঝরল ১৬ শিক্ষার্থীর প্রাণ

ভারতে ককরোচ জনতা পার্টির নেতাদের ওপর হামলা

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ