রাবির ৩৪ বিভাগে শিক্ষকসংকট, ৫৬ শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১ শিক্ষক

প্রকাশিত: ২৪ অগাস্ট, ২০২৬ ০৩:৪২:৪৮

রাবির ৩৪ বিভাগে শিক্ষকসংকট, ৫৬ শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১ শিক্ষক

রাবি প্রতিনিধি: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬১টি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৩৪টিতেই একজন শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থী ২৫ জনের বেশি। এর মধ্যে মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে একজন শিক্ষকের বিপরীতে রয়েছেন ৫৬ জন শিক্ষার্থী। ফলে আন্তর্জাতিক মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষকসংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বার্ষিক প্রতিবেদন ও উচ্চশিক্ষাসংক্রান্ত নীতিমালা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশে প্রতি ১৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষককে কাম্য অনুপাত এবং প্রতি ২০ জনে একজন শিক্ষককে সর্বোচ্চ সহনীয় সীমা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই হিসাবে রাবির ৩৪টি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত সহনীয় সীমারও বাইরে।

বিভাগভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ। সেখানে প্রতি ৫৬ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে রয়েছেন একজন শিক্ষক। এরপর ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্সে ৪৬ জন, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টে ৪১ জন এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ৪০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন।

এ ছাড়া সংস্কৃত বিভাগে প্রতি ৩৮ জন, চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র এবং অর্থনীতি বিভাগে ৩৫ জন, আইবিএতে ৩৪ জন এবং চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানে ৩৩ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন।

মার্কেটিংয়ে ৩২ জন, ইতিহাসে ৩১ জন এবং আইন ও ভূমি প্রশাসন, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট ও ইংরেজিতে ৩০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন।

দর্শনে ২৯ জন, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে ২৮ জন, ইনফরমেশন সায়েন্স অ্যান্ড লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট, ইসলামিক স্টাডিজ ও ফাইন্যান্সে ২৭ জন এবং আইন ও ফলিত গণিতে ২৬ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন।

এ ছাড়া সমাজবিজ্ঞান, গ্রাফিক ডিজাইন, কারুশিল্প ও শিল্পকলার ইতিহাস এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে প্রতি ২৫ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন।

তবে রাবির সব বিভাগে পরিস্থিতি এক নয়। ১৭টি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত কাম্য সীমার মধ্যে রয়েছে।

সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ। সেখানে প্রতি ৭ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন। প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগে এ অনুপাত ৮:১, নাট্যকলায় ৯:১ এবং ফার্মেসিতে ১০:১।

ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিমেল সায়েন্সেসে ১১:১, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ও পদার্থবিজ্ঞানে ১২:১ এবং ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ১৩:১ অনুপাত রয়েছে।

ইউজিসির ২০২৫ সালে প্রকাশিত ৫০তম বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি ১৫ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৮ জনে একজন এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৮ জনে একজন শিক্ষক রয়েছেন। বিপরীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি ২১ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক ছিলেন।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, রাবিতে বর্তমানে ৩০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন প্রায় ১ হাজার ২০০ জন। এ হিসাবে বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত দাঁড়ায় প্রায় ২৫:১।

ইউজিসির সর্বশেষ পাঁচটি বার্ষিক প্রতিবেদনেও রাবির অনুপাতে ওঠানামা দেখা যায়। ৪৬তম প্রতিবেদনে প্রতি ৩৩ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক থাকলেও ৪৭তম প্রতিবেদনে তা বেড়ে ৩৫ জনে দাঁড়ায়। পরে ৪৮তম প্রতিবেদনে ২৪, ৪৯তম প্রতিবেদনে ২০ এবং ৫০তম প্রতিবেদনে ২১ জনে নেমে আসে।

শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সভাপতি অধ্যাপক ড. আকতার বানু বলেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত শিক্ষার মানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হলে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর প্রয়োজন ও সমস্যা আলাদাভাবে দেখার সুযোগ কমে যায়। ফলে শিক্ষকের পক্ষে কার্যকরভাবে পাঠদান করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, দেশের জনসংখ্যার তুলনায় শিক্ষকসংখ্যা কম এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যাও বেশি। তাই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

রাবির ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেলের (আইকিউএসি) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবু রেজা বলেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ঠিক না থাকলে একজন শিক্ষকের ওপর অতিরিক্ত একাডেমিক চাপ তৈরি হয়। এতে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তিনি জানান, কিছু বিভাগে অনুমোদিত শিক্ষক পদ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন নিয়োগ না হওয়ায় শিক্ষকসংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মাইক্রোবায়োলজিসহ কয়েকটি বিভাগে পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। শূন্য পদগুলোতে দ্রুত নিয়োগ দেওয়া গেলে শিক্ষকসংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব।

রাবির উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলিম বলেন, ২০১৮ থেকে প্রায় ২০২৪ সাল পর্যন্ত কয়েক বছর নিয়মিত শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের ঘাটতি আরও বেড়েছে।

তিনি বলেন, গত ১৮ থেকে ২০ মাসে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন বিভাগে যেসব পদ শূন্য রয়েছে, সেগুলো সংশ্লিষ্ট বিভাগের চাহিদা অনুযায়ী পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তবে নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি ইউজিসির অনুমোদনের প্রয়োজন রয়েছে বলেও জানান তিনি।

আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত নিশ্চিত করার বিষয়ে উপ-উপাচার্য বলেন, “কাঙ্ক্ষিত আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে না পারা অবশ্যই আমাদের জন্য একটি নেতিবাচক দিক।” শিক্ষকসংকট কমিয়ে অনুপাত উন্নত করার বিষয়টি প্রশাসনের বিবেচনায় রয়েছে বলেও জানান তিনি। 

এ সম্পর্কিত খবর

বিশেষ ব্যবস্থায় এইচএসসি দিল বৈরী আবহাওয়ায় পরীক্ষা দিতে না পারা ৩৪ জন

রাবির ৩৪ বিভাগে শিক্ষকসংকট, ৫৬ শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১ শিক্ষক

হালাল পণ্যের সনদ দেওয়ার আইনি ভিত্তি পেল ধর্ম মন্ত্রণালয়

রাজধানীতে ১৫০০ জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা দিল ছাত্রশিবির

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় ক্লাবে পরিণত করেছে বিএনপি : নাহিদ ইসলাম

দলের নাম ভাঙিয়ে চলা লোকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে : রিজভী

জামায়াত আমিরের মতবিনিময় সভায় যোগ দিলেন সেসব সংবাদপত্রের সম্পাদক

নুসরাত হত্যা মামলায় দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল, খালাস ১০ জন 

অতিথি না করায় ফাইনাল খেলা বন্ধে ‘১৪৪ ধারা জারি’ ছাত্রদল নেতার

রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার রক্ষায় মিয়ানমার সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে: আইনমন্ত্রী

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ