চোর ভেবে নির্মম নির্যাতন, পরে জানা যায় চোর তিনি না

প্রকাশিত: ১৮ এপ্রিল, ২০২৬ ০৮:২৬:২৬

চোর ভেবে নির্মম নির্যাতন, পরে জানা যায় চোর তিনি না

‎পিরোজপুর ডিবির নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছে পুলিশ কর্মকর্তাদের মেসে অস্থায়ীভাবে কেয়ারটেকার হিসেবে কাজ করা মো. ইউনুস ফকির (৪০) নামে এক যুবক। ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিফুল ইসলামের টাকা চুরির অভিযোগে এই শাস্তি দেয়া হয়। পরবর্তীতে অন্য আরেক কর্মীর কাছ এই টাকা উদ্ধার হয়। 

গত (১৩ এপ্রিল) সোমবার দুপুরে নির্যাতনের এ ঘটনা ঘটলেও বৃহস্পতিবার রাতে বিষয়টি জানাজানি হয়।‎

এ বিষয়ে মারাত্মক সমালোচনার জন্ম দিলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি কর্তৃপক্ষ। এমনকি এ বিষয়ে পুলিশের কোনো পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নির্যাতিত মো. ইউনুস ফকির- ‎পিরোজপুর সদর উপজেলার খানাকুনিয়ারি গ্রামের মৃত মোবারেক আলী ফকিরের ছেলে। 

তিনি জানান, জেলার পুলিশ লাইনসের পুলিশ কর্মকর্তাদের থাকার জন্য নির্মিত মেসে সে কেয়ারটেকার হিসেবে কাজ করছে। ২০০৮ সালে ভবনটি নির্মানের সময় সে ওখানে যুক্ত হন। পরবর্তীতে মেসে অবস্থানকারীরা প্রতিমাসে তাকে কিছু টাকা দেন। ভবনটির দ্বিতীয় তলায় একটি কক্ষে থাকেন পিরোজপুর ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম। তার কক্ষের দুটি চাবির মধ্যে একটি ইউনুসের কাছে ছিল।

‎সোমবার দুপুর দেড়টার দিকে আরিফুল ইসলাম হঠাৎ করেই ইউনুসের কাছে থাকা চাবিটি ফেরত চান। তবে সেটি দিতে ব্যর্থ হন ইউনুস। এরপরই আরিফ তাকে জানান, তার কক্ষ থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা চুরি হয়েছে এবং ইউনুসই সেই টাকা নিয়েছে। তাই টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য তাকে চাপ প্রয়োগ করে। 

ইউনুস টাকা চুরির কথা অস্বীকার করার পর তাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে ভবনের নিচতলায় নিয়ে যান এবং তাকে মারধর শুরু করেন। পরবর্তীতে ডিবি পুলিশের আরও ৭-৮ জন সদস্য সেখানে গিয়ে ইউনুসকে নির্মমভাবে মারধর শুরু করে। এমনকি বৈদ্যুতিক শক ও  পুরুষাঙ্গে মোমবাতি গলিয়ে আধাঘণ্টা ফেলতে থাকে।

ইউনুসকে পিরোজপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর আহমেদ সিদ্দিকীর কাছে নিয়ে গেলে তিনি ইউনুসের কাছ থেকে বিস্তারিত শোনে। পরে ওই মেসে কাজ করা ঝাড়ুদার শাকিলকে ডেকে পাঠান। পরবর্তীতে জিজ্ঞাসাবাদে শাকিল টাকা চুরির কথা স্বীকার করে এবং পুলিশ সেই টাকা উদ্ধার করে। এরপর ইউনুস প্রথমে যে টাকা দিয়েছিল সেগুলো তাকে ফেরত দেওয়া হয় ও পাশাপাশি একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করে।

‎তবে বিষয়টি জানাজানি হবে এই আশঙ্কায় চিকিৎসকের কাছে ইউনুসের সমস্যার বিষয়ে কিছুই বলতে দেননি হুমায়ুন। পরে একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নির্দেশে পরের দিন ডিবি পুলিশ ইউনুসকে খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়। সেখানেও ইউনুসকে বলতে বাধ্য করান যে, স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করে সে নিজেই নিজের পুরুষাঙ্গ পুড়িয়েছে। এ ছাড়া, সে পড়ে গিয়ে ব্যাথা পেয়েছে।

‎তবে এ ঘটনার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন ইউনুস। এ ছাড়া, পুলিশের সঙ্গে পেরে উঠবেন না, এই আশঙ্কায় তারা কোথাও কোনো অভিযোগ দেননি। তবে বিষয়টির সুষ্ঠ বিচারের জন্য পুলিশ সুপার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান ইউনুস। এ ছাড়া, তাকে একটি কর্মসংস্থানের আশ্বাস দিয়ে বিষয়টি চেপে যাওয়ার জন্য ডিবি পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। কিন্তু কর্মসংস্থান নয়, নির্মম এ ঘটনার সুষ্ঠ বিচার দাবি করেছে ইউনুস ও তার পরিবার।

ইউনুসের ভাই আনিসুর রহমান বলেন, একজন খুনিকেও এভাবে নির্যাতন করা হয় না যেভাবে আমার ভাইকে নির্মম নির্যাতন করা হয়েছে। তাই তিনিও এ ঘটনার সুষ্ঠ বিচার দাবি করেন।

‎তবে অভিযোগের বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুল ইসলামের সঙ্গে কথা হলে তিনি ছুটিতে আছেন বলে জানান এবং এ বিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে ইউনুসের সঙ্গে যা হয়েছে তা তিনি করেননি, করেছে অন্যকেউ। যা হয়েছে তা ঠিক হয়নি বলেও জানান তিনি। তারা ইউনুসের চিকিৎসাও করিয়েছেন।

পিরোজপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মজনুর আহম্মেদ সিদ্দিকিকে একাধিকবার কল দিলেও, তিনি রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রজন্মনিউজ২৪

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ