প্রকাশিত: ২০ মার্চ, ২০২৫ ১২:৫৪:২১
প্রজন্ম ডেস্ক: বৈষম্যমুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখতেন সাইফুল, যেখানে তার ছেলে সেনা কর্মকর্তা হবে, আর মেয়ে হবে ডাক্তার। সেই স্বপ্ন বুকে নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে সমর্থন করতেন তিনি এবং প্রায়ই অংশ নিতেন মিছিলে, প্রতিবাদ-বিক্ষোভে। কিন্তু সেই স্বপ্নের কুঁড়ি দল মেলার আগেই শহীদের খাতায় নাম লেখালেন তিনি।
বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার নদীভাঙন কবলিত বাহেরচর গ্রামে দরিদ্র এক পরিবারে জন্ম নেয়া শহীদ মো: সাইফুল ইসলাম (৩৬)। প্রায় ১৮ বছর ধরে ঢাকা মহানগরীর সদরঘাট এলাকার গেটওয়াল মার্কেটের একটি কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাপড় ইস্ত্রির কাজ করতেন।
সম্প্রতি এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে রানী বলেন, গত ৫ আগস্ট দুপুর আড়াইটার দিকে খাওয়ার পর সাইফুল তাকে ফোন করে জানান যে ‘ফ্যাসিস্ট হাসিনা’ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। তিনি তখন উচ্ছ্বসিত হয়ে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
রানী বলেন, ‘আমি বারবার সাইফুলকে সাবধান থাকতে বলেছিলাম এবং দ্রুত কারখানায় ফিরে যেতে অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু তিনি বললেন, ‘আজ আনন্দের দিন, চিন্তা করো না, কিছু হবে না।’
কিন্তু সেই বিজয় মিছিলেই বংশাল থানার সামনে পুলিশের গুলিতে সাইফুল মাথায় গুরুতর আহত হন। পরে তার সহকর্মীরা খবর দিলে তার ভাই মিরাজ ও গিয়াস ঘটনাস্থলে যান এবং বিকেল ৪টা ৪৩ মিনিটে তাকে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (মিটফোর্ড হাসপাতাল) নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকেরা বিকেল ৪টা ৫০ মিনিটে সাইফুলকে মৃত ঘোষণা করেন।
রানী বলেন, ‘সাইফুল বৈষম্যমুক্ত সমাজ চেয়েছিলেন। সেই কারণেই তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে সমর্থন করতেন এবং প্রায়ই প্রতিবাদ মিছিলে অংশগ্রহণ করতেন।’
তিনি বলেন, ‘সাইফুলের সাথে তার পারিবারিক জীবন খুবই সুখের ছিল। তিনি ছিলেন একজন ভালো মানুষ, ভালো স্বামী ও ভালো বাবা এবং একই সাথে একজন দায়িত্ববান সন্তান।’
জুলাইয়ের শেষের দিকে বিহারী গ্রামে নতুন বাড়িতে ওঠার পর সাইফুল পুনরায় ঢাকায় তার কাজে ফিরে যান। প্রতিদিন সময় পেলেই তিনি রানীর সাথে মোবাইলে কথা বলতেন।
এর একমাত্র ছেলে রিশাদকে সেনা কর্মকর্তা এবং একমাত্র মেয়ে ছামিয়াকে চিকিৎসক বানানোর স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল শহীদ মো: সাইফুল ইসলামের।
সাইফুলের বাবা মো: শহীদুল ইসলাম (৬০) একটি ছোট চায়ের দোকান করে এবং কোনো রকমে তার প্রতিবন্ধী স্ত্রী, চার ছেলে ও একমাত্র মেয়ের সংসার চালাতেন। চার ভাই ও একমাত্র বোনের মধ্যে সাইফুল ছিলেন সবার বড়। তার মা হোসনে আরা বেগম (৫৫) প্রতিবন্ধী হওয়ায় কোনো কাজ করতে পারেন না।
শহীদ সাইফুলের এক ভাই, মিজানুর রহমান (৩২), এক বছর আগে ক্যান্সারে মারা যান। অন্য দুই ভাই মিরাজ (৩০) ও গিয়াস (২৫) যথাক্রমে ঢাকার একটি পোশাককারখানায় দর্জির কাজ এবং গেটওয়াল মার্কেটে শ্রমিকের কাজ করেন। একমাত্র বোন মুক্তার (২২) বিয়ে হয়েছে ভোলা জেলার একজন অটোরিকশাচালক শামসুদ্দিনের (২৫) সাথে।
ছোটবেলা থেকেই সাইফুল দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করে বড় হন। ২০০৫ সালে তিনি ভাগ্যের সন্ধানে ঢাকায় চলে যান এবং সদরঘাট এলাকার গেটওয়াল মার্কেটের একটি কারখানায় কাপড় ইস্ত্রির কাজ নেন। কিছুদিন পর তিনি তার মা-বাবার কাছে টাকা পাঠাতে শুরু করেন।
দারিদ্র্যের কারণে ছোট ভাই মিরাজ ও গিয়াসও পর পর ঢাকায় চলে যান। মিরাজ একটি পোশাককারখানায় দর্জির কাজ নেন। আর গিয়াস গেটওয়াল মার্কেটের একই কারখানায় সাইফুলের সাথে কাপড় ইস্ত্রির কাজ নেন।
সাপ্তাহিক ছুটি ও অন্যান্য কিছু সময় সাইফুল সূত্রাপুর এলাকার একটি হোটেলে নাস্তা ও দুপুরের খাবার খেতেন। সেখানেই হোটেল মালিক এবং তার রংপুরের পীরগাছা উপজেলার বাসিন্দা স্ত্রীর সাথে তার সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। ২০০৮ সালে হোটেল মালিকের স্ত্রী পীরগাছা উপজেলার কল্যাণী ইউনিয়নের বিহারী গ্রামের মরহুম এশাহাক মিয়ার মেয়ে রানী বেগমের সাথে সাইফুলের বিয়ে ঠিক করেন।
সাইফুল-রানী দম্পতি ঢাকায় বসবাস শুরু করেন। এর মধ্যে ২০১০ সালে তাদের ছেলে রিশাদ মিয়া এবং ২০১৩ সালে মেয়ে ছামিয়া আক্তারের জন্ম হয়। ছেলে রিশাদ এখন রংপুরের পীরগাছা উপজেলার বিহারী দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে এবং মেয়ে ছামিয়া পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ালেখা করছে।
২০১৫ সালে সাইফুল রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় স্ত্রী রানীর জন্মস্থান বিহারী গ্রামে পাঁচ শতাংশ জমি কিনেন। সম্প্রতি তিনি পরিবারের স্থায়ী বসবাসের জন্য সেখানে একটি নতুন বাড়ি তৈরি করেন এবং তার শাহাদাতের মাত্র ১০ দিন আগে নিজেই সেটির উদ্বোধন করেন।
রানী বলেন, ‘আমার স্বামী শহীদ হওয়ার সাথে সাথে আমার জীবনের সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। তার স্বপ্ন ছিল ছেলে সেনা কর্মকর্তা ও মেয়ে চিকিৎসক হবে। এখন আমি কী করব?’
সাইফুলের লাশ ঢাকা থেকে রংপুর নেয়ার জন্য কোনো অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত পরিবারের লোকজন বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার বাহেরচর গ্রামে লাশ নিয়ে যান। পরদিন ৬ আগস্ট বেলা সাড়ে ১১টায় তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
সাইফুলের ছেলে রিশাদ বলেন, ‘আমার বাবা ছিলেন বিশ্বের সেরা বাবা। তিনি আমাকে সেনা কর্মকর্তা বানানোর স্বপ্ন দেখতেন। আমি তার গর্বিত ছেলে।’
তার মেয়ে ছামিয়া অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে তাদের পরিবারকে সহায়তা দেয়ার আবেদন জানিয়ে বলেন, ‘আমার বাবার স্বপ্ন ছিল আমি ডাক্তার হবো, আর রিশাদ ভাইয়া সেনা কর্মকর্তা হবে। আমি সবার কাছে দোয়া চাই।’
রানী জানান, ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন তার দুই সন্তানকে তিন লাখ টাকা, তাকে ও তার শাশুড়িকে এক লাখ টাকা করে দিয়েছে। রংপুরের জেলা প্রশাসক ও পীরগাছার উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোট ১৫ হাজার টাকা এবং স্থানীয় এক রাজনীতিবিদ ১০ হাজার টাকা দিয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘বিহারী গ্রামে বাড়ি তৈরির সময় আমার স্বামী যে দেড় লাখ টাকা ধার করেছিলেন, তা পরিশোধ করেছি। এখন আমার কাছে খরচ করার মতো টাকা নেই, খুব কষ্টে দিন কাটে।’
প্রজন্ম নিউজ২৪/ওবাইদুল ইসলাম
বগুড়ায় কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় ২ পুলিশ সদস্য আহত
লন্ডনে খালেদা জিয়ার সঙ্গে জামায়াত আমিরের সাক্ষাৎ
ইসলামকে অবমাননা করে ভারতীয় টেলিভিশন ‘জি বাংলা’য় ধারাবাহিক, ক্ষিপ্ত নেটিজেনরা
সাগর-রুনি হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় ১১৮তম বার বাড়লো
জাফর এক্সপ্রেসে ব্যবহৃত হয়েছিল আফগানিস্তানে ফেলে আসা মার্কিন অস্ত্র
গাজাকে আরও সংকুচিত ও বিচ্ছিন্ন করার হুমকি ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর
বাংলাদেশের পর এবার গাজাবাসীর পক্ষ নিলো পাকিস্তান
ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলায় নিহত ৩১, তীব্র প্রতিক্রিয়া