চেয়ার-টেবিলের এত দাম

এই সোফা, খাট, ডাইনিং, চেয়ার-টেবিলের এত দাম!

প্রকাশিত: ১৭ মে, ২০১৮ ০১:২৫:০৫ || পরিবর্তিত: ১৭ মে, ২০১৮ ০১:২৫:০৫

এই সোফা, খাট, ডাইনিং, চেয়ার-টেবিলের এত দাম!

দেশের নামী একটি আসবাব কোম্পানির শোরুমে গিয়ে দেখা গেল, ৫০ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকায় সুদৃশ্য এক সেট সোফা কেনা যায়। প্রতিটি সেটে আছে দুজনের বসার উপযোগী দুটি, একজনের একটি করে সোফা এবং একটি টি-টেবিল। আসবাবের বাজারদর সম্পর্কে যাঁদের মোটামুটি ধারণা আছে, তাঁদের কেউ কখনো কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে গেলে এবং ঠিকাদারের সরবরাহ করা আসবাবের দাম ও মান সম্পর্কে জানার সুযোগ পেলে বিস্ময়ে তাঁর চোখ কপালে গিয়ে ঠেকতে পারে।

দেখা যাবে, দুজনের বসার জন্য অসুন্দর একেকটি সোফার দাম ৯৫ হাজার টাকা, যার কোনো কোনোটির হাতল আলাদা হয়ে আছে কিংবা নড়বড়ে। এ তো গেল সোফার কাহিনি। কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের আসবাবের ফিরিস্তি আরও লম্বা। কারণ, ঠিকাদার প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রায় দুই গুণ সরবরাহ করেছেন। এসব আসবাব কোথায় ব্যবহার করা হবে, তার জন্য জায়গা খুঁজে পাচ্ছে না কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ।

ঠিকাদারের তেলেসমাতির এটাই শেষ নয়। ২০ কোটি ৮৫ লাখ ৮৪ হাজার টাকার বিল আদায়ের জন্য তিনি একটি ভুয়া সরকারি আদেশ (জিও) তৈরি করেন। কিন্তু পার পেলেন না। দুর্নীতির গন্ধ পেয়ে স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় আটকে দিয়েছে বিল। তাতেও হতাশ হলেন না ঠিকাদার। দ্বারস্থ হলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির।

কমিটি ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করার সুপারিশ করেছে। শুধুই কি সুপারিশ, কমিটি মন্ত্রণালয়ের সচিব ফয়েজ আহমেদের ওপর রীতিমতো তোপ দাগিয়েছে। সেই তোপে নাকাল সচিব অনেকটা বিধ্বস্ত অবস্থায় সংসদ ভবন ছেড়ে যান। ৬ মে সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে এ ঘটনা ঘটে। আলোচিত এই ঠিকাদারের নাম মিঞা ছাদুল্লাহ বিন হাসান। তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম এস এল ট্রেডার্স।

প্রতিটি চেয়ারের দাম ৩৫ থেকে ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। 

জানতে চাইলে ফয়েজ আহমেদ বলেন, ‘আমি সরকারের কর্মচারী। কিছু না বলাই ভালো। যা শোনার, আপনারা প্রতিমন্ত্রীর কাছ থেকে শোনেন। তিনি বৈঠকে ছিলেন।’ স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, কাজে যে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে, তদন্তে সেটা প্রমাণিত।

কলেজের নয়, অধ্যক্ষের চাহিদা

মন্ত্রণালয়ের নথি ও সংসদীয় কমিটির কার্যপত্র থেকে জানা যায়, ২০১৬ সালের জুলাইয়ে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ রেজাউল করিম অনেকটা একক ক্ষমতায় এস এল ট্রেডার্সকে আসবাব সরবরাহের কার্যাদেশ দেন। কী পরিমাণ আসবাব লাগবে, সে বিষয়ে তিনি দরপত্র নির্বাচন কমিটির কাছ থেকে কোনো চাহিদাপত্র নেননি। যে কারণে ঠিকাদার ৩১ ধরনের ২ হাজার ৪২২টি আসবাব সরবরাহ করার সুযোগ পেয়েছেন, যার অর্ধেকই কলেজের প্রয়োজন নেই।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব সিরাজুল ইসলাম ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে মেডিকেল কলেজ পরিদর্শনে গিয়ে দেখতে পান, বিভিন্ন কক্ষ ও হলে প্রয়োজনীয় আসবাব বসানোর পর অবশিষ্ট আসবাব একাধিক কক্ষে স্তূপ করে ফেলে রাখা হয়েছে। অনিয়মের আঁচ পেয়ে তিনি ২০১৭ সালের ১৩ আগস্ট অতিরিক্ত সচিব আনোয়ার হোসেন হাওলাদারকে প্রধান করে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন।

জানতে চাইলে সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘তদন্তের পর অনিয়ম, মানহীন আসবাব এবং তার অস্বাভাবিক দাম সম্পর্কে জানতে পারি। সে জন্য মন্ত্রণালয় বিল পরিশোধ করেনি।’সংসদীয় কমিটির সুপারিশ সম্পর্কে সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘সংসদীয় কমিটি তো অনেক সুপারিশই করে থাকে। সবই কি জনবান্ধব? টাকা তো কমিটি দেবে না, দেবে সরকার। সরকার দেবে জনগণের টাকা। সুতরাং জনপ্রতিনিধিরা যখন জনগণের স্বার্থ না দেখে ব্যক্তিস্বার্থে সুপারিশ করেন, তখন আমাদের আর কী বলার আছে?’

প্রতিটি ডাইনিং টেবিলের দাম ৯৫ হাজার ৫০০ টাকা করে। 

তদন্তে সোফার দাম ও মান

তদন্ত কমিটি তদন্ত শেষ করে ২০১৭ সালের ৩০ আগস্ট প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দরপত্রে ৬২ ধরনের আসবাব সরবরাহের কথা থাকলেও তদন্তে পাওয়া গেছে ৩১ ধরনের। সরবরাহ করা আসবাব খুবই নিম্নমানের এবং এসব আসবাব দেশের নামী কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে কেনা হয়নি। তা ছাড়া প্রয়োজনের অনেক বেশি আসবাব সরবরাহ করা হয়েছে। যে কারণে এসব আসবাব একাধিক কক্ষে স্তূপ করে ফেলে রাখা হয়েছে।

আরও বলা হয়েছে, আসবাব কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হলেও বাস্তবে কোনো প্রতিযোগিতা হয়নি। দরপত্র নির্ধারণ কমিটি মালামালের চাহিদা নির্ধারণ না করায় ঠিকদার চাহিদার অতিরিক্ত মালামাল সরবরাহ করেছে। এর দায় সাবেক অধ্যক্ষ রেজাউল করিমের ওপর বর্তায়। সাবেক অধ্যক্ষ রেজাউল করিম এককভাবে যে চাহিদাপত্র তৈরি করেছেন, সেখানে কয়েকটি ক্ষেত্রে রিভলবিং চেয়ার সরবরাহের কথা উল্লেখ থাকলেও সরবরাহ করা হয়েছে ফিক্সড চেয়ার।

শ্রেণিকক্ষে ছাত্রদের বসার জন্য ৩৫০টি ফিক্সড চেয়ারের দাম ৬২ লাখ ৩০ হাজার। যার অর্থ প্রতিটি চেয়ারের দাম ১৭ হাজার ৮০০ করে। তদন্ত কমিটি বলেছে, চেয়ারে ব্যবহার করা বোর্ড অত্যন্ত নিম্নমানের। হলকক্ষের জন্য সরবরাহ করা দুই শতাধিক চেয়ারের প্রতিটির দাম ৩৫ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা করে।

চেয়ারগুলো বিভিন্ন রঙের হওয়ায় খুবই অসুন্দর দেখায়।যাচ্ছেতাই মানের ২০টি সোফার প্রতিটির দাম ৯৫ হাজার ৫০০ করে। পরিদর্শনে কিছু সোফার হাতল নড়বড়ে এবং কয়েকটির হাতল প্রায় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় দেখা গেছে। ৩০০টি সিঙ্গেল (একজনের উপযোগী) খাটের প্রতিটির দাম ৬২ হাজার ৫০০ টাকা করে।

প্রতিটি সোফার দাম ৯৫ হাজার ৫০০ টাকা। টি-টেবিলের দাম ৩০ হাজার ৫০০ টাকা করে। 

প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, ২০টি ডাবল (দুজনের উপযোগী) খাটের প্রতিটির দাম ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা করে। ২৫টি সেক্রেটারিয়েট টেবিলের দাম ২৩ লাখ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ প্রতিটির দাম ৯৩ হাজার ৫০০ টাকা করে। ৬০টি সাধারণ টেবিলের প্রতিটির দাম ৪১ হাজার ২৫০ টাকা করে। কর্মকর্তাদের ব্যবহারের জন্য ৪৫টি টেবিলের প্রতিটির দাম ৯৮ হাজার ৪৭৫ টাকা করে।

২০টি টি-টেবিলের প্রতিটির দাম ৩০ হাজার ৫০০ টাকা করে। ২০টি ডাইনিং টেবিলের প্রতিটির দাম ৯৫ হাজার ৫০০ টাকা করে। তদন্ত কমিটির মতে, কেনাকাটার সবকিছু অধ্যক্ষ রেজাউল করিম নিজ বিবেচনায় করেছেন। যে কারণে অনিয়মের সব দায় তাঁর ওপর বর্তায়। এর ওপর ভিত্তি করে স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ ১০ জানুয়ারি রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায়।

জানতে চাইলে সাবেক অধ্যক্ষ রেজাউল করিম বলেন, ‘আমি কক্সবাজারের মানুষ। তাই সুযোগ পেয়ে আমি এই কলেজের জন্য সর্বোচ্চটাই করার চেষ্টা করেছি। কারণ, ২০০৮ সালে কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে নয় বছরে কিছুই হয়নি। আমি না করলে কিছুই হতো না। বর্তমানে যে ছাত্রসংখ্যা আছে, ভবিষ্যতে তা আরও বাড়বে। সুতরাং বাড়তি আসবাব কেনাটা দোষের কিছু হয়নি।’

মন্ত্রণালয়ের তদন্ত এবং আসবাবের মান সম্পর্কে রেজাউল করিম বলেন, ‘যিনি তদন্ত করেছেন, তিনি তো আমাকে কোনো নোটিশ পাঠাননি। কলেজের ছাত্ররা ঝুপড়িতে থাকত। আমার চেষ্টায় তারা এখন হোস্টেলে থাকে। কলেজের সার্বিক কাজকে ১৫ বছর এগিয়ে নিয়েছি। এসব করা কি আমার অপরাধ? সুতরাং ওই সব ঘোড়ার ডিমের তদন্তের কোনো ভ্যালু নেই।’

প্রতিটি চেয়ারের দাম ১৭ হাজার ৮০০ টাকা করে।

করিতকর্মা মিঞা ছাদুল্লাহ

২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে অবসরে যাওয়ার আগে রেজাউল করিম এস এল ট্রেডার্সের কাছ থেকে যাবতীয় মালামাল বুঝে নেন। এরপর থেকেই মিঞা ছাদুল্লাহ বিল আদায়ের জন্য নতুন অধ্যক্ষ সুভাস চন্দ্র সাহাকে চাপ দিতে থাকেন এবং বিলের জন্য তিনি অধ্যক্ষকে একটি জিও দেখান। এর ওপর ভিত্তি করে ১২ ডিসেম্বর সুভাষ চন্দ্র সাহা ২০ কোটি ৮৫ লাখ ৮৪ হাজার টাকার বিল অনুমোদন ও বরাদ্দ দেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিঠি লেখেন।

অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক আবদুর রশিদ বরাদ্দ দেওয়ার জন্য স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে চিঠি লেখেন। জবাবে ১৬ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ফয়সাল শাহ অধিদপ্তরকে জানান, ঠিকাদারের বিল পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় টাকা চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ নেই। রাজস্ব খাতের টাকা থেকে বিল পরিশোধ করা সম্ভব হলেও অর্থ মন্ত্রণালয় তাতে সম্মতি দেয়নি।মন্ত্রণালয় আরও জানায়, এস এল ট্রেডার্সের বিল পরিশোধের জন্য কোনো জিও জারি হয়নি। ঠিকাদার অধ্যক্ষ সুভাষকে যে জিও দেখিয়েছেন তা ভুয়া।

সংসদীয় কমিটিতে ধরনা

মন্ত্রণালয় বিল অনুমোদন না করায় মিঞা ছাদুল্লাহ চলতি বছরের ১৫ মার্চ স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বরাবরে আবেদন করে বলেন, নির্ধারিত সময়ে মালামাল সরবরাহ করা সত্ত্বেও তাঁর বিল পরিশোধ করা হচ্ছ না। মালামাল সরবরাহের জন্য তিনি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন। সময়মতো পরিশোধ করতে না পারায় তিনি এখন ঋণখেলাপি।

কিন্তু মিঞা ছাদুল্লাহর এই আবেদনে মন্ত্রীর মন গলেনি। এরপর তিনি বিষয় সম্পর্কে অবহিত করে সংসদীয় কমিটিতে আবেদন করেন। জানা গেছে, এই আবেদনের পর কমিটির সভাপতি শেখ ফজলুল করিম মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চান, কাজে অনিয়ম হয়ে থাকলে মালামাল বুঝে নেওয়া হলো কেন? মালামাল যেহেতু বুঝে নেওয়া হয়েছে, সুতরাং বিল পরিশোধ করে দিতে হবে।এ বিষয়ে জানতে ফজলুল করিম সেলিমকে ফোন করে এবং তাঁর মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা পাঠিয়ে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

তবে কমিটির সদস্য ও স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক প্রথম আলোকে বলেন, মিঞা ছাদুল্লাহ মন্ত্রণালয়কে পটাতে ব্যর্থ হয়ে সংসদীয় কমিটিতে ধরনা দিয়েছেন এবং কোনো না কোনোভাবে তাদের পটাতে পেরেছেন। সে জন্যই তারা বিল পরিশোধের সুপারিশ করেছে। কিন্তু কমিটি বললে তো হবে না। আইন অনুযায়ী যা করা উচিত, মন্ত্রণালয় তা-ই করবে।

প্রজন্মনিউজ২৪/মোঃ জিবুর রহমান

এ সম্পর্কিত খবর

হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের নতুন বার্তা

প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে বক্তব্য, জাগপার কার্যালয় হামলা

জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে কুপিয়ে হত্যা, গ্রেপ্তার ২

হাসিনাকে ফিরানোর আবেদন পর্যবেক্ষন করছে ভারত, দাবি জয়সওয়ালের

ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে যুবককে বিদেশে পাচার

সোশ্যাল মিডিয়া সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্ত করে দাবি মির্জা ফখরুলের

বাড়ি ফেরছেন হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত লেবানিজরা

যুদ্ধবিরতি হলে লেবানন থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত করতে হবে: ইরান

রাশিয়ার জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশকে ২ মাসের ছাড় দিলো যুক্তরাষ্ট্র

তেল মজুদ করে বেশি দামে বিক্রি, পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা 

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ