‘সকল শক্তির আগে প্রেম তুমি’

প্রকাশিত: ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ ০৪:০০:১৩ || পরিবর্তিত: ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ ০৪:০০:১৩

‘সকল শক্তির আগে প্রেম তুমি’

আপনি কি সবাইকে ভালোবাসেন? এ রকম প্রশ্ন হলে, আপনি এক দাগে উত্তর দিতে পারবেন না। উদ্ভিদের কথাই ধরুন, আপনি কিন্তু সব উদ্ভিদকে ভালোবাসেন না, যে উদ্ভিদ আপনার কাজে লাগে না, তাকে আপনি গাছ বলেন না, বলেন আগাছা। আর এই ‘আগাছা’ নাম দিয়েই আপনি কোনোরূপ অনুশোচনা ছাড়াই তাকে কেটে সাফ করে ফেলেন। এর উলটোটাও ঘটতে পারে, যাকে আপনি আগাছা বলে কেটে ফেলছেন, ঠিক সেই আগাছাই যদি কালক্রমে জীবন রক্ষাকারী ঔষধি হিসেবে আবিষ্কৃত হয়, তবে আপনার কাছে আর অকাজের আগাছা থাকবে না, হয়ে যাবে প্রয়োজনীয় গাছ।

আমরা সহজভাবে এক দাগে প্রেম-ভালোবাসা বলতে নারী-পুরুষের ভালোবাসাকেই বুঝি। এই ভালোবাসার আবার নানান ব্যাখ্যা আছে! সবচেয়ে সহজ সংজ্ঞাটা সম্ভবত বাউলের। তাদের মতে—কাম ছাড়া প্রেম নাই, প্রেম ছাড়া কাম নাই। মানে দাঁড়াল নারী কেবলমাত্র নারী বলেই তার প্রতি পুরুষের এত প্রেম। অর্থাত্ তারা বিপরীত লিঙ্গ, অর্থাত্ দুজনই কামনাগ্রস্ত। অর্থাত্ কামনা থেকেই ভালোবাসা, ভালোবাসা থেকেই প্রেম, রসায়ন মূলত একটাই—মানে কামনাটাই অরিজিন। আর এই অরিজিন থেকেই নানা পদের আকর্ষণ, মানে বহিঃপ্রকাশ। প্রেমহীন কামনার মধ্যে ভালোবাসা যেমন থাকে না, তেমন কামনা মরে গেলে, প্রেমও জাগে না। এটা নিয়ে আরো তর্ক-বিতর্ক করা যায় বটে, কিন্তু দিনশেষে প্রেম বলুন আর ভালোবাসাই বলুন, সে-ই কামনার নদীতেই পড়তে হবে। এবার কাম থেকে যারা প্রেমে যেতে পারেন তাঁরাই মূলত সাধু। সে এক কঠিন করণ, ক’জনা পারে! সেদিকে না-যাই। প্রতিটি প্রেমের আলাদা আলাদা গল্প আছে। টানটা একরকম হলেও এর মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন। প্রেম কতটা গভীর হতে পারে—তার কিছু বৈশ্বিক দৃষ্টান্ত আছে। যেমন মমতাজ-শাহজাহান, শিরি-ফরহাদ, ইউসুফ-জুলেখা, হেলেন-প্যারিস, আনারকলি-সেলিম-আনারকলি... ইত্যাদি। সবচেয়ে বিখ্যাত গল্পটা হলো লাইলি-মাজনু’র। এসব অমর প্রেমকাহিনি পড়তে পড়তে আমরা কিছুটা হতাশ হই। ভাবি, প্রেমে ক’জনার আর মিলন হয়!

সমকালেও নজির কম নেই! জীবনের চেয়েও নরনারীর প্রেম অধিক মূল্যবান বলেই কি প্রেমিক-প্রেমিকা যুগল একই রশিতে নির্দ্বিধায় ঝুলে পড়তে পারে? প্রেমের জন্য মানুষ আরো কত কী করে! কিছুদিন আগে জার্মানিতে গিয়েছিলাম। লাভ-লক-ব্রিজ, ছোট করে লোকে বলে লাভব্রিজ। ফ্রাঙ্কফুটে দেখার মতো যে কয়টি টুরিস্ট প্লেস আছে, লাভব্রিজ তার মধ্যে এক নম্বরে। সেদিন সকাল সকাল হোটেল থেকে বের হয়েছিলাম। এখানে সুবিধা হলো পাঁচ ইউরো দিয়ে ডে-টিকিট কিনে নিলে সারা দিন ট্রাম রেলে ভ্রমণ করা যায়। আমিও সেদিন লাভ ব্রিজ টার্গেট করে ট্রামে উঠে পড়লাম। কিন্তু পথে পড়ে সব এলোমেলো হয়ে গেল, শহরের অলিগলি পার হয়ে মার্কেট, মনুমেন্ট, বাহারি বাগান, বরফে ঢাকা টিলা ময়দান দেখে দেখে লাভব্রিজের নিকটবর্তী স্টেশনে নেমে পড়ার আগে, যাত্রীরাই আমাকে জানাল যে, ক্রিস্টমাসের জন্য মেইন রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তোমাকে ঘুরে যেতে হবে। অগত্যা রোমারো-তে নামতে হলো, পথের পাশেই মাইন নদী। নদী ধরে হেঁটে হেঁটে যতক্ষণে লাভব্রিজের গোড়ায় গেলাম ততক্ষণে ব্রিজজুড়ে প্রচণ্ড ভিড় হয়ে গেছে। মানুষের গা ছুঁয়ে ছুঁয়ে কোনোমতে ব্রিজে উঠে গেলাম। এটা সত্যিই একটি ‘তালা’ময় জগত্। তালা আর তালা। রেলিং, পাটাতন, গ্রিল, খিলান—কোনো জায়গা বাদ নেই, সবখানে হাজার হাজার তালা ঝুলছে। লাল, নীল, সবুজ, তামাটে হরেক তালা। তালার ভিড়ের মধ্যেই হেঁটে বেড়াচ্ছে শত শত প্রেমিক-প্রেমিকা। তারা পরস্পর কোমর জড়িয়ে সেলফি তুলছে, কেউবা তালা লাগিয়ে চাবিটা ছুড়ে দিচ্ছে মাইনের জলে। আমি ভিড় ঠেলে এক যুবকের কাছে গেলাম, বললাম ব্যাপার কী! কী হচ্ছে এখানে? যুবকটি হেসে ফেলল এবং কিছু একটা বলতে গেল, কিন্তু তার আগেই তার ফিয়াসে (প্রেমিকা) কথা কেড়ে নিল—দ্যাখো এ হলো ভালোবাসার ব্রিজ, এটা একটা গ্রেট প্লেস। এখানে তুমি তোমার প্রেমিকার নামে তালা ঝুলিয়ে চাবিটা নদীতে ফেলে দিতে পার, তাহলে তালার মতো তোমাদের ভালোবাসাও ‘লক’ হয়ে থাকবে...। এতসব যুগলের চাপে লাভব্রিজে বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না, বরং সদ্যদেখা তরুণীটির মুখ মনে রেখে ধীরে ধীরে ব্রিজের অপর প্রান্তে নেমে আনমনে হাঁটতে লাগলাম। ব্রিজে দেখা তরুণীটির কোমল মুখ তখনো আমার মাথার ভিতর একটা মোলায়েম ইমেজ হয়ে ঘুরছিল। তারপর পুরো ইমেজটা একসময় রেখাময় হতে হতে মিলিয়ে গেলে আমার এক বন্ধুর মুখ ভেসে উঠল। ক্লাস নাইনে পড়ার সময় সেই বন্ধুটি বলাকা ব্লেড দিয়ে ওর আঙুল চিরে রক্ত দিয়ে ক্লাস সেভেনের এক কিশোরীকে প্রেমপত্র লিখেছিল। রক্তাক্ত চিঠিটা হাতে পাবার পর মেয়েটি খুব রাগ করেছিল এবং পরের এক মাস মেয়েটি আর    কোনো কথা বলেনি। মেয়েটির এহেন আচরণ দেখে বন্ধুটি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। তারপর ক্লাস সেভেনের সেই কিশোরী একদিন হঠাত্ই কমলা রঙের স্পেশাল এক প্যাডে উত্তর পাঠাল। চিঠির ভিতরে গোলাপের পাপড়ি দেওয়া। চিঠি পেয়ে নিমিষেই ঝলমলে হয়ে গেল আমার সেই বন্ধুর মুখ। তারপর কয়েক বছর সে খুব যত্ন করে রেখে দিয়েছিল মেয়েটির হাত-চিঠি। সুযোগ পেলেই গোপনে ভাঁজ খুলে পড়ত, আর শুঁকে শুঁকে এমন করে বুক ভরে নিশ্বাস নিত—যেন শিশির আতর ঢেলে দেওয়া আছে মেয়েটির চিঠির ভেতর।

সেই পাপড়ি ভরা আতর মাখা চিঠি এখন আর নেই! চিঠির বদলে এসেছে ক্ষণস্থায়ী এসএমএস! সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভালোবাসা উদ্যাপনের কিংবা প্রকাশের ধরণধারণ অনেকখানি বদলে যায় নাকি! যে মানুষ পথের ভিখারিকে সামান্য দুই টাকা দিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে, সেও এখন বিনা সংকোচে মোবাইলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপ্রয়োজনীয় কথা বলে যায়। তবে আর যাই হোক, বিনামূল্যে মিসকলের অপশনটা রাখার জন্য মোবাইল কোম্পানিগুলোকে ধন্যবাদ দেওয়া যায়। আপনাকে কে কতটা ভালোবাসে, তার একটা মাঝারি গোছের জরিপ করে নিতে পারেন মিসকলের সংখ্যা দিয়ে। কাউকে একটা মিসকল করার পরপরই যদি সে কল ব্যাক করে, তাহলে ধরে নিতে পারেন—আপনার জন্য কল ব্যাককারীর ভালোবাসা প্রচুর এবং তার কাছে আপনার গুরুত্ব আছে। মিসকল যত বেশি দেবেন বা পাবেন, তত বুঝবেন ভালোবাসা হালকা হয়ে যাচ্ছে। কেউ আবার একবার মিসকল পাবার পর মোবাইল ধরে বসে থাকেন এবং দ্বিতীয় মিসকল দেওয়া মাত্র ধপ করে ধরে ফেলেন। মনে রাখবেন, এরা আপনার চেয়ে চালাক এবং কিছুটা স্যাডিস্ট কিসিমের। অন্যদিকে আছে সস্তা কথায় শুকনো এসএমএস। অধিকাংশ কপি করা কথাবার্তা। তাতে প্রেমিকের মন গললেও, চিড়ে ভেজে না। মনিটরে ভেসে ওঠা কথাগুলো যেমন সহজেই ডিলিট করা যায়, তেমনি এখন অনায়াসে ডিলিট হয়ে যায় ভালোবাসা। ভালোবাসা এখন আর তালাবন্দি হয় না বা হতে চায় না! তবে জীবনানন্দ দাশ তাঁর ‘প্রেম’ কবিতায় লিখেছেন: ‘সকল ক্ষুধার আগে তোমার ক্ষুধায় ভরে মন!/সকল শক্তির আগে প্রেম তুমি,—তোমার আসন/সকল স্থলের ’পরে,—সকল জলের ’পরে আছে!’



 প্রজন্মনিউজ২৪/এনএম

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন