আমলা নির্ভর রাষ্ট্রে নীতি-নির্ধারকদের পরিস্থিতি বুঝা কঠিন

প্রকাশিত: ০১ এপ্রিল, ২০২০ ০৯:১৭:৩৭

২০২০ সাল। একবিংশ শতাব্দীর এই বছরটিকে মানুষ মনে রাখবে একটি ভাইরাসের কারণে। ‘করোনা’ যার নাম; কিংবা ‘কোভিড-১৯’। ২০২০ সালের সূর্য যেদিন প্রথম আকাশে উদিত হয় সেদিন কি আমরা আঁচ করতে পেরেছিলাম স্বাধীনতার মাসে আমাদেরকে ঘরে ঢুকে যেতে হবে অনিশ্চিত সময়ের জন্য? একটা ভাইরাস কীভাবে আমাদের সবাইকে একই কাতারে এনে দাঁড় করিয়েছে!

যাঁদেরকে আমরা সবচেয়ে প্রভাবশালী, ক্ষমতাধর বলে জানতাম সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, স্পেনসহ অনেক দেশ বর্তমানে করোনা ভাইরাসের আক্রমণে ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে। প্রতিদিন শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে সেসব ‘উন্নত’ দেশে। চীন দিয়ে শুরু হলেও করোনা ভাইরাসের এই প্রাণঘাতী যাত্রা কোথায় কবে থামবে কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না।

বাংলাদেশও আজ স্থবির। দেশের অর্থনীতি, স্কুল-কলেজ সবখানে এক নিস্তব্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যদিও সরকারের সময়োচিত সিদ্ধান্তে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস এখনো পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর মত প্রাণঘাতী হতে পারেনি। তাছাড়া বাংলাদেশের আবহাওয়া কোন বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে কি না সেটা গবেষণা করে বলতে হবে। তবে এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়োচিত নানাবিধ সিদ্ধান্তে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস এখন পর্যন্ত মহামারি আকার ধারন করতে পারেনি। আত্মঘাতী বাঙালী বিশেষ করে ধর্মব্যবসায়ীরা সমাজে করোনা-বান্ধব পরিস্থিতি সৃষ্টি করার অপপ্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু জনগণের সচেতন বিরোধিতা ও সরকারের সঠিক অবস্থানে এই বকধার্মিকের দল পরাজিত হচ্ছে। বাঙালি বীরের জাতি।

অতীতে অনেক দুর্যোগ মোকাবেলা করেই এই জাতির আত্মপ্রকাশ, টিকে থাকা ও এগিয়ে যাওয়া। করোনাও বাংলাদেশে পরাজিত হবে যদি আমরা প্রধানমন্ত্রীর প্রতিটি নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে পালন করি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেদিন অনেক সময় নিয়ে সারা দেশের ডিসি, পুলিশ সুপার, সিভিল সার্জন, জনপ্রতিনিধি, আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে কথা বলেছেন। নার্স, সুস্থ হয়ে যাওয়া করোনা রোগীও সেদিন প্রধানমন্ত্রীর সাথেও কথা বলেছেন। আমলাতন্ত্রের নিজস্ব একটা ভাষা, কৌশল থাকে। প্রায় সবাই বলেছেন, তাদের স্ব স্ব দায়িত্ব পালনে কোন ধরনের সমস্যা বা সংকট নেই!! আমলাদের কথা শুনে মনে হচ্ছিল আমরা মনে হয় স্বর্গে আছি। প্রধানমন্ত্রী ঠিকই বুঝতে পারছিলেন সব কিছু। তাই তিনি অলিগলির খবর নেয়ার চেষ্টা করছিলেন।

আমি একটা প্রস্তাবনা এখানে তুলে ধরছি। রাষ্ট্রে যে শুধু আমলা থাকে তা তো নয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চাইলে বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, উন্নয়নকর্মী, জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ, সমাজকর্মী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, কৃষক, শ্রমিকসহ সমস্ত শ্রেণিপেশার মানুষের প্রতিনিধিদের সাথে এখন এমন ভিডিও কনফারেন্স করতে পারেন। এই প্রতিনিধিরা সমাজের সমস্যাগুলো এবং তাদের চোখে বর্তমান পরিস্থিতি নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ঠভাবে বঙ্গবন্ধু কন্যার সামনে তুলে ধরবেন। এক সাথে করতে হবে এমন নয়। বিজ্ঞানীদের সাথে ভিডিও কনফারেন্স করলেন এক সপ্তাহে। আরেক সপ্তাহে অর্থনীতিবিদদের সাথে। আরেকদিন সাংবাদিক, সমাজবিজ্ঞানীদের সাথে। এতে করে পুরো সমাজের চিত্র আরো পরিষ্কারভাবে প্রধানমন্ত্রীর সামনে উঠে আসবে।

পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে সরকারের করণীয়গুলো সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যাবে। একটা উদাহরণ দেই। দেশের গণমাধ্যম শিল্পের সামনে এখন ভয়াবহ সংকট। বহু সাংবাদিক চাকরি হারাবে। ইতোমধ্যে হারিয়েছে। আরো হারাবে। করোনা ভাইরাসের জন্য অনেক পত্রিকা, টিভি চ্যানেলের মালিকপক্ষ মূল ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রথমেই অসহায় সাংবাদিকদের চাকরি খেয়ে ফেলবে। গার্মেন্টস শিল্পে সরকার যেমন প্রণোদনা দেয়, সংবাদপত্র শিল্পেও দেয়া উচিত। আমার ধারনা এমন অনেক বিষয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে প্রস্তাবিত ভিডিও কনফারেন্সে উঠে আসবে। এমন করতে পারলে করোনার প্রভাব মোকাবেলায় বাংলাদেশ আরো সক্ষম হয়ে উঠবে।

আমলা-নির্ভর রাষ্ট্রে সহজে দেশ ও সমাজের প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝে উঠা নীতি-নির্ধারকদের পক্ষে সম্ভব হয় না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমলাতন্ত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন। বাকশাল ছিল মূলত ব্রিটিশ ও পাকিস্তানী আমলের জনস্বার্থ-বিরোধী আমলাতন্ত্র পরিবর্তন করার মহা-পরিকল্পনা। বাকশালকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’। বাকশাল বাস্তবায়নের আগেই জাতির পিতাকে হত্যা করে অন্ধকারের শক্তি। বাকশাল বাস্তবায়িত হলে সুনিশ্চিতভাবেই দেশের কৃষক, শ্রমিক ও সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ আজীবনের জন্য উপকৃত হত। যাই হোক, এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে বাকশাল নিয়ে আলোচনা শেষ হবে না।

মূল প্রস্তাবনায় আসি। দেশের জনপ্রশাসনের নানা স্তরে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অনেক ইতিবাচক ভূমিকা রাখছেন, কোন সন্দেহ নেই। আবার এদেশের অফিসগুলোতে কী পরিমাণ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আছে সেটিও আমরা কম-বেশী জানি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি দেশের বিভিন্ন পেশাজীবী বিশেষ করে ডাক্তার, বিজ্ঞানী, সাংবাদিক, অর্থনীতিবিদ, তৃনমূলের নেতা-কর্মী, কৃষক ও শ্রমিকদের সাথে এই অবস্থায় ভিডিও কনফারেন্স করে পরিস্থিতির খবর নিতেন আমি বিশ্বাস করি এতে পুরো বাংলাদেশ উপকৃত হবে আরো বেশি।

লেখক: সভাপতি, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন





ব্রেকিং নিউজ