সেন্সরবিহীন লিফট এক ধরনের মরণফাঁদ

প্রকাশিত: ০৯ জুন, ২০২৪ ০৬:২৯:১৮

সেন্সরবিহীন লিফট এক ধরনের মরণফাঁদ

নিউজডেস্ক: বহুতল ভবনে ওঠা-নামার সহজ যন্ত্র হলো লিফট। শুধু রাজধানীতেই বহুতল ভবনগুলোতে প্রতি মাসে অন্তত দুইশত লিফট স্থাপন হচ্ছে। ফলে প্রতি বছর এ সেক্টরের ব্যবসা আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে। যারা নিয়মিত লিফট ব্যবহার করেন তাদের এখন নতুন করে লিফট সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আগ্রহী করে তুলেছে। ঠিক কি-কি কারণে লিফট দুর্ঘটনা হয় এবং বিশেষ করে লিফটের অকার্যকর সেন্সর বা সেন্সর ব্যবস্থা না থাকলে সাবধানতা অবলম্বনের উপায়ও জানতে চান অনেকে।

আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর লিফটে অনেকগুলো নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য থাকে। এর মধ্যে সেন্সর অন্যতম। লিফটের ভেতর একটি কম্পিউটার স্থাপিত সেন্সর থাকে, এই সেন্সরই আসলে লিফটের চালিকা শক্তি। লিফট ডাকার জন্য যে বাটন থাকে, তাতে চাপ দিলে সেন্সরে খবর পৌঁছে যায় এবং লিফট বুঝতে পারে যে তাকে কোন তলা থেকে ডাকা হচ্ছে। কিন্তু  দেশে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী তুলনামূলক স্বল্পদামে চাইনিজ মোটর, নিম্ন মানের কেবিন ও ইলেকট্রিক সরঞ্জাম যুক্ত করে কথিত লিফট  তৈরি করছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে “জিনজিরার মতো” স্টাইলে এসব লিফট তৈরির কারখানাও গড়ে উঠেছে। অতি মুনাফার লোভে বহুতল আবাসিক ভবনে এসব ঝুঁকিপূর্ণ লিফট বসানো হচ্ছে।

বহুলত ভবনে নিুমানের লিফট এবং এ সংক্রান্ত দুর্ঘটনার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে প্রকৌশলরা জানান, বাংলাদেশে যেসব লিফট বহুতল ভবনগুলোতে স্থাপন করা হচ্ছে তা মানসম্পন্ন কিনা যাচাই করা এখন খুব জরুরি। এটা বিএসটিআইকে (বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউট) দিয়ে পরীক্ষা করাতে হবে। বিএসটিআই ফিটনেস সনদ দিলেই সেটি ব্যবহার করা যাবে। নইলে নয়।

নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যের ঘাটতি: প্রকৌশলীরা বলছেন, নিম্ন মানের লিফটে সেন্সর ব্যবস্থা থাকে না। আবার রক্ষণাবেক্ষণ ঝামেলা এড়াতে অনেকে লিফটের ধারণক্ষমতা চিহ্নিতকারী স্বয়ংক্রিয় সেন্সর বন্ধ রাখেন। ফলে মাত্রাতিরিক্ত আরোহী ওঠানামা করলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে লিফট বন্ধ হয় না। তাছাড়া সেন্সর না থাকলে নির্ধারিত সময়ের আগেই লিফট চলতে শুরু করে। এতে আরোহী লিফট গহ্বরে পড়ে যেতে পারেন। বেশির ভাগ সময় সেন্সরবিহীন লিফটের দরজাও আকস্মিক দুদিক থেকে আরোহীকে সজোরে ধাক্কা দেয় বা ভয়ঙ্করভাবে চেপে ধরে। এমনকি সেন্সর অচল থাকলে কেবিনে পুরোপুরি ঢোকার আগেই লিফট চলতে শুরু করে। এতে প্রাণহানির আশঙ্কা দেখা দেয়। আমাদের দেশের লিফট সরবরাহকারীরা বেশি লাভের জন্য সেন্সরের সংখ্যা কমিয়ে দেন, আবাসন কোম্পানিগুলোও খরচ কমাতে লিফটে সেন্সর সংখ্যা কমিয়ে বা সেন্সরবিহীন লিফট লাগায়, এতেই ঘটে যেতে পারে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।

সেন্সর ঠিকমতো থাকলে লিফটে আটকে কখনও মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে না। এছাড়া অনেক সময় সেন্সর বিকল হয়ে যেতে পারে। সেজন্য প্রতিটি লিফটে দুর্ঘটনা প্রতিরোধী রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাও রাখতে হয়। অর্থাৎ নষ্ট হওয়ার আগেই নির্দিষ্ট সময় অন্তর রক্ষণাবেক্ষণ করা। কারা কখন লিফট রক্ষণাবেক্ষণ কাজ করেছেন তাদের স্বাক্ষরযুক্ত একটি তালিকাও লিফটের ভেতরে টাঙিয়ে রাখার নিয়ম রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লিফটের সেন্সর এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে ধারণক্ষমতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। নির্ধারিত ওজন ধারণক্ষমতার বেশি হলেই অটোমেটিক সংকেত বেজে ওঠে এবং লিফটের চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তাছাড়া উন্নতমানের লিফটে সেন্সর ছাড়া আরও অন্তত ২৪টি নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য থাকে। এগুলোকে ইএন-৮১ সেফটি স্ট্যান্ডার্ড কোড বলা হয়। এর মধ্যে স্পিড গভর্নর ও কন্ট্রোলার স্টপ সুইচসহ অন্তত ৫টি বৈশিষ্ট্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর যে কোনো একটি না থাকলে বা সাময়িকভাবে বন্ধ করা হলে লিফট ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ।

লিফটে স্পিড গভর্নর এর মাধ্যমে দরজার দুটি অংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। নির্দিষ্টসংখ্যক আরোহী ওঠার পর দরজার দুটো অংশ মিলিত হয়। এরপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় সংকেত গেলে লিফট চলতে শুরু করে। কিন্তু কোনো কারণে এ ব্যবস্থাটি বন্ধ থাকলে ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অকার্যকর থাকায় অনেক সময় দরজার দুটো অংশ ঠিকমতো মিলে যাওয়ার আগেই লিফটের কেবিন চলতে শুরু করে। ফলে কেবিনে ওঠার আগেই আরোহী লিফট গহ্বরে পড়ে গেলে মৃত্যু নিশ্চিত।

প্রকৌশলীরা বলছেন, লিফটে সাধারণত দু-তিনটি কমন অসুবিধা হয়ে থাকে। যেমন লিফটের দরজা ঠিকমতো না লাগা, ওঠানামার সময় কাঁপতে থাকা বা ঘড়ঘড় শব্দ হওয়া ইত্যাদি। স্থাপনের পর নিরবচ্ছিন্ন রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়া চালু থাকলে লিফটে এ ধরনের সমস্যা হয় না। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ও খরচ এড়িয়ে যাওয়ার জন্য অনেক অসৎ ব্যবসায়ী ভয়ঙ্কর পথ বেছে নেন। তারা লিফটের কয়েকটি নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য বন্ধ করে দেন। এ ধরনের লিফটে ওঠা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

বিল্ডিং কোডে যা আছে : বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ১৯৯৩-এর ৮ নম্বর অধ্যায়ের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে লিফট স্থাপন ও পরিচালনার সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এতে লিফট স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার বিস্তারিত উল্লেখ করা আছে। বিল্ডিং কোড লঙ্ঘন করলে সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধানও রয়েছে।

দুর্ঘটনায় যা করতে হবে : লিফটে থাকা অবস্থায় কোনো দুর্ঘটনায় পড়লে মাথায় হাত দিয়ে দ্রুত শুয়ে পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এতে ক্ষতির পরিমাণ কম হবে। কারণ লিফট নিচে পড়া শুরু করলে মধ্যাকর্ষণজনিত কারণে প্রতি মুহূর্তেই বাড়তে থাকে ‘ভরবেগ’। ফলে লিফটের কেবিনটি মাটিতে আছড়ে পড়ার সময় শরীরের ওজন প্রকৃত ওজনের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি হয়ে যায়। এই অতিরিক্ত ওজনের ফলে দুর্ঘটনার সময় সজোরে ধাক্কা খাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এতে পা ও ঘাড় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে লিফটে ওঠার সময় দরজায় কাপড় আটকেও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কারণ লিফটের সেন্সরে কাপড় চিহ্নিত হয় না। তাই লিফটে ওঠার সময় সতর্ক থাকতে হবে।

এছাড়াও লিফট ব্যবহারে আরো কিছু সচেতনতা অবলম্বলন করা যেতে পারে,

-লিফটের দরজার লাইনের ওপর ব্যক্তির উপস্থিতি যাচাই করে লিফট খোলে বা বন্ধ হয়। তবে অনেক সময় এই সেন্সর কাজ না-ও করতে পারে। সেক্ষেত্রে কোনো  অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে লিফটে ওঠার আগে দরজার মাঝ বরাবর বা পাশে হাত রাখবেন। এতে আগে থেকেই বুঝতে পারবেন সেন্সর কাজ করছে কি না এবং সে  অনুযায়ী পরিস্থিতি বুঝে লিফট ব্যবহার করবেন।

-লিফটে উঠেই যে ফ্লোরে যাবেন, সেই বাটন প্রেস করার পর লিফটের প্রয়োজনীয় কিছু বাটন, যেমন ইমার্জেন্সি বাটন,স্টপ বাটন এগুলো আছে কি না, দেখে নিন। হঠাৎ  ইলেকট্রিসিটি চলে গেলে অথবা লিফটে যান্ত্রিক গোলযোগ হলে এই বাটনগুলো ব্যবহার করতে হতে পারে।

-ধারণক্ষমতা অতিক্রম করছে কি;না লক্ষ্য রাখুন। সব লিফটেরই একটি নির্দিষ্ট ধারণক্ষমতা থাকে, সেই ধারণক্ষমতার বাইরে লোকসংখ্যা লিফটে উঠলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।  তাই ধারণক্ষমতার মধ্যে ওঠানামা করা উচিত।

-ফায়ার অ্যালার্ম বেজে উঠলে লিফট ব্যবহার করবেন না। ভবনে আগুন লেগে ফায়ার অ্যার্লাম বাজলে হন্তদন্ত হয়ে লিফটে না উঠে ইমার্জেন্সি এক্সিটের জন্য যে সিঁড়ি  আছে, সেখান দিয়ে নামুন। কারণ, ভবনে আগুন ছড়িয়ে পড়লে যান্ত্রিক ত্রুটি হয়ে লিফট বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

-স্টপ বাটনে যেন চাপ না পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখুন। বিশেষ করে শিশুরা লিফটে উঠলে এই বিষয়টি নিয়ে সতর্ক থাকা উচিত। খেলাচ্ছলে শিশুরা অনেক সময় লিফটের  বাটন চেপে দেয়। তাই শিশুদের নিয়ে লিফটে উঠলে অবশ্যই এই বিষয়টি লক্ষ রেখে সাবধানতা অবলম্বন করবেন। এ ছাড়া শিশুরা যেন লিফটের দুই দরজার মাঝে হাত না  রাখে বা দরজা থেকে সব সময় একটু দূরে দাঁড়ায় সেই বিষয়টিও লক্ষ রাখবেন।

-হঠাৎ লিফট বন্ধ হয়ে গেলে আতঙ্কিত হয়ে পড়বেন না। ইমার্জেন্সি কল বাটন বা ইমার্জেন্সি ফোনকল করে বিষয়টি সমাধান করার চেষ্টা করুন। যে লিফটে আপনি নিয়মিত  ওঠানামা করেন, সেটিতে কোনো রকম সমস্যা দেখলে অবশ্যই বিল্ডিংয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকজনকে জানিয়ে দিন। আগে থেকে পদক্ষেপ গ্রহণ করলে পরবর্তী সময়ে হঠাৎ  কোনো দুর্ঘটনা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পৃথিবীর উচ্চতম অট্টালিকা বুর্জ খলিফার (৮১৮ মিটার) কোনো কোনো লিফটের গতিবেগ ঘণ্টায় ৪০ মাইল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৮১ মিটার উঁচু গগনচুম্বী অট্টালিকা‘এম্পায়ার স্টেট’বিল্ডিংয়ে এলিভেটর বা লিফট রয়েছে ৭৩টি। এসব লিফটে কখনও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ লিফট ব্যবহার করছে। কারণ এর প্রযুক্তিগত সব দিক সার্বক্ষণিক মনিটরিং নিশ্চিতভাবে করা হয়। ফলে উন্নত বিশ্বে লিফট ব্যবহার কোনো আতঙ্কের বিষয় নয়, বরং স্বাচ্ছন্দ্যের।


 


প্রজন্মনিউজ২৪/এসএ

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন





ব্রেকিং নিউজ