ব্যাটারী চালিত রিকশার ভবিষ্যৎ কী!

প্রকাশিত: ২১ মে, ২০২৪ ১১:৩০:৩৩

ব্যাটারী চালিত রিকশার ভবিষ্যৎ কী!

অনলাইন ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে সরকার। গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকে সরকারপ্রধান নির্দেশ দিয়েছেন– চালকদের জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থা না করে বন্ধ করা যাবে না ব্যাটারিচালিত রিকশা। এসব রিকশা চলাচল নিয়মের মধ্যে আনতে শিগগির করতে হবে নীতিমালা। তবে ব্যাটারিচালিত রিকশাকে বৈধতা দিতে কীভাবে, কোন সংস্থা নিবন্ধন দেবে, তা স্পষ্ট নয়।

গত ১৫ মে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) উপদেষ্টা পরিষদের সভা থেকে রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং ২২ জাতীয় মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহন চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নির্দেশনা আসে। এর পর পুলিশ ব্যাটারিচালিত রিকশা আটক শুরু করে। এর প্রতিবাদে আন্দোলনে নামেন চালকরা। গত দুই দিন পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয় বিভিন্ন স্থানে। ফলে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হলেও এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী ব্যাটারিচালিত রিকশাসহ সমজাতীয় যানবাহনকে নিয়মের আওতায় এনে চলাচলের সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেন।


রিকশা, ভ্যান, ঠেলাগাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি– এমন ২ লাখ ৩৩ হাজার অযান্ত্রিক যান রাজধানীতে চলে দুই সিটি করপোরেশনের নিবন্ধনে। চলছে অনুমোদনবিহীন লাখ দুয়েক ব্যাটারি ও ইঞ্জিনচালিত রিকশা, ভ্যান ও ইজিবাইক। এসব যানবাহন বন্ধে হাইকোর্টের আদেশ রয়েছে। বিআরটিএও নিবন্ধন দেয় না।

মন্ত্রিসভায় ব্যাটারিচালিত রিকশা

মন্ত্রিপরিষদ সচিব মাহবুব হোসেন মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর সাংবাদিকদের জানান, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচলে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি জানতেন না প্রধানমন্ত্রী। সরকারপ্রধান বলেছেন, বিকল্প ব্যবস্থা না করে চালকদের জীবিকায় হাত দেওয়া উচিত হয়নি।

নীতিমালার মাধ্যমে রিকশাচালকদের নিয়মের মধ্যে আনা হবে। করা হবে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। এ ছাড়া এসব যানবাহন চলাচলের জন্য রাস্তা এবং গতিসীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হবে বলেও প্রধানমন্ত্রীর বরাত দিয়ে জানান সচিব মাহবুব হোসেন।
প্রায় একই কথা জানান সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, বিশ্ব পরিস্থিতি ও স্বল্প আয়ের মানুষের কষ্টের কথা বিবেচনা করে শুধু ঢাকা শহরে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের অনুমতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তবে ২২ মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ থাকবে। ব্যাটারিচালিত রিকশা ঢাকার মূল সড়কেও চলতে পারবে না। চলবে শুধু অলিগলিতে।

বৈধতা দিতে নীতিমালা শিগগির

জীবিকা রক্ষার যুক্তিতে ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান, নছিমন-করিমন ও ভটভটিকে বৈধতা দিতে ২০২১ সালের নভেম্বরে নীতিমালার খসড়া করে সড়ক পরবিহন ও মহাসড়ক বিভাগ। আড়াই বছরেও তা চূড়ান্ত হয়নি। সড়ক পরিবহন বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (আইন) সাইফুল ইসলাম সমকালকে বলেন, কাজ শেষের পথে। এ মাসেই নীতিমালা চূড়ান্ত হতে পারে।  

‘থ্রি-হুইলার ও সমজাতীয় মোটরযানের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা’র খসড়ায় বলা হয়েছে, সারাদেশে নিবন্ধিত যানবাহনের মাত্র দেড় শতাংশ বাস ও মিনিবাস। সারাদেশে রেজিস্ট্রেশনহীন এ রকম অনেক যানবাহন চলছে। এসব গাড়ি কারিগরিভাবে সড়কের উপযোগী নয়। ব্রেক, স্টিয়ারিং ও সাসপেনশন মানসম্মত নয়। ফলে দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে চলাচলের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। সড়কে হতাহতের বড় অংশই এসব ছোট যানবাহনের যাত্রী। তবে সাশ্রয়ী হওয়ায় স্থানীয়ভাবে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন এসব যানবাহনের ওপর নির্ভরশীল। তাই এসব যানবাহনকে নিবন্ধন দিয়ে নিয়মের মধ্যে আনা প্রয়োজন।

খসড়ার ৬ ধারায় বলা হয়েছে, ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে অনুমতি নিয়ে চলতে পারবে। এ গাড়ির সংখ্যা নির্ধারণ করবে উপজেলা সড়ক নিরাপত্তা কমিটি। নির্ধারিত সংখ্যার বেশি বিক্রি ও নিবন্ধন করা যাবে না। যাত্রী সুরক্ষায় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদিত নকশায় ইজিবাইক তৈরি হতে হবে। বিদ্যুৎ বিভাগের চার্জিং নীতিমালা মেনে লাগাতে হবে মানসম্মত ব্যাটারি। সিটি করপোরেশন, বিভাগীয় ও জেলা শহরের প্রধান সড়ক বাদে আগামী দুই বছর অলিগলিতে চলতে পারবে। এর পর নিষিদ্ধ হয়ে যাবে।

বিআরটিএ চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার বলেন, রিকশাসহ অযান্ত্রিক যানের নিবন্ধন দেয় সিটি করপোরেশনের মতো স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো। যান্ত্রিক যানের নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব বিআরটিএর। ব্যাটারি রিকশা, ইজিবাইক বিষয়ে কী হবে, তা মন্ত্রণালয় বলতে পারবে।

রিকশা, ব্যাটারি রিকশা, ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক খালেকুজ্জামান লিপন সমকালকে বলেন, দ্রুত নীতিমালা চাই। আইনের মধ্যে থেকে বৈধ হয়ে রিকশা চালাতে চাই, যাতে কেউ আমাদের ওপর চাঁদাবাজি করতে না পারে। প্রধানমন্ত্রী ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের অনুমতি দেওয়ায় ২৭ মে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ঘেরাও হবে না। নিবন্ধন, রুট পারমিট এবং চালকের লাইসেন্সের দাবি জানিয়ে সেদিন স্মারকলিপি দেওয়া হবে।

সিটি করপোরেশন এখন কী করবে

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) নিবন্ধিত প্যাডেলচালিত রিকশা-ভ্যানের সংখ্যা ৩০ হাজার ১০০। বিপরীতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) নিবন্ধিত অযান্ত্রিক যানবাহন রয়েছে ২ লাখ ১২ হাজার ৯৯৭টি। এসবের মধ্যে অল্পসংখ্যক ভ্যান, ঠেলাগাড়ি ও ঘোড়ার গাড়ি রয়েছে। তবে মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীর এ রকম সিদ্ধান্ত দেওয়ার বিষয়ে কথা বলতে বিব্রত বোধ করছেন দুই সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। কেউ কেউ বলছেন, মন্ত্রিসভা বা মন্ত্রণালয়ের চিঠির নির্দেশনা অনুসরণ করেই তারা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন। যদি সরকার তাদের বৈধতা দেয়, তাহলে সিটি করপোরেশনও নিবন্ধন দেবে। ডিএনসিসির মুখপাত্র মকবুল হোসেন বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে গতকাল পর্যন্ত এ ধরনের কোনো নির্দেশনা আসেনি। নির্দেশনা পেলে সে অনুযায়ী সিটি করপোরেশন পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে। ডিএসসিসির মুখপাত্র আবু নাছের একই কথা জানান।
 
রয়েছে আদালতের নিষেধাজ্ঞা

হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০২১ সালের ১৫ ডিসেম্বর ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক বন্ধের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে এগুলো আমদানি ও ক্রয়-বিক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা দেন। এর দু’দিন আগে ১৩ ডিসেম্বর বাঘ ইকো মোটরস লিমিটেডের সভাপতি কাজী জসিমুল ইসলামের করা হাইকোর্টে রিটের শুনানি শেষে এ রায় দেন আদালত। তখন বলা হয়, ‘ইজিবাইকে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হয়। এসব যান পরিবেশ ও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর।’
 
তবু বাড়ছে ব্যাটারিচালিত যানবাহন

এক যুগ ধরেই ব্যাটারিচালিত যানবাহন নিয়ে সরকারের দ্বৈত অবস্থান চলছে। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় নিবন্ধন না দিলেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইজিবাইক আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। সরকার রিকশায় ব্যাটারি সংযোজনকে বৈধতা না দিলেও ব্যাটারি এবং মোটর আমদানি বৈধ।

যাত্রী কল্যাণ সমিতি এবং রিকশা, ব্যাটারি রিকশা, ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্যান এবং ইজিবাইকের সংখ্যা ৪০ লাখের বেশি। কর্মসংস্থানের ঘাটতি থাকায় লাখ লাখ চালক এসব যানবাহন ভাড়ায় চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সরকারের নীতির দ্বৈততা ও বেকারত্বে বাড়ছে ব্যাটারিচালিত যানবাহন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশকে ম্যানেজ করেও ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা বাড়ছে। ডিএসসিসি ও পুলিশ মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে কিছু যান জব্দ করে ডাম্পিং করে।

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় ব্যাটারিচালিত যানবাহন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। কারিগরি মান ঠিক না থাকায় সড়ক-মহাসড়কে এসব বাহন দুর্ঘটনার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হাদীউজ্জামান সমকালকে বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা খুবই অনিরাপদ। মোটর থাকায় যে গতিতে চলে, তা এর কাঠামোর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এসব যান লাখো মানুষের জীবিকা তৈরি করেছে, যাত্রীরাও নির্ভরশীল এসব যানবাহনের ওপর। ফলে বন্ধ করা কঠিন। কিন্তু কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে সড়কে নিরাপদে চলাচল উপযোগী করা সম্ভব। এর পর নিবন্ধন এবং চালককে প্রশিক্ষণ দিয়ে লাইসেন্স দিলে কিছুটা হলেও সমাধান হবে। কিন্তু রাতারাতি বন্ধ করা যাবে না। বরং আয়ুষ্কাল এবং সংখ্যা নির্ধারণ করে দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত, যাতে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়।


প্রজন্মনিউজ২৪/মুন্তাসিম

এ সম্পর্কিত খবর

নেতানিয়াহুকে ‘খুঁজে বের করে হত্যার’ অঙ্গীকার ইরানের বিপ্লবী গার্ডের

সংস্কার পরিষদের অধিবেশন না ডাকলে রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি

‘আশা করি আমাদের ভবিষ্যৎ সংসদ অধিবেশন দেখে জাতি অনেকটা আশ্বস্ত হবে’

মধ্যপ্রাচ্যের কিছু রুটে ফ্লাইট চলাচল পুনরায় শুরু

১ লাখ স্বাস্থ্য কর্মী নিয়োগ দেবে সরকার, ৮০ হাজারই নারী

যারা জনগণের ভোগান্তির কারণ হবেন, তাদের ছাড় নেই: গণপূর্তমন্ত্রী

খাদেম হত্যাকান্ডের অভিযোগে সুরেশ্বর দরবারের পীর অস্ত্রসহ আটক

রাজধানী থেকে চাঁদাবাজদের তালিকা প্রস্তুত করে অভিযান চালানো হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী  

বরগুনায় জবাইকৃত ২টি হরিনসহ আটক ১

ইরানের ৩১ প্রদেশের ২০টিতেই হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ