রাবিতে সাড়ে ছয় বছরে আত্মহত্যায় ঝরল ১৬ শিক্ষার্থীর প্রাণ

প্রকাশিত: ২১ অগাস্ট, ২০২৬ ০২:৫২:২২

রাবিতে সাড়ে ছয় বছরে আত্মহত্যায় ঝরল ১৬ শিক্ষার্থীর প্রাণ

রাবি প্রতিনিধি: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা ক্রমেই উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। গত সাড়ে ছয় বছরে অন্তত ১৬ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের বাইরে মেস, ছাত্রাবাস কিংবা ভাড়া বাসায় অবস্থান করছিলেন।

সর্বশেষ গত ১০ জুন ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মাহফুজুর রহমানের ঝুলন্ত মরদেহ একটি ছাত্রাবাস থেকে উদ্ধার করা হয়। এর আগে সম্প্রতি গণিত বিভাগের এক শিক্ষার্থী প্রকাশ্যে বিষাক্ত পদার্থ পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করলে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মহত্যা প্রতিরোধ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও জনসংযোগ দপ্তরের তথ্য এবং বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

২০১৯ সালের ২৮ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত গণিত বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফিরোজ কবীরের মরদেহ ক্যাম্পাসসংলগ্ন আমজাদের মোড় এলাকার একটি মেস থেকে উদ্ধার করা হয়। এরপর ২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর পটুয়াখালীতে নিজ বাড়িতে মারা যান নৃবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী দেবজ্যোতি বসাক পার্থ।

২০২১ সালের ৩০ জানুয়ারি নগরীর মির্জাপুর এলাকার একটি আবাসিক ছাত্রী হোস্টেল থেকে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মোবাসসিরা তাহসিন ইরার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ইমরুল কায়েস নিজ বাড়িতে মারা যান।

২০২২ সালে একাধিক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ওই বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ইশতিয়াক মাহমুদ পাঠান, ৯ এপ্রিল প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী সোহাগ খন্দকার এবং ১৩ মে ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া তাবাসসুমের মৃত্যু হয়। একই বছরের ৬ জুন নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাতুল মাওয়া দিশা এবং ২৬ সেপ্টেম্বর অর্থনীতি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ছন্দা রায়ের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

২০২৩ সালের ২০ জানুয়ারি চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাইমা আরাবী ইভার মৃত্যু হয়। একই বছরের ৮ জুন লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী তানভীর ইসলাম রিতুর মরদেহ বিনোদপুরের একটি মেস থেকে উদ্ধার করা হয়। ১০ সেপ্টেম্বর শহীদ শামসুজ্জোহা হলের একটি কক্ষ থেকে সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী ফুয়াদ আল খতিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এরপর ২০২৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ফিশারিজ বিভাগের শিক্ষার্থী সিফাতুল্লাহর মরদেহ মেহেরচণ্ডী এলাকার একটি ছাত্রাবাস থেকে উদ্ধার করা হয়। একই বছরের ১২ নভেম্বর শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী সোনিয়া সুলতানার মরদেহ মির্জাপুরের একটি আবাসিক ভবন থেকে উদ্ধার করা হয়।

৩১ ডিসেম্বর বিনোদপুরের লেবুবাগান এলাকার একটি মেস থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী লামিসা নওরীন পুষ্পিতার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি মেহেরচণ্ডী এলাকার একটি ছাত্রাবাস থেকে সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী জুবাইদা ইসলাম ইতির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

সর্বশেষ গত ১০ জুন ‘আয়েশা টাওয়ার’ নামের একটি ছাত্রাবাস থেকে ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাহফুজুর রহমানের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

হলের বাইরে কেন বেশি ঘটনা?
ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মৃত্যু ঘটেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে। মেহেরচণ্ডী, মির্জাপুর, বিনোদপুর ও আমজাদের মোড় এলাকার বিভিন্ন মেস ও ছাত্রাবাসে এসব ঘটনা ঘটেছে।

হলের বাইরে অবস্থান করায় শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন আচরণ, মানসিক পরিবর্তন কিংবা ব্যক্তিগত সংকট অনেক সময় শিক্ষক, সহপাঠী কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নজরের বাইরে থেকে যায়। ফলে সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের দ্রুত শনাক্ত করে সহায়তার আওতায় আনার সুযোগও কমে যায়।

তবে মেসে থাকা আত্মহত্যার সরাসরি কারণ—এমন কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মানসিক চাপ, একাকীত্ব ও সম্পর্কের টানাপোড়েন

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক প্রত্যাশা, আর্থিক সংকট, সম্পর্কের টানাপোড়েন, ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা ও একাকীত্বসহ নানা বিষয় শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করতে পারে। তবে প্রতিটি আত্মহত্যার পেছনে নির্দিষ্ট কারণ আলাদাভাবে তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রধান চিকিৎসক অধ্যাপক মুর্শিদা ফেরদৌস বিনতে হাবিব বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতার পেছনে সামাজিক, মানসিক ও আর্থিক বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। প্রেম বা সম্পর্কজনিত টানাপোড়েন, পারিবারিক কলহ, আর্থিক সংকট, একাকীত্ব ও হতাশা থেকেও আত্মহত্যার চিন্তা তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের পরিবার, শিক্ষক ও বন্ধুদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখা এবং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা প্রয়োজন। দীর্ঘসময় হতাশা বা বিষণ্ণতা অনুভব করলে দ্রুত মনোবিজ্ঞানী বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

‘মেসে থাকা আত্মহত্যার সরাসরি কারণ নয়’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবর রহমান বলেন, মেসে থাকা বা আবাসিক হলে থাকার সঙ্গে আত্মহত্যার সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। তবে মেসে শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে একা থাকায় সেখানে এমন ঘটনা ঘটতে পারে।

তার মতে, মানসিক সমস্যা, হতাশা, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারা এবং সাম্প্রতিক সময়ে সম্পর্কজনিত টানাপোড়েন শিক্ষার্থীদের মানসিক সংকটের অন্যতম কারণ হতে পারে।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের সুস্থ মানসিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে খেলাধুলা, সহশিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়ানো প্রয়োজন। মানসিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও বিভিন্ন সেলের মাধ্যমে কাউন্সেলিং দেওয়া হচ্ছে।

শুধু কাউন্সেলিং নয়, দরকার আগাম শনাক্তকরণ

শিক্ষার্থীদের মতে, আত্মহত্যা প্রতিরোধে শুধু ঘটনার পর ব্যবস্থা নিলে হবে না; সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের আগেই শনাক্ত করে সহায়তার আওতায় আনা জরুরি। প্রতিটি বিভাগ ও আবাসিক হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম, নিয়মিত কাউন্সেলিং এবং সহজে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে মেস ও ছাত্রাবাসে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্যও সংকটকালীন সহায়তার ব্যবস্থা করার দাবি উঠেছে।

শিক্ষার্থীদের অকাল মৃত্যু ঠেকাতে তাই শুধু প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়—পরিবার, শিক্ষক, সহপাঠী, হল প্রশাসন এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সমন্বিত ভূমিকা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
 

এ সম্পর্কিত খবর

ঘুমন্ত অবস্থায় সাপের কামড়ে ৫ বছরের শিশুর মৃত্যু

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ইরানের রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ

অন্তর্বর্তী সরকারের শ্বেতপত্রের আদলেই বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে: প্রধানমন্ত্রী

সরকারি চাকরিতে ভাইভার নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি ছাত্রশিবিরের

ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুরু হচ্ছে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান, উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী 

শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড অপেক্ষা করছে, তাকে ধরে আনতে চাই: তথ্য উপদেষ্টা

আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর থেকে ইনকাম কমে গেছে: ব্যারিস্টার খোকন

সড়ক দুর্ঘটনায় আগস্টে ঝরল ৪৮১ প্রাণ: রোড সেফটি ফাউন্ডেশন

স্কুলে ১৪ বছরের কম বয়সীদের জন্য হিজাব নিষিদ্ধ করলো অস্ট্রিয়া

এনসিপি শক্তিশালী না হলে ফ্যাসিবাদ পুনর্বাসনের পথ সৃষ্টি হবে : সারজিস

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ