টাকা লুটের জন্য শিক্ষককে খুন, সমকামীর চিরকুট লিখে নাটক সাজায় তারা

প্রকাশিত: ২২ অগাস্ট, ২০২৩ ০৪:১৫:৫৭

টাকা লুটের জন্য শিক্ষককে খুন, সমকামীর চিরকুট লিখে নাটক সাজায় তারা

সাভারে বহুল আলোচিত গোলাম কিবরিয়া নামের এক শিক্ষককে হত্যার পর চিরকুট লিখে ফেলে রাখার সূত্র উদঘাটন ও হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ইমনসহ জড়িত তিনজনকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাব।

সোমবার (২১ আগস্ট) রাতে র‍্যাব-৪, ৬ ও ১৩ এর একটি দল যশোর, ঝিনাইদহ ও রংপুর এলাকায় যৌথ অভিযান পরিচালনা করে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী মো. ইমন খান (২৩), মো. সাগর (২২) ও মো. ছাদেক গাজীকে (২২) গ্রেফতার করা হয়।

এসময় উদ্ধার করা হয় লুটকরা ৫ লাখ ২১ হাজার ৯৯ টাকা। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতাররা শিক্ষক গোলাম কিবরিয়াকে হত্যার বিষয়ে তথ্য প্রদান করে।

র‍্যাব জানায়, শিক্ষক গোলাম কিবরিয়া জমি কেনা-বেচা করতেন। এ কারণে তার কাছে সবসময় বেশি টাকা থাকতো। টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য শিক্ষককে হত্যার পর সমকামীর চিরকুট লিখে নাটক সাজায় তারা।

মঙ্গলবার (২২ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের র‍্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন র‍্যাবের লিগ্যাল আ্যন্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, গত ২০ আগস্ট বেলা ৩টার দিকে সাভার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের ভাটপাড়া এলাকায় নিজ বাড়ির কক্ষ থেকে হাত-পা বাঁধা এবং গলায় গামছা পেঁছানো অবস্থায় গোলাম কিবরিয়া (৪৩) নামের সাবেক এক স্কুলশিক্ষকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এসময় মরদেহের পাশ থেকে ‘এই ব্যক্তি সমকামী করে পুলিশ ভাই, আমরা তাই মেরে ফেলেছি, ভাই ও অবৈধ কাজ করে........আমরা ইসলামের সৈনিক” লেখা একটি চিরকুট পাওয়া যায়।

এ ঘটনায় নিহতের ভাই বাদী হয়ে সাভার থানায় অজ্ঞাতনামা আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। হত্যাকাণ্ডটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে এবং গণমাধ্যমে প্রচারিত হলে ব্যাপক আলোচিত হয়। র‍্যাব এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য গোয়েন্দা নজদারী বৃদ্ধি করে।

স্থানীয়সূত্রের বরাতে র‍্যাব জানায়, নিহত গোলাম কিবরিয়া সাভার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের ভাটপাড়া এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা এবং পেশায় একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি কয়েক বছর ধরে নিজ বাড়িতে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়াতেন। পাশাপাশি জমি ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবসা করতেন। গত ১৯ আগস্ট রাত ১০টার দিকে তার বড় ভাই মো. গোলাম মোস্তফার ঘরে রাতের খাবার শেষে নিজ কক্ষে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। ঘটনার দিন ২০ আগস্ট বেলা ২টার দিকে শিক্ষক গোলাম কিবরিয়া ঘুম থেকে না উঠায় তার বাড়ির লোকজন তাকে ডাকাডাকি করে। বাড়ির লোকজন ঘরের ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে একপর‍্যায়ে তার ঘরের পেছনের দরজা খোলা দেখতে পায়।

এসময় বাড়ির লোকজন রুমের ভেতর গিয়ে খাটের ওপর লুঙ্গি দিয়ে নিহত শিক্ষকের নিথর মরদেহ দেখতে পায়। এছাড়াও নিহতের রুমের মালামাল এলোমেলো এবং আলমারি খোলা অবস্থায় ছিল

গ্রেফতারদের প্রাথমকি জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে র‍্যাব মুখপাত্র জানান, গ্রেফতার ইমনের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। গ্রেফতার সাগর একজন অটোরিকশাচালক হওয়ায় নিহত শিক্ষক তার অটোরিকশায় মাঝে মধ্যে যাতায়াত করার কারণে ২ বছর আগে তার সঙ্গে পরিচয় হয় এবং সু-সম্পর্ক তৈরি হয়। পরবর্তীতে গত ৬ মাস আগে গ্রেফতার সাগর তার বন্ধু ইমনকে শিক্ষকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। পরিচয়ের সুবাধে গ্রেফতার ইমন ও সাগর শিক্ষক কিবরিয়ার বাসায় মাঝে মধ্যে যাওয়া আসা করতেন।

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন আরও বলেন, শিক্ষক গোলাম কিবরিয়া জমি ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবসা করতেন এবং ব্যবসার যাবতীয় টাকা বাসায় রাখতেন। গ্রেফতার সাগর ও গ্রেফতার ইমন ওই শিক্ষকের বাসায় যাওয়া আসার সুবাধে তার আলমারিতে রাখা জমি ক্রয়-বিক্রয়ের বিপুল পরিমাণ টাকা তাদের নজরে আসে। পরবর্তীতে গ্রেফতার ইমন ও সাগর শিক্ষককে হত্যা করে তার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন। গ্রেফতার ইমন পরিকল্পনার বিষয়টি ঘটনার ৭-৮ দিন আগে তার বন্ধু গ্রেফতারকৃত ছাদেককে জানায় এবং গ্রেফতার ছাদেকের বিভিন্ন জায়গায় ঋণ থাকায় সে এ পরিকল্পনায় সম্মতি দেয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৯ আগস্ট গ্রেফতার ইমন ও ছাদেক জিরানী বাজার থেকে বাসযোগে সাভারের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এসে গ্রেফতার ইমন নিহত শিক্ষকজে ফোন করে তার সঙ্গে দেখা করতে চাইলে শিক্ষক গোলাম কিবরিয়া তাদের বাসায় আসতে বলেন। আনুমানিক রাত ১০টা ৪৫ মিনিটের দিকে গ্রেফতার ইমন ও ছাদেক শিক্ষকের বাসায় আসেন। এসময় পরিকল্পনা অনুযায়ী সাগর অটোরিকশা নিয়ে শিক্ষকের বাসার আশেপাশে অবস্থান করেন। শিক্ষকের বাসায় তারা রাতের হালকা নাস্তা শেষে আলাপচারিতার এক পর‍্যায়ে রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে গ্রেফতার ছাদেক শিক্ষক গোলাম কিবরিয়ার গলা চেপে ধরে এবং ইমন তার মুখ চেপে ধরে।

পরবর্তীতে তারা কৌশলে শিক্ষক গোলাম কিবরিয়ার লুঙ্গি দিয়ে হাত-পা বেঁধে ও গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে গোলাম কিবরিয়ার মৃত্যু নিশ্চিত করে।

র‍্যাবের এ কর্মকর্তা বলেন, হত্যাকাণ্ডের এ ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য গ্রেফতার ছাদেক নিজ হাতে একটি সাদা কাগজে চিরকুট লিখে (এ ব্যক্তি সমকামী করে পুলিশ ভাই, আমরা তাই মেরে ফেলেছি। ভাই ও অবৈধ কাজ করে, আমরা ইসলামের সৈনিক) মরদেহের পাশে রেখে দেয়। গ্রেফতার ইমন নিহতের বিছানার নিচ থেকে চাবি নিয়ে আলমারি খুলে ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ৪টি মোবাইলফোন লুট করে।

পরবর্তীতে তারা গ্রেফতার সাগরকে ফোন দিয়ে শিক্ষকের বাসার সামনে আসতে বলে। গ্রেফতার সাগর তার অটোরিকশা নিয়ে নিহতের বাসার সামনে আসলে গ্রেফতাররা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় চলে আসেন।

কমান্ডার মঈন আরও বলেন, ইমন সাগরকে ৫০ হাজার টাকা দেন, অবশিষ্ট ৬ লাখ টাকা ইমন ও গ্রেফতার ছাদেক নিজেদের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে নেন। ঘটনার পর দিন সকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গ্রেফতার এড়াতে ইমন প্রথমে গাজীপুর পরে যশোরের চৌগাছা এলাকায়, সাগর রংপুরের মিঠাপুকুর এলাকায় এবং ছাদেক ঝিনাইদহ এলাকায় তাদের আত্মীয়ের বাসায় আত্মগোপনে চলে যান। পরবর্তীতে তারা আত্মগোপনে থাকাবস্থায় র‍্যাব গ্রেফতার করে।

কমান্ডার মঈন বলেন, ইমন মা-বাবাসহ প্রায় ১৫ বছর ধরে ঢাকার জিরানী এলাকায় বসবাস করছেন। তিনি রাজধানীর আশুলিয়ার একটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। তিনি আশুলিয়ার জিরানী এলাকার একটি গার্মেন্টসে কোয়ালিটি কন্ট্রোলার হিসেবে কাজ করতেন। এছাড়াও তিনি মাদকাসক্ত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে গাজীপুরের কাশিমপুর থানায় একটি ডাকাতি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে।  

র‍্যাবের মুখপাত্র আরও বলেন, সাগর মা-বাবাসহ প্রায় ২০ বছর ধরে ঢাকার জিরানী ও সাভার এলাকায় বসবাস করছিলেন। তিনি জিরানী ও সাভার এলাকায় অটোরিকশা চালাতেন। ২০১৯ সালে জিরানী এলাকায় বিশৃঙ্খলা, মাদক ব্যবসা ও অনিয়ন্ত্রিত চলাফেরার কারণে এলাকাবাসী তাকে ও তার পরিবারকে এলাকা থেকে বের করে দিলে তিনি পরিবারসহ সাভারে ওয়াবদা রোডে এসে বসবাস শুরু করেন।

গ্রেফতার ছাদেক মা-বাবাসহ প্রায় ২০ বছর ধরে ঢাকার জিরানী এলাকায় বসবাস করছেন। তিনি জিরানী বাজারে একটি গামেন্টসে চাকরি করতেন বলে জানা গেছে।


প্রজন্মনিউজ২৪/কেএমআই

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন





ব্রেকিং নিউজ