৮১ ভাগ শিক্ষার্থী পাচ্ছে না আবাসিক সুবিধা     

প্রকাশিত: ৩০ নভেম্বর, ২০২২ ০৫:৫১:৪৯

৮১ ভাগ শিক্ষার্থী পাচ্ছে না আবাসিক সুবিধা     

স্টাফ রিপোর্টারঃ  বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮১ ভাগ শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা বঞ্চিত হচ্ছে। আবাসিক হলে থাকার সুযোগ পেয়েছে মাত্র ১৯ শতাংশ শিক্ষার্থী। ২০১১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয় ৯ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র ৪টি আবাসিক হল। যার মধ্যে একটি ছাত্রী হল (বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল) উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে। বাকী শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বাসা ভাড়া বা মেস করে থাকছেন। যে কারণে শিক্ষার্থীরা যেমন অনিরাপদতায় ভুগছেন, তেমনি আর্থিকভাবেও ক্ষতির সম্মূখিন হচ্ছেন।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনাবাসিক শিক্ষার্থী রাশেদ (ছদ্মনাম) তিনি বলেন, ‘হলে সিট না পেয়ে উঠছি মেসে। আগে মেসে সবমিলিয়ে ৬ হাজার টাকায় হয়ে যেত। কিন্তু বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় আরও দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকা বেশি খরচ হচ্ছে। কি আর করবো তাই নাস্তা করা বাদ দিয়ে দিয়েছি। আবার যারা আবাসিক হলে থাকেন তারা ও খুব কষ্টে থাকেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল ও শের-ই বাংলা হল। এগুলো পাঁচতলা বিশিষ্ট। প্রত্যেক হলে ৮১টি থাকার কক্ষ রয়েছে। প্রতিটি কক্ষে চারটি সিঙ্গেল খাট(চৌকি), চারটি টেবিল ও চেয়ার রয়েছে। হলে মোট আসন সংখ্যা ৫৪০ টি করে। তাহলে দুই হলে মাত্র ১ হাজার ৮০ জন থাকতে পারছেন। কিন্তু হল কক্ষের ৪টি চৌকিতে ২ জন করে ৮ জন থাকেন গাদাগাদি করে। তারা চৌকির পাশে আলাদা কাঠ দিয়ে চৌকি বড় করার মাধ্যমে এক চৌকিতে ২জন থাকেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল এর ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী জয় বলেন, হলে এভাবে এক বিছানায় দুজন থাকা খুবই কষ্টকর। ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। একজন গোসলে গেলে আর একজনকে বসে থাকতে হয়। এভাবে সিরিয়াল দিয়ে সবকিছু করতে হয়। শেরে বাংলা হলের শিক্ষার্থী আরাফাত বলেন, ছারপোকার মতো লেপ্টে থাকতে হয়। পড়াশোনার সমস্যা হয়। ৪ টি টেবিল ৮ জন মানুষ কিভাবে পড়া যায়। পালা করে ঘুমাতে হয়। একজন পড়ে আর একজনকে বসে থাকতে হয়। না হলে রিডিংরুমে যেতে হয় কিন্তু রিডিংরুমেও সিট স্বল্পতায় বসার জায়গা পাওয়া যায়না। অনেক সময় সিনিয়ররা আগে পড়েন, জুনিয়ররা পরে পড়ে। উল্টোটাও হয়। আবার যখন যার পরীক্ষা থাকে তাকে বেশি পড়তে সুযোগ করে দেয়া হয়। আবার যদি একরুমে অধিকাংশ ব্যাচমেট থাকে তাহলে অনেক সমস্যা হয় পরীক্ষার সময়ে। রিডিংরুমে সিট স্বল্পতা রয়েছে। দুই হল মিলিয়ে প্রায় ১৫০ টি সিট রয়েছে। নামাজ এবং রিডিংরুম একইসাথে হওয়ায় ছাত্রদের সমস্যা পোহাতে হয়।

ছাত্রী হলেও একই সমস্যা। সবাইকে ডাবলিং করে থাকতে হচ্ছে। খাওয়া, গোসল, ঘুম সবকিছুই পালা করে করতে হচ্ছে। শেখ হাসিনা হলের শিক্ষার্থী মারিয়া (ছদ্মনাম) বলেন, একরুমে আটজন থাকা, ছোট একবেডে দুজন গাদাগাদি করে থাকা লাগে, রান্নাঘর একটা শুধুমাত্র দোতলায়, বারবার সেখানে গিয়ে রান্না করে আনা খুবই দুরূহ ব্যাপার। শেখ হাসিনা আবাসিক হলে থাকেন ৬১০ জন শিক্ষার্থী। উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলেও ৬১০ জন শিক্ষার্থী থাকার সুযোগ পাবেন।

হলের খাবার নিয়ে অভিযোগঃ হলের খাবার নিয়ে অভিযোগ তুলছেন অধিকাংশ শিক্ষার্থী। তাদের অভিযোগ খাবারের দাম এবং মান নিয়ে। তারা খাবারের দাম অনেক বেশি কিন্তু মান খুবই খারাপ। শেরে বাংলা আবাসিক হলের শিক্ষার্থী কবির, সাকিব, শাহরিয়া , আরাফাত তাদেরসহ আরও অনেকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তাদের সবার অভিযোগ, হলে যে খাবার রান্না করে তাতে গন্ধ থাকে, মাছ থেকে পঁচা গন্ধ বের হয়। আর নষ্ট তেল দিয়ে রান্না হয়। আর এসব খাবারের দামের তুলনায় মানও খারাপ। এই একই টাকা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে ভোলা রোডের পাশে হোটেল থেকে ভালো মানের খাবার পাওয়া যায়। তাই তারা ওইসব হোটেল থেকে খাবার খেয়ে থাকেন। শেরে বাংলা হলে পাঙ্গাস ৪৫ টাকা, পুমা ৪৫, রুই ৫০, ব্রিগেড ৪৫ টাকা। দেখা যায়, এই মাছগুলোই অধিকাংশ সময়ই রান্না হয়, সাথে মুরগী থাকে। ১০ টাকার কমে সবজি পাওয়া যায়না।

এদিকে বঙ্গবন্ধু হলের খাবারের দাম আরও অনেক বেশি। সেখানেও তাদের খাবারের মান নিয়ে একই অভিযোগ। পুমা মাছ ৫৫, ব্রিগেড ৬০, চন্দনা ইলিশ ৫৫, মুরগির কলিজা ৪৫ টাকা করে। এসব খাবার খেয়ে শিক্ষার্থীরা প্রায়ই পেটের পীড়ায় ভোগেন। তুষার(ছদ্মনাম) নামের বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, যেকোনো মাছ ৫৫-৬০ টাকা। সবজি হবে না ১০ টাকার নিচে। ডিম ২০ টাকা। মেইন প্লেটে ভাতের পরিমাণ সাগরের মধ্যে ঢিল ছোড়া যেমন। প্রথম ধাক্কাতে এক কাপ ভাত দিলেও পরে শৈল্পিক কারুকাজে সজ্জিত করার জন্য প্লেইট চেকে ফেলে দেওয়া হয়। সবজিগুলো হাঁটার পথে খোলামেলা মেঝেতে এবড়ে-তেবড়ে হয়ে পড়ে থাকে। সবজিগুলোর মলিন মুখ দেখে বুঝা যায়, পূর্ব জন্মে পাপের ফল হিসেবে তাদের ববির আবাসিক হলে শাস্তিস্বরূপ পাঠানো হয়েছে। মাছ কোনোদিন ধুয়ে রান্না হয় না। শেখ হাসিনা হলের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হলের খাবারের মান খুবই বাজে, হলের খাবার খেয়ে অসুস্থ হাওয়ার খবর ডালভাতের মত হয়ে গেছে।

শের-ই- বাংলা হলের প্রভোস্ট আবু জাফর মিয়া বলেন, খাবার নিয়ে অভিযোগ সঠিক না। কারণ আমি রেগুলার দুপুরবেলা হল এ খাই। ছাত্ররা যেটা খায় আমি রেগুলার খাই কারণ আমি চেক করতে চাই যে এটি আসলে মান সম্মত কিনা। বর্তমান যে বাজার দর তাতে তারা যা খাওয়ায় আমার মনে হয় ঠিক আছে। অভিযোগ থাকবেই, যে কোন যে কোন জায়গায় যত ভালো খাবারই দেয়া হোক। আবার এমনও হতে পারে খাবার প্রতিদিন সমান টেস্ট হবে না। দু একদিন খারাপ হতে পারে।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মোঃ খোরশেদ আলম সিট শেয়ারিং এর বিষয়ে বলেন, এটি শুধু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েই যে ৪ জন এর সিটে ৮ জন থাকছে তা না। বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এটি আছে। কারণ সিটের তুলনায় শিক্ষার্থী সংখ্যা বেশি। তিনি আরও বলেন, ক্রাইসিস আছে সত্য। আমাদের প্রথম ফেজে চারটি হল ছিলো সেটি হয়েছে। তিনটি চালু রয়েছে আর একটি উদ্বোধনের অপেক্ষায় আছে। যার সব প্রক্রিয়া শেষ, শিক্ষার্থীরা খুব শিঘ্রই উঠে যাবে। এরপরে আমাদের দ্বিতীয় ফেজ প্রক্রিয়াধীন আছে সেই ফেজে আমাদের নতুন হল থাকবে। তখন আসা করা যায় সেই ক্রাইসিস কিছুটা হলেও লাঘব হবে। আমাদের প্রশাসনের দিক থেকে আমরা চেষ্টা করলে যে হল তৈরি করতে পারবো এমন না। আমাদের সেই প্রক্রিয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ