কাঁদো পুরুষ কাঁদো

প্রকাশিত: ১৯ নভেম্বর, ২০২২ ০৬:৩৮:৩৪

কাঁদো পুরুষ কাঁদো

সৈয়দ মুহাম্মদ আজম
পুরুষ মানুষদের কাঁদতে নেই, পুরুষদের চোখে জল মানায় না। ছোটবেলায় পরিবার-পরিজন, পাড়া-প্রতিবেশীরা বলতো ‘তুই ব্যাটা ছইল, ব্যাটা ছইলদের কাঁন্দিতে হয় না’। এ কথা শুনে ভাবতাম ভালো তো, কান্না নামক ঝামেলা পুরষদের জন্য নয়, ওটা নারীদের, একান্তই তাদের। সে জন্য চোখের সামনে বাবা, চাচা, ভাই কাউকেই কাঁদতে দেখতাম না। যত কান্নাকাটি বা যন্ত্রণার গল্প শুধু নারীদের।

কিন্তু নারীরা যখন কাঁদে, তাদের কান্না বন্ধ করার জন্য সান্ত্বনা না দিয়ে এটা বলে চুপ থাকি যে কান্না করলে মনটা হালকা হবে, স্বস্তিবোধ করবে। কাঁদার জন্য তাদের আরও উৎসাহ দেওয়া হয়। পুরুষরা যখন কাঁদে তখন এই যুক্তির বিপরীতে বলা হয়- পুরুষদের কাঁদতে নেই। বুকের ভেতর কষ্টের পাহাড় রেখে মুখের ভাঁজে হাসির আবাদ করতে হয়। পুরুষদের কান্না চেপে রাখতে শেখানো হয়। এটাকে ‘অমানবিক’বললেও বোধহয় ভুল হবে না।

দৈনন্দিন জীবনে কান্না করার মতো কোনো কারণই কি নেই? অবশ্যই আছে। কিন্তু এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বদৌলতে পুরুষেরা সেই ছোট্টকাল থেকে শিখে যায় যে তাদের কাঁদতে মানা। পুরুষের চোখে নোনা জল শোভা পায় না। ভুল করেও যদিও বন্ধু, ভাই বা পরিচিত কারো সামনে চোখ থেকে দু’ফোটা জল ঝড়ে ‘মেয়েলি’ বলে টিটকারি, হাসিতামাশা অর্থাৎ বুলিংয়ের শিকার হতে হয়। এই বুলিং নিয়েও তাকে নিরব কষ্টে ভুগতে হয়। গতানুগতিক ধারায় সেও অজান্তে অন্যদের এই সহজাত আবেগ প্রকাশ না করতেই শেখাচ্ছে।

এভাবেই সমাজের বাকি পুরুষদেরও মনোজগতের, মানসিক স্বাস্থ্যের বারোটা বাজিয়ে অজান্তেই তাদের জাজমেন্টাল হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। কিন্তু এভাবে কি ছাঁচে ঢেলে মানুষ গড়া যায়? না, সহজাত ব্যক্তিত্ব ও চাহিদাকে অবদমন করে কেউ সুস্থ মানুষ হয়ে বেড়ে উঠতে পারে না। ছোটবেলা থেকেই আবেগ প্রকাশে নিষেধ করার কারণ আবেগ প্রকাশ করতে হলে ‘দুর্বল’ হতে হয়।

যেহেতু পুরুষের কোন মানসিক ‘দুর্বলতা’ থাকতে পারে না, তাই প্রচণ্ড মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থাতেও তা কাছের মানুষদের সাথে ভাগাভাগি করতে সাহস পায় না। তটস্থ থাকে এই ভেবে যে যদি কেউ হাসে, টিটকারি দেয়, ট্রল করে। আবেগ অবদমন মনের অসুখ বাড়িয়ে দেওয়া ছাড়া আর ভালো কোনো ফল আনে না। ওদিকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তাদের কাঁদতেও দেবে না। কি অন্যায়!

এর অর্থ, সামাজিক অন্যায়ের শিকার হচ্ছে পুরুষ। এরপরও যদি পুরুষের বোধদয় না হয়, তবে পুরুষের  জন্য করুণা করতেই হবে। পুরুষ কেবল সে যে পুরুষ, এটা টের পাবে কিন্তু যে মানুষ কি-না সেটা টের পাওয়ার জন্য কাঁদতে পারবে না, এমনটা হওয়া উচিত নয়।

পুরুষের যখন কষ্ট হয়, খারাপ লাগে, প্রবল হাহাকরে সবকিছু শূন্য মনে হয়, হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে হয় তখন তাকে তা চাপা দিতে হয়। চারপাশের মানুষ কি বলবে ভেবে পুরুষ নিজেকে লুকিয়ে রাখে। কষ্ট আর হাহাকার কারো সাথে ভাগাভাগি করতে না পেরে প্রবল যন্ত্রণা অথবা বুকের ভেতর জমতে থাকা কান্নাগুলোয় তাকে ক্রমাগত গ্রাস করে নিতে থাকে ডিপ্রেশন। উপসর্গ পরিণত হয় রোগে, রোগ পরিণত হয় ব্যাধিতে। মানসিক ব্যাধি। মানসিক স্বাস্থ্যের পরামর্শে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেও নারীদের চেয়ে পুরুষরা বেশি সংযত থাকেন বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

এ ধরনের মানসিক বিপর্যস্ততার পর্যায়ে অনেকেই বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ। সমীক্ষা বলছে বিশ্বে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন আত্মহত্যা করে। আত্মহননকারীদের বেশিরভাগই পুরুষ। বিশ্বে পুরুষদের তুলনায় নারীদের বিষণ্নতা এবং আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। কিন্তু নারীদের তুলনায় পুরুষদের আত্মহত্যার হার কয়েকগুণ বেশি।

নানান চাপে থেকেও কাউকে কিছু বলতে না পারার পুরুষতান্ত্রিক বেড়াজাল থেকে বের হতে না পারা, এসব বিষয় নিয়ে কথা না বলা, অথবা বলতে না পারার কারণেই বিশ্বব্যাপী পুরুষরা বেশি আত্মহত্যা করেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে বিশ্বব্যাপী নারীদের তুলনায় পুরুষরা দ্বিগুণ সংখ্যায় আত্মহত্যা করে। ব্যাপক মানসিক চাপে নানা ধরনের শারীরিক অসুখেও বেশি ভোগেন পুরুষেরা। বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী নারীদের তুলনায় পুরুষের গড় আয়ু কম।

আগেই বলেছি পুরুষদের তুলনায় নারীদের আত্মহত্যার প্রবণতা (১.২ শতাংশ) বেশি। কিন্তু পুরুষদের আত্মহত্যার পদ্ধতি আক্রমণাত্মক হওয়ায় কেউ বাঁচানোর চেষ্টা করার আগেই মৃত্যু নিশ্চিত হয়। যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ১০ জনের ৬ জনই নিবন্ধিত বন্দুকের মালিক এবং আগ্নেয়াস্ত্রের মাধ্যমে অর্ধেক আত্মহত্যা করে। 

পুরুষরা আবেগ প্রকাশে বাধাগ্রস্ত হয় পরিবার থেকেই। কানাডার সেন্টার ফর সুইসাইড প্রিভেনশনের নির্বাহী পরিচালক মারা গ্রানাউ’র মতে, মায়েরা তাদের ছেলে সন্তানদের থেকে মেয়ে সন্তানদের সাথে বেশি কথা বলে এবং নিজেদের অনুভূতিগুলো ভাগাভাগি করে। ফলে পুরুষতান্ত্রিকতায় ছেলেরা হয়ে ওঠে অনুভূতিশূন্য। মানসিক চাপ থেকে অনেক সময়ই তারা অ্যালকোহলে আসক্ত হয়ে সাময়িক স্বস্তিবোধ করেন। কিন্তু মদ্যপান হতাশাকে গভীর করে, আবেগপ্রবণ আচরণ বাড়িয়ে তোলে। যদিও মদ্যপান আত্মহননের প্রবণতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

সময় এসেছে ‘পুরুষ মানুষদের কাঁদতে নেই’ বলে আবেগ প্রকাশে সামাজিক নিষেধাজ্ঞাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখানোর। বন্ধ হোক ‘‘মেয়েলি’’ নামক চরম সেক্সিস্ট মন্তব্য করা। বিশেষ বিশেষ কাজ ও চাহিদা নারীত্বের পরিচায়ক বলে বলে চাপিয়ে দেওয়ার এই সমাজিক কুপ্রথা বন্ধ হোক। আমাদের ছেলেদের শেখানো হোক হাসি-রাগ-অভিমানের মতো কান্নাও একটি সহজাত আবেগ। আবেগ প্রকাশে কার্পন্যতা নয়, মুক্ত হওয়ার। কান্নার আনন্দবঞ্চিত, হে দুর্ভাগা পুরুষ। তোমাদের কল্লোলিত ক্রন্দনের ধ্বনি শুনুক পৃথিবী। কাঁদো পুরুষ কাঁদো।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী, [email protected]
 

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন





ব্রেকিং নিউজ