নরখাদক উপজাতি আসমত

প্রকাশিত: ১৮ জুলাই, ২০২২ ০৬:৪৩:৪৩

নরখাদক উপজাতি আসমত

সৈয়দ মুহাম্মদ আজমঃ পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত নরখাদক উপজাতি হিসেবে পরিচিত আসমত উপজাতি। আর এই উপজাতির নাম ব্যবহার করা হয় মূলত মানুষের হৃদয়ে ভয় সঞ্চারের জন্য। ইন্দোনেশিয়ার প্রদেশ পাপুয়ার দ্বীপ নিউ গিনির পশ্চিম-দক্ষিণ সমুদ্রের কাছাকাছি ম্যানগ্রোভ বনে এ উপজাতির বসবাস।

আসমত উপজাতিদের বসবাসস্থলে আধুনিক মানুষের পা সেই অর্থে পড়েনি। তাই আধুনিক সভ্যতার সাথে তাদের কোনো সর্ম্পক নেই, নেই কোনো বেশভূষার মিলও। তাদের জীবন যাপন, খাদ্যভাস, আচার-আচরণ, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিশ্বাসও আধুনিক সভ্যতার সাথে মিলে না। কাঠ থেকে তাদের উদ্ভব হয়েছে বলে বিশ্বাস করেন তারা। তাই কাঠ তাদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র বস্তু হিসেবে গণ্য হয়। অবাক করার বিষয়, প্রাচীনকালে তারা কাঠ থেকে বিস্ময়কর জিনিস খোদাই করত। আসমতকে প্রস্তর যুগের সেরা কাঠ খোদাইকারক হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং তাদের অনেক নকশা বিশ্বের বিভিন্ন জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।

যদিও তারা কাঠের ভাস্কর্যের গুণগতমানের জন্য ব্যাপক পরিচিত। অন্যদিকে মাথা শিকার ও নরখাদকের ঐতিহ্যবাহী অনুশীলনের জন্যও বেশ কুখ্যাত। আসমত উপজাতিরা শুধু মাথার খুলি শিকারই করেন না, সেই খুলি দিয়ে প্রার্থনাও করেন। মৃত ব্যক্তির মাথার খুলি মস্তিষ্ক থেকে আলাদা করেন যাতে অশুভ আত্মা শরীরে প্রবেশ করতে বা বের হতে না পারে এই বিশ্বাসে চোখ ও নাকের অংশগুলো বন্ধ করে দেন তারা। যে মাথার খুলিগুলোকে এভাবে সজ্জিত করা হয় কোনো খোলা ময়দানে সম্মানজনকভাবে লোকসম্মুখে সেগুলো প্রদর্শন করা হয়।

তারা বালিশের পরিবর্তে মাথার নিচে খুলি রেখে ঘুমায়! আবার ওই খুলিগুলো খাবারের পাত্র হিসেবেও ব্যবহার করেন।

এই উপজাতির যোদ্ধারা শত্রুপক্ষের উপর নৃশংসভাবে আক্রমণ চালায়। আক্রমণ চালিয়ে শত্রুদের হত্যা করে ফেলেন নির্দ্বিধায়। শত্রুকে হত্যার পর তার মাথা কেটে ভক্ষণ করে আসমতরা। শত্রুর মাথা কেটে খাওয়াকে তারা বীরত্ব এবং উপজাতীয় আনুগত্যের প্রতীক বলে মনে করে।

আসমতিরা মাথা কাটার পর মাথার বাইরের চামড়া কেটে বাদ দেন। এরপর মাংসযুক্ত ওই খুলি চুলায় আগুনে পুড়িয়ে ভাজা হয়। এই উপজাতির এমন ভয়াবহ আচারপদ্ধতি অন্যান্য উপজাতির মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি করলেও তারা নিজেরা বিশ্বাস করে, মানুষের মাথা একটি পবিত্র খাদ্যবস্তু। মানুষের মাথাকে গাছের ফলের সাথেও তুলনা করেন তারা।

মুণ্ডুহীন দেহ নিয়েও কারসাজি করতে ছাড়েন না এই উপজাতির মানুষেরা। কাটা দেহ নিজেদের উরুর উপর রেখে প্রার্থনা করেন। তারা মনে করেন, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির দৈহিক ক্ষমতা তাদের শরীরে চলে আসবে। এছাড়াও খুলিগুলো অলঙ্কার হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি বাড়ির সাজসজ্জাতেও কাজে লাগান আসমত উপজাতির সদস্যরা। প্রধান খাদ্য হিসেবে এদের মধ্যে জনপ্রিয় হলো প্রাণীর মস্তিষ্ক ও সাগো কৃমি। মৃতদেহের মেরুদণ্ডের বিভিন্ন অংশ এবং চোয়াল দিয়ে কানের দুল বানিয়েও ব্যবহার করে তারা।

আসমতি কোনো সদস্যের মৃত্যু হলেও তার মাথা কেটে নেন তারা। পরে কাটা মাথা থেকে চোখ ও ঘিলু বের করে নেওয়া হয়। মাথা শিকারের পাশাপাশি মৃত ব্যক্তির নামের খোঁজ করে থাকেন। তাদের বিশ্বাস যখন তারা একজন মানুষকে হত্যা করে এবং তাকে ভক্ষণ করে তখন শিকার ব্যক্তির ক্ষমতা তারা গ্রহণ করে ও শিকারি ব্যক্তির স্বকীয়তায় পরিণত হয়। ভক্ষক ব্যক্তির নামকরণ করা হয় মৃত বা নিহত ব্যক্তির নামে।

১৯৬১ সালের নভেম্বর মাসে আমেরিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট নেলসন রকফেলারের পঞ্চম সন্তান মাইকেল রকফেলার আসমত উপজাতিরা বসবাস করে এমন অঞ্চল থেকে নিখোঁজ হন। পরিবারের পক্ষ থেকে একজন গোয়েন্দাকে ওই অঞ্চলে প্রেরণ করা হলে গোয়েন্দা ব্যক্তি জানান, সম্প্রতি তারা একজন শ্বেতাঙ্গকে হত্যা করেছে। তারপর তিনটি মাথার খুলি নিয়ে ওই গোয়েন্দা আমেরিকা ফেরত যান। এরমধ্যে একটি খুলি আসমত উপজাতিদের দ্বারা হত্যা করা ওই শ্বেতাঙ্গের ছিল।

তবে স্বস্তির কথা এই যে, ১৯৮০ সালের পর থেকে আসমতিরা আর শত্রুপক্ষের মাথা কেটে খাওয়ার ও খুলি বের করে প্রার্থনা করার মতো বীভৎস অনুশীলন বন্ধ করেছে। ধর্মপ্রচারকরা তাদের এই বর্বচিত কর্মকাণ্ডের পরিবর্তনে ব্যাপক কাজ করেছেন, বিধায় ভয়ঙ্কর বর্বর জীবন থেকে সভ্য জীবনে আসা সম্ভব হয়েছে আসমত উপজাতিদের।


প্রজন্মনিউজ২৪/এসএমএ

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন





ব্রেকিং নিউজ