কালো রক্ত

প্রকাশিত: ২৮ জুন, ২০২২ ০৩:৪৯:৫৩

কালো রক্ত

সৈয়দ মুহাম্মদ আজমঃ পূর্ব আকাশে সূর্যের রক্তির আভা স্পষ্ট হচ্ছে, বিছানার আলস্যতা ছেড়ে উঠতেই চোখ পরলো টেবিলের ওপর। একটা ফ্যাকাশে নীল রঙের কলম অগোছালো টেবিলটার একপাশে পরে আছে। আজ সপ্তাহখানেক হয়ে গেলো উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা হারিয়ে নিথর পড়ে রয়েছে খোলা ধবধবে সঁথের ওপর। এই তো দিন কতক আগে কত ব্যস্ততা তার, দম নেওয়ার মতো জোঁ ছিলনা, স্বশব্দে কাজ করে গেছে নিরন্তর। আলস্যতা তাকে ছুঁতেও পারেনি। কিন্তু কি এমন হলো যে আজ সে নিথর, নিস্তব্ধ, নির্বাক পড়ে আছে! বিস্ময় বদনে কমল স্বরে জানতে চাইলাম, কোনো উত্তর মিলল না। বোধহয় আমার কমল কন্ঠস্বর তার বিদ্গদ্ধ হৃদয়কে স্পর্শ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই আবারো জিজ্ঞেস করলাম কিন্তু ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলাম।

নানা কর্ম ব্যস্ততার ধকলে দিন কাটলো। ওদিকে আবার গোধূলির রক্তবরাও তার গৃহপথে রওনা হয়ে গেছে। চারিদিকে নিরবতার স্পর্শ স্পষ্ট, জোনাকিরা দুলতে দুলতে আলো অন্ধকারের খেলায় মত্ত। ঝিঁ ঝিঁ তার করুণ সুরে কষ্টের কথা জানান দিচ্ছে, চাঁদটাও মেঘের সাথে লুকোচুরি খেলছে। একা একা ঝোঁপ-ঝাড় ডিঙ্গিয়ে, আলো আধার কাটিয়ে গৃহ মুখে রওনা হয়েছি।

ঘরে ঢুকেই অবশন্য বিকেলের ক্লান্ত ভগ্ন শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিলাম। চোখ দু‘টো বুজে আসতেই হঠাৎ মনে কোনো এক অচেনা শূণ্যতার শিহরণ অনুভব হতে লাগলো। অবচেতন মনেই খানিকক্ষণ সেই শূণ্যতার কারণ খুঁজতেই মনে হলো ভোরের কলকলানি কলমটির কথা। এই যা! সারাদিন তো একবারো খোঁজ নেইনি।

ধীর পায়ে টেবিলের দিকে এগোলাম, সেই ভোরে যেমনটা দেখেছিলাম এখনো তেমনিভাবেই পরে আছে টেবিলের ওপরে। ধবধবে সাদা কাগজের ওপর কিছু লেখা দেখা গেলেও স্পষ্ট বুঝতে পারলাম না কলমের নিথর দেহটার জন্য। স্নেহাতুর হাতে স্পর্শ করতেই আমার দিকে ফিরে তাকালো। তবে সেই তাকানোতে অভিমান, অনুযোগ আর বঞ্চনার বাণীই স্পষ্ট ছিল। এবার, সেই আগ বাড়িয়ে অত্যন্ত করুণ কন্ঠে বলে উঠলো, ভুলে গেছো? তার প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই বিধায় নির্বাক হয়ে গেলাম। সত্যিই তো! সপ্তাহ ধরে তার কোনো খোঁজ নেইনি। সে বলল, ‘আমার শরীর ভালো নেই।’ আহা! কি করুণ তার শব্দ চয়ন। এই প্রথম নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হচ্ছে।

ক্ষীণকন্ঠে জানতে চাইলাম কি হয়েছে, অশ্রুসিক্ত নয়নে মরমি উত্তর, ...সাদা রণক্ষেত্রের প্রান্ত নেই, নেই ঠাঁই নেয়ার মতো কোনো কালো ছায়া যা আছে সব নিজেকে ক্ষয়ে রচিয়ে গড়া, এই তো শেষ।’ এই শেষ শব্দটিই তার জীবনের শেষ, অসমাপ্তই রইল ডায়েরির শেষ পাতাটা। থেমে গেলো একটি সাড়া জাগানো কলমের জীবনগাঁথা, সমাপ্তির অর্ন্তরালে তলিয়ে গেলো তার ঘনকালো রঙিন জীবন, যেীবন।

কলম চিরকাল তার কালো রক্ত দিয়ে রচে যায় দুঃখ, সুখ, হাসি-কান্না, সফলতা-ব্যর্থতার কত শত গল্প। কিন্তু এতোকিছুর পিছনে তার আত্মত্যাগের কথা কখনোই সে রচনা করে না। হয়ত, পরের তরে আত্মোৎসর্গের দৃঢ় সংকল্প নিয়েই তার জন্ম।


প্রজন্মনিউজ২৪/এসএমএ

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন