সাইকেলের পিছনে চড়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে

প্রকাশিত: ১৯ জুন, ২০২২ ১২:২৬:০২

সাইকেলের পিছনে চড়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে

ফোনের অপরপ্রান্তে ভরাট কণ্ঠস্বরের সুকরুণ মমতায় জড়ানো জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে জানতে চাওয়া, 'বাবা কেমন আছিস? তোর গলার আওয়াজ শুনে কেমন জানি মন খারাপ লাগছে।' সদুত্তরে  আমি শুধু চোখের জল মুছে বললাম, 'না তো বাবা, এইতো বেশ ভালো আছি।' সেদিন ছিল বুধবার রাত ১১টা। বাবার সাথে আর কথা বাড়াতে পারলাম না। একটা চাঁপা কন্ঠে শুধু হ্যা সূচক জবাব দিয়ে ফোন কেটে দিলাম।

আগামীকাল ক্লাস শেষ করে বাড়ি চলে আয়। আমার আর বুঝতে বাকি রইল না, আমার জন্য তাদের মন কাঁদে। আমি একা। আর কোনো ভাই-বোন নেই। বাড়িতে তারা একাই থাকে। বাবারা কেমন জানি অদ্ভুত উপায়ে অদৃশ্য মনের কথা বুঝতে পারেন। সন্তানের যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে বুকের পাঁজরে আগলে রাখেন, ছায়ার মতো পাশে থাকেন সারাটি জীবন। নিজের শত সমস্যার বেড়াজালেও সন্তানদের নির্ভরতা দেন, সুরক্ষিত রাখেন।

'বাবা' দুই অক্ষরের ছোট্ট এই শব্দটির মাঝে লুকায়িত আছে এক সাগর আস্থা, ঝড়ঝঞ্ঝাটে হৃদয় নিংড়ানো সাহস। শক্ত হাতে আঙুল ধরে বিপদ থেকে রক্ষার ত্রাণকর্তাও তিনিই । খুঁটি শক্ত হলে যেমন ইমারত দৃঢ় হয়, ঠিক তেমনটা আমার বাবার ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তায় এখনো গভীরভাবে অনুভব করি।

আমার জন্ম প্রত্যন্ত এক গ্রামে। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই আমি লেখাপড়া করেছি শহরে। এখনো মনে পড়ে ছোটবেলায় বাবার সাইকেলের পিছনে কেরিয়ারে বসে ১০ কিলোমিটার দূরের স্কুলে যেতাম। রোদে পুঁড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কত কষ্ট করেই না বাবা আমাকে স্কুলে পৌঁছে দিতেন। আবার স্কুল ছুটি হলে দেখতাম বাবা আমার জন্য অপেক্ষা করছে। সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম শেষে সন্ধ্যায় আমরা সাইকেলে করে গ্রামে ফিরতাম ।

আজ আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে পড়ছি। এর পিছনে সবচেয়ে বড় অবদান আমার বটবৃক্ষের, আমার আস্থার প্রতীকের। তিনি আমার সুপারহিরো, আমার মহানায়ক। বিপদে-আপদে তিনিই আমাকে সবার আগে আগলেছেন। দিয়েছেন লড়াই করার অসীম সাহস। আপাতগম্ভীর খোলসের আড়ালে তার ভেতরটা কচি নারকেলের মতো নরম। ঠিক যেন শামুকের মতো।

সন্তানের সংকটে তিনি নিভৃতে চোখের জল ফেলেন। এই লেখাটি যখন লিখছি তখন আমারও চোখের জল আর থামছে না। নোনা জলে বারবার চশমার গ্লাস ঝাপসা হয়ে উঠছে। চশমা মুছতে মুছতে ভাবছি এই মানুষটা এত ভালো কেন! আমার জীবন যুদ্ধের নায়ক, আমার আদর্শ বাবা, তোমাকে কখনো বলা হয়নি, ছোটবেলায় সেই তোমার সাইকেলের কেরিয়ারে বসেই একদিন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম আমার শিক্ষা জীবনের কিছু কিছু অর্জন তোমাকে উৎসর্গ করবো। আমি ভাগ্যবান যে ঠিক ঠিক সেই প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী আমার ৫ম, ৮ম ও ১০ম শ্রেণীর স্কলারশিপগুলো তোমাকে উৎসর্গ করতে পেরেছি। হয়তো মুখে বলিনি ঠিকই কিন্তু "বাবা দিবসের" এই বিশেষ আয়োজনে জাতির কাছে ঘোষণা দিয়ে উৎসর্গ করলাম।

তোমার ছায়ায় ছায়ায় বাঁচি বাবা। তোমার মায়ায় মায়ায় বাঁচি। তোমার দেওয়া উপদেশগুলো সব সময় মেনে চলি। তোমার সত্ত্বাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করি। তোমার মতো বৃক্ষের ছায়া আমাকে জীবনের প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করতে অনুপ্রাণিত করে। জানো বাবা, একটা কথা কখনো তোমাকে বলা হয়ে ওঠেনি, কতটা ভালোবাসি তোমাকে।

মো. মিনহাজুল ইসলাম সাকিব
এলএল.বি (সম্মান), ২য় বর্ষ
আইন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


প্রজন্মনিউজ২৪/এসএমএ

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন