ছেলে আমার শহরে গিয়ে নষ্ট হলো

প্রকাশিত: ২৫ মে, ২০২২ ১১:২৮:৪০ || পরিবর্তিত: ২৫ মে, ২০২২ ১১:২৮:৪০

ছেলে আমার শহরে গিয়ে নষ্ট হলো

ছেলেটির নাম আবিদ। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে এইট পাশ করে শহরের একটি মেসে উঠেছে সে। গ্রামে সবার কাছে ভালো এবং প্রশংসনীয় ছেলে হিসেবেও নামডাক আছে আবিদের। কিন্তু এই ভালো ছেলেটি কেন যেন শহরে গিয়ে খারাপ হয়ে গেল! প্রতিদিন একটি না একটি অভিযোগ তার নামে আসতে লাগলো বাবা- মায়ে ও শ্রেণি শিক্ষকের কাছে। তার বাবা-মায়ের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। এতো ভালো ছেলেটির এই অধঃপতন কেন যেন তারা মানতে পারছে না। তাইতো তারা সোজা বলে দিলো ‘ আমার ছেলে শহরে গিয়ে নষ্ট হলো "।

আমি বলি, আসলেই কি আবিদ শহরে গিয়ে নষ্ট হলো? গ্রামের প্রশংসনীয় ছেলেটি শহরে গিয়ে কেন নষ্ট হবে? গ্রামেই বা কেন নষ্ট হলো না? আসলে উত্তর হলো আরেক জায়গায়।

★চলুন আবিদের গল্প শুনে আসি-

ঘটনা -১: আবিদ গ্রামের এক মেয়েকে পছন্দ করে। ছোট বেলার প্রেম, সে তো স্বপ্নের ঘোরে হাবুডুবু খাচ্ছে। যখনই সময় পায় তাকে নিয়ে চিন্তায় মগ্ন থাকে। পড়ালেখায় একদম মন নেই তার। মন তার প্রেমের উত্তাল সাগরে নিমজ্জিত। ছোট ছেলেটির পড়ালেখার প্রতি অমনোযোগী, অনীহা মায়ের কাছে প্রকাশ পেল। মা তার ছেলের কাছ থেকে ভালোবেসে তার মনের কথা জেনে নিল। সহজ-সরল ছেলে তার মায়ের কাছে সব খুলে বলে।মা আর কিছু বলেনা, চলে যায়। হটাৎ রাতে তাঁর বাবা এসেই চটকানি দিতে শুরু করলেন। স্বল্প সময়ের ঘটনায় বাকরুদ্ধ আবিদ। বাবা তার বলতে শুরু করেছেন-' মেয়েটি পাশে বা তার বাড়ির আসে পাশে যদি তোকে আর দেখি জীবন্ত কবর দিয়ে দিব।

আবিদ চুপসে যায়। আবিদের সব প্রেম যেন নিমিষেই হাওয়া হয়ে গেল। মনে মনে আবিদ ভাবে বাবারা এরকম কেন? আবিদের আবেগী প্রেমের ভয়ংকর প্রেমের ইতি পরে গেল।

ঘটনা -২: সেবার ঈদ এসেছে। ঈদ আসলে আবিদ এর খুশী দেখে কে! আবিদের মনে হয় ঈদ মানে আনন্দ, হাসি খুশী, ঘোরাঘুরি আর বড়দের কদমমূছি করে সালামি নেওয়া। সে যেন এক রাজ্যের রাজা। সব শান্তি তারই কাছে,সাথে আছে সালামি পাওয়া টাকা আর টাকা। আবিদের আনন্দ দেখে কে?

ছেলে কাছে অতিরিক্ত টাকা দেখে হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে মা আবিদকে বলে-' বাবা আহাদ, তুমি তো অনেক সালামি পেয়েছো। সালমি গুলো যদি হারিয়ে যায় বা চুরি হয়ে যায় তাহলে তোমার মন খারাপ হবে। তাই তুমি কিছু টাকা আমার কাছে দিয়ে অল্প টাকা তোমার কাছে রাখো। আবিদ তার মায়ের কথা রাখে। সে অল্প কিছু টাকা রেখে বাকিটা মায়ের কাছে দিয়ে দেয়।

হটাৎ একদিন আবিদ তার মাকে বলে -' মা, আমি লুড়ু খেলার বাজি ধরেছি। আমাকে পাচঁশো টাকা দাও। হারলে টাকা যাবে, জিতলে আমি আরো পাচঁশো পাবো।' মা আবিদকে বলে-' চটকানি খেতে ইচ্ছে না হলে সামনে থেকে  যা!' আহাদ ভয়ে ভয়ে স্থান ত্যাগ করে আর মনে মনে ভাবে মা আমার টাকা আমাকেই দেয় না কেন?

ঘটনা -৩: আবিদ বাবা একজন সরকারি অফিসার। ছোট্ট আবিদ সারাদিন বসে থাকে বাবা অপেক্ষায়। তার বাবার আর সময় কই? সারাদিন পরিশ্রম করে বাসাই এসে দিয়ে দেয় লম্বা ঘুম। আবিদ ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়ে। নিয়মিত এই রুটিন আর ভাল্লাগেনা আবিদের। হটাৎ একদিন আবিদের বাবা নিয়ে একসাথে অনেকগুলো খেলনা। ঘুম থেকে উঠে খেলনা গুলো দেখে আবিদের যেন খুশিতে আত্মহারা। খেলনা গুলোর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ছিল ব্যাটারি চালিত রেল গাড়িটি। আবিদেরও গাড়িটি খুব পছন্দের। খেলনা গুলো পেয়ে খুশিতে রাফসান খেলতে বসে গেল। হটাৎ, আবিদের বড় ভাই এসে বলল- আবিদ, তোমার রেল গাড়িটি একটু আমাকে দিবা, আমি তোমাকে আবার দিয়ে দিব? ছোট্ট আবিদ বড় ভাইকে তার খেলনাটি দিয়ে দিলো। খেলতে খেলতে আবিদের বড় ভাইয়াকে দেওয়া প্রিয় রেল গাড়িটির কথা মনে পরলো। আবিদ তার ভাইকে বলল- গাড়িটি দাও। তার ভাইতো তাকে গাড়িটি দিলো না, উল্টো গাড়িটা ভেঙে ফেললো। বড় ভাইয়ের কর্মটিতে ছোট্ট আবিদের কমল হৃদয়ে দাগ কেটে গেলো। আজ চৌদ্দ বছর সেই স্মৃতি রয়ে গেছে তার মনে।

ও কি যেন বলেছিলাম- আবিদের বাবা- মায়ের কথা "আমার ছেলে শহরে গিয়ে নষ্ট হলো"।
চলুন তাহলে জেনে আসি কি এমন অপরাধে আবিদের বাবা-মায়ের কাছে ছাত্র ও শিক্ষকদের এত অভিযোগ!

ঘটনা ১ : "আবিদ এখন শহরের নাম করা স্কুলে মাধ্যমিকে পড়ে। শহরের রঙ্গিন পৃথিবীতে সে এখন তথাকথিত একজন স্মার্টবয়। শহরের নিত্য নতুন পার্ক ও বন্ধু পেয়ে খুশিতে আবিদের মন নেচে উঠে। ছেলে শহরের নাম করা স্কুলে পড়ে তাই ছেলেকে ভালো মানুষ করার জন্য অর্থের অভাব বুঝতে দেয়না বাবা। নাম করা স্কুলের স্মার্ট ছেলের মেয়ে বন্ধুর কোন অভাব নাই। আবিদও আবার চুটিয়ে প্রেম করে স্কুলের স্মার্ট মেয়ের সাথে। ঘুরে ঘুরে বেড়াই শহরের অলি গলিতে। কারন সে জানে তাকে এখানে বকা দেওয়ার মতো কেউ নেই। কেউ তাকে বলবেনা এই সমস্ত পাপ কাজে জড়িত হয়োনা। বেপরোয়া আবিদকে কেউ কিছু বলেওনা, কারণ সাবাই জানে টাকা থাকলে পাওয়ার থাকে। এখন আবিদ স্বাধীন।

ঘটনা ২: বেপরোয়া আবিদ এখন সাদা কালো দুনিয়ায় রঙ্গিন দেখতে পায়। টাকার গন্ধে পাগল আবিদ। বন্ধুদের সাথে পার্টি আর মস্তি-মজ্জায় চলে আবিদের দিনকাল।
টাকা ছাড়া যেন মূহুর্ত চলে না আবিদের। তাইতো সে উল্টা-পাল্টা বলে অর্থ আদায় করে বাবা-মায়ের কাছ থেকে। টাকা না দিতে পারলে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে পরিবারে। কথা বন্ধ করতে দ্বিধা করেনা আবিদ। আদরের ছেলেটিকে দু‘নয়নে দেখতে পায়না, আবার যদি কথাও বন্ধ করে দেয়, কোন বাবা-মায়ের মন আর ভালো থাকে। সইতে না পেরে বাবা ছেলের মন রক্ষার্থে টাকা পাঠাতে থাকে। আর আবিদ মেতে উঠে নেশা ও আড্ডায়।

ঘটনা ৩: বন্ধুর অভাব নেই আবিদের। টাকার জুড়ে বন্ধু কিনে আবিদ। বন্ধুরাও কিছু পাওয়ার আসায় আবিদের আবদার পূরণ করে। আবিদের বন্ধু আহাদ এর জন্মদিনে তার বাবা তাকে গিপ্ট করে দামি একটি শার্ট। আহাদের খুব পছন্দ হয়েছে শার্টটি। আবিদ আহাদের শার্ট টি দেখে বললো তোর শার্ট টি খুব সুন্দর। আজ আমার একটা পার্টি আছে, তোর শার্ট টি আমাকে দে আমি তোকে আবার দিয়ে দিব। বন্ধুর মন রক্ষার্থে শার্ট টি দিয়ে দেয় আহাদ। কিন্তু শার্টটি দিবে দিবে বলেও আর দিলোনা আহাদকে আবিদ। এভাবে সে মিথ্যুক পরিনত হয় বন্ধুদের কাছে।

আমরা পড়লাম তথাকথিত আবিদের কিছু উল্লেখ্য ঘটনা।
চলুন না আমরা এবার কিছু প্রশ্ন করে আসি আবিদের বাবা-মায়ের কাছে।

বলুনতো, ★আবিদ কেন হারাম কাজে লিপ্ত?
★আবিদ কেন অপচয় কাজে জড়িত?
★আবিদ কেন বন্ধু মহলে মিথ্যুক বলে পরিচিত?

★আবিদের অধঃপতন হওয়ার পেছনে সমাজের সাথে সাথে আবিদের বাবা- মা ও কি দায়ি নই?আবিদ কে তার বাবা চটকানি দেওয়ার আগে কি বলতে পারতেন না- বাবা আবিদ আমরা মুসলিম।আমাদের মঞ্জিল জান্নাত। পথে ভালোবাসা নামক অনৈক অবৈধ পন্থা তোমার সামনে আসতে পারে।সব বাধা ডিঙিয়ে তোমার মঞ্জিলের দিকে চলতে হবে তোমার।তাই তুমি সমস্ত অবৈধ রিলেশনশিপ থেকে বেরিয়ে এসে তোমার মুক্তির মঞ্জিল জান্নাতের দিকে হাঁটো।

আবিদের মা কি বলতে পারতেন না- বাবা, ইসলামে যে সমস্ত কাজ বা খেলাধূলা নিষিদ্ধ করেছে তাতে আমরা জড়িত থাকতে পারিনা। বাজি ধরা একটি অনৈতিক কাজ। যা ইসলামে হারাম। এই সমস্ত খেলায় নিজের অথবা অন্যের সর্বনাশ হয়ে থাকে।এ সমস্ত কাজ থেকে বিরত থাকতে পারা উত্তম। তাছাড়া, তুমি তোমার জমানো টাকা দিয়ে ভালো কিছু খেতে পারো,নতুন জামা ক্রয় করতে পারো, বিভিন্ন ভালো মানের বই কিনে পড়তে পারো। তাই তোমাকে বলছি তুমি তোমার  জমানো টাকা হারাম পথে ব্যায় করোনা।

সেদিন যদি আবিদের ভাই তার ছোট্ট ভাইয়ের আমানত রক্ষা করতো। যদি ছোট্ট আবিদের খেলনাটা তাকে আবার সঠিক সময় ফেরত দিতো। তাহলে আজ আবিদ তার বন্ধুদের কাছে মিথ্যুক বলে পরিচিত হতোনা। সে আমানত সম্পর্কে সচেতন থাকতো। সে চাইতো না ইচ্ছাকৃত ভাবে মুনাফেকি কাজে জড়িত হতে।

প্রিয়রা,
জানেন আমাদের  ছোট্ট ছোট্ট কিছু কাজে আশেপাশের মানুষের মনে দাগ কাটে। ছোট্ট এই সাধারণ কিছু কাজ একজন ভাইয়ের জন্যে হয়ে উঠে ভবিষ্যতের কিছু নির্মম সত্য। আমাদের সুন্দর সমাজ ও সত্য প্রজন্ম গড়ে তোলতে বিচক্ষণ ভূমিকা পালন করতে হব।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে তার দ্বীনের পথে কবুল করুক।

লেখকঃ মুহাম্মদ আনাস, নাইক্ষ্যংছড়ি।


প্রজন্মনিউজ২৪/এসএমএ

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন