আবারও ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় শুরু

প্রকাশিত: ২৩ জানুয়ারী, ২০২২ ১১:৫৭:৩৭

আবারও ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় শুরু

 

বিশ্ববাজারে হঠ্যাৎ তেলের দাম বাড়ায় বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়ে খুব ভালোভাবেই। ফলে প্রতি লিটারে ১৫ টাকা করে তেলের দাম বাড়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। আর তাতেই বিপত্তি বাঁধে বাস মালিকদের সাথে। তাদের দাবি হলো তেলের দাম বাড়ালে ভাড়াও বাড়াতে হবে, তা না হলে বাস চালাবেনা তারা। সরকার বাধ্য হয়েই ভাড়া বাড়ায় বাসের।

ফলে গত নভেম্বরের শুরুর দিকে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির পর সব ধরনের জ্বালানিচালিত বাসে বাড়তি ভাড়া নেওয়া শুরু করে বাস মালিকরা। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও এক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারিতার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়তে শুরু করে। একপর্যায়ে অর্ধেক বাস ভাড়ার দাবিতে শিক্ষার্থীরা সড়কে নেমে আসে। সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন চালাতে থাকে তারা। এসবের চাপে নভেম্বরের মাঝামাঝি বাসমালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন ভাড়া নির্ধারণ করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।

শুরুর দিকে বেশির ভাগ গণপরিবহনই নির্ধারিত ভাড়া নিত। কিন্তু এরই মধ্যে পরিস্থিতি পুরো পাল্টে গেছে। প্রায় সব গণপরিবহনই অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে বলে জানিয়েছেন ঢাকার কয়েকটি রুটের অন্তত ৫০ জন যাত্রী। ব্যতিক্রম শুধু গত মাসে চালু হওয়া রুটভিত্তিক কোম্পানির অধীনে চলা ঢাকা নগর পরিবহন।

তবে বাসে ভাড়ার তালিকা রাখা বাধ্যতামূলক করা হলেও বেশির ভাগ বাসেই তা রাখছেন না বাস মালিকরা।

ঢাকায় গণপরিবহনে সরকারের নতুন ভাড়া নির্ধারণের দুই মাস পার হতে না হতেই আবার ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত ভাড়া শুরু করেছে গণপরিবহনগুলো। সম্প্রতি ঢাকার কয়েকটি রুটে ঘুরে এ চিত্র পাওয়া গেছে। 

কেউ রাখছে নিজেদের ইচ্ছেমতো করে, আবার কেউ রাখছে ওয়েবিলের কথা বলে। আর বাসে ভাড়ার তালিকা রাখা বাধ্যতামূলক হলেও বেশির ভাগ বাসেই তার দেখা মিলছেনা। যাত্রীরা ন্যায্য ভাড়া দিতে চাইলে বাসের সহকারী, এমনকি চালকেরা তর্কে জড়াচ্ছেন, শোনাচ্ছেন বাজে কথাও। সরকার নির্ধারিত ভাড়া আমলে নিচ্ছেন না গণপরিবহনের মালিক-কর্মচারীরা।

ওয়েবিলের কথা বলে যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া রাখছে দিগুণেরও বেশি। এখন প্রশ্ন হলো ওয়েবিল কী? ওয়েবিল হলো বাসে কতজন যাত্রী থাকেন, সেই হিসাব মালিকের পরিদর্শক যে কাগজে লিখে দেন, সেটাই ওয়েবিল। একটি রুটে সাধারণত নির্দিষ্ট কয়েকটি জায়গায় মালিকের লোকেরা এই পরিদর্শন বা চেক করেন। পথে যাত্রীরা যেখানেই নামেন না কেন, নির্দিষ্ট দূরত্বের ভাড়া দিতে হয়। ধরা যাক, একজন যাত্রী আজিমপুর থেকে খামারবাড়ী যাবে। আজিমপুর থেকে খামারবাড়ীর সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা কিন্তু ওয়েবিল ব্যবস্থায় ভাড়া দিতে হবে মহাখালী পর্যন্ত ২০ টাকা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেল, রিফাত এবং সোহাগ একই বাসের পাশাপাশি দুটি আসনে বসে আছেন। দুজনেরই গন্তব্য এক খামারবাড়ী। প্রথমজন বাসে উঠেছেন ধানমন্ডি-২৭ থেকে, অন্যজন কলাবাগান থেকে। ওয়েবিল আছে সংসদ ভবনের সামনে (বাসমালিকের বেঁধে দেওয়া ভাড়া) পরীক্ষা করা হয়।

বিকাশ পরিবহনের সেই বাসে সরকার নির্ধারিত প্রতি কিলোমিটার ২ টাকা ১৫ পয়সা মেনেই ভাড়ার তালিকা ঝোলানো আছে। তবে বাসের সামনের কাচের দরজার আড়ালে। চলন্ত বাসে কাছাকাছি গিয়ে তালিকাটি পড়া বেশ কঠিন।

রিফাত এবং সোহাগের কাছে ২০ টাকা করে ভাড়া চাইলেন চালকের সহকারী। নির্ধারিত ভাড়া সম্পর্কে তাঁদের ধারণা না থাকলেও এতটুকু পথের ভাড়া এত বেশি কেন জানতে চাইলে দুই পক্ষে তর্ক শুরু হয়। চালকের সহকারী মোহাম্মদ রফিক বললেন, সামনে গিয়ে তালিকা দেখে আসেন।

ভাড়ার তালিকা অনুসারে, খামারবাড়ি থেকে বনানীর ভাড়া ১০ টাকা। সম্প্রতি সরকার নির্ধারিত সর্বনিম্ন ভাড়া এটি। তাহলে ২০ টাকা কেন চাইলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ রফিক বলেন, ভাড়া কত লেখা, তা জানি না। পড়তে পারি না।

আসলে ভাড়ার তালিকা নয়, বরং ওয়েবিলের নির্ধারিত ভাড়া চেয়েছিলেন রফিক। তর্কাতর্কির পর রিফাত এবং সোহাগ দুজনই ১৫ টাকা করে ভাড়া দিলেন। 

আজিমপুর থেকে আবদুল্লাহপুরের ধউর বেড়িবাঁধ পর্যন্ত যায় বিকাশ পরিবহনের বাসগুলো। সরকার নির্ধারিত তালিকা অনুসারে, পুরো পথের দূরত্ব প্রায় সাড়ে ২৭ কিলোমিটার, এ পথের ভাড়া ৫৯ টাকা। এ ছাড়া চার্ট অনুযায়ী মধ্যে ছয়টি স্টপেজ হিসেবে ভাড়া নির্ধারিত।

তবে এ পথে ভাড়া নেওয়া হয় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, বনানী ও আবদুল্লাহপুর এই তিন ওয়েবিলের হিসাবে। প্রথম দুটি ওয়েবিলে প্রতিটি পার হওয়ার জন্য যাত্রীকে ২০ টাকা করে এবং শেষেরটির জন্য ১৫ টাকা দিতে হয়। স্বল্প দূরত্বে চলতে গেলেই গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া।

ট্রাফিক শৃঙ্খলা পক্ষেও যত্রতত্র বাস থামানো বন্ধ হচ্ছে না। সিটিং সার্ভিসের নামে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হলেও বাসে আসনের অতিরিক্ত যাত্রী তোলা হচ্ছে। 

দেওয়ান পরিবহনের বাস আজিমপুর থেকে কুড়িল বিশ্বরোড পর্যন্ত চলে। আমি নিজে আজিমপুর থেকে গুলশান-১ যাবো। সাংবাদিকতার পরিচয় গোপন রেখে আমি ভাড়া দিলে সে ৪০ টাকা রেখে দেয় অথচ এ দূরত্বের মোট ভাড়া ২৯ টাকা। এই বাসে ভাড়ার কোন তালিকাও ছিল না। আমি গুগল মানচিত্রে দূরত্ব দেকে ২৯ টাকার কথা বললে, তারা বলে আমরা চার্ট দেখে ভাড়া কাটিনা ওয়েবিল দেখে ভাড়া কাটি। 

বাসে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে দেখা যায় অনেকেরই নির্ধারিত ভাড়া সম্পর্কে ধারণা নেই। বাসে সেই তালিকা, দেখাতেও চান না তারা।
এরকম ভাবে বিকাশ, দেওয়ান থেকে শুরু করে রজনীগন্ধা, মিডলাইন, তরঙ্গ, মালঞ্চ, এম এম লাভলী, লাব্বাইক, স্বাধীন, আয়াত, পরিস্থান, প্রজাপতি, ট্রাস্ট, আল-মক্ক সহ বিভিন্ন রুটের অনেক গাড়িতে নেয়া হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া।
 
মালঞ্চ পরিবহন চলে ধূপখোলা থেকে মোহাম্মদপুর পর্যন্ত। এ রুটে যদি গেন্ডারিয়া থেকে জিগাতলার কর্মস্থলে নিয়মিত যাতায়াত করেন এক ব্যক্তি তাহলে যাতায়াতে খরচ বাবদ ১ হাজার ৮০০ টাকা গুনতে হবে তাকে। যা নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও সাড়ে ৬০০ টাকা বেশি।
এ পথে দূরত্ব হিসেবে ভাড়া ২৬ টাকা। কিন্তু নিয়মিত নেয় ৪০ টাকা।

ট্রাস্ট বাসে করে মিরপুর ডিওএইচএস থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত তালিকা অনুসারে এ দূরত্বে ভাড়া ২৬ টাকা। কিন্তু তারা নিয়মিতই ৪০ টাকা ভাড়া নেয়।

এ ছাড়া রজনীগন্ধা ও লাব্বাইক পরিবহনের বাসেও ভাড়ার তালিকা মানার বালাই নেই। সায়েদাবাদের জনপথ থেকে রায়েরবাগ পর্যন্ত ভাড়া নিচ্ছে ২০ টাকা করে। অথচ তালিকায় ভাড়া লেখা ১৩ টাকা।

ওয়েবিলের হিসাবে নির্ধারণ না করলে বাসচালক ও চালকের সহকারীদের অনেকে সঠিক ভাড়ার হিসাব দেন না বলে জানান বিকাশ পরিবহনের চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ। তিনি বলেন, এমনটা হলে বাসমালিকের লাভ কম হয়। সে জন্য সরকার নির্ধারিত ভাড়া মানা সম্ভব হচ্ছে না।

এ ছাড়া অনেক বাসের তুলনায় আসন ভালো হওয়া, ফ্যানের (পাখা) সুবিধা রাখায় ভাড়া কিছুটা বেশি নেওয়া হয় বলে জানান হারুনুর রশিদ। তিনি বলেন, সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় চালাতে হবে জানলে আগে লোকাল বাসের মতো চালাতাম। বাসের পেছনে এত খরচ করতাম না। সরকারের এসব সিদ্ধান্ত যায় না আমাদের সাথে।

দেওয়ান পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আজাহারুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ওয়েবিলের মাধ্যমে এ রুটে আগে যে দূরত্বে ২৫ টাকা রাখা হতো, এখন রাখা হচ্ছে ২০ টাকা। এ কারণে দৈনিক দুই হাজার টাকার বদলে এখন লাভ হচ্ছে এক হাজারের মতো। সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় গেলে লাভ আরও কমবে।

আজাহারুল ইসলাম বলেন, দেওয়ান পরিবহনের রুটে ফার্মগেটের কোচিং সেন্টারসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক সংখ্যক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে অর্ধেক ভাড়া রাখতে হচ্ছে। এ ছাড়া পরিবহনের পক্ষ থেকে মাসে দুই লাখ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়। যদিও কাদের দিতে হয়, সে নাম তিনি বলতে রাজি হননি।

সরকার নির্ধারিত ভাড়া না মানার বিষয়ে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকায় চলা ১২০টি কোম্পানির পাঁচ হাজার গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

তবে অভিযোগ পেলেই মালিকদের সমিতি অফিসে ডাকা হচ্ছে ও আলোচনা করা হচ্ছে বলে দাবি খন্দকার এনায়েত উল্যাহর। তিনি বলেন, তারপরও অনেকে নিয়ম মানতে চান না।

ওয়েবিলে না চললে চুরির আশঙ্কা থাকে, এমন কথার জবাবে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বলেন, কথাটা সত্য। শ্রমিকেরাই আসলে বাসের ভাড়া কাটে। শ্রমিকেরা বেশি লাভের জন্য মালিকদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে এখনো কাজ করছে।

ঢাকার বিভিন্ন রুটে বর্তমানে আটজন ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে অভিযান পরিচালনা করছে বিআরটিএ।

বিআরটিএর চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ম্যাজিস্ট্রেটরা গাড়ির ফিটনেস, ড্রাইভারের লাইসেন্সসহ পরিবহন আইনে রয়েছে এমন সব বিষয় লঙ্ঘন হলো কি না, তা দেখেন। তিনি বলেন, এগুলোর অগ্রাধিকার সর্বোচ্চ। (সরকার কর্তৃক) ভাড়া ঠিক হওয়ার পর ভাড়ার বিষয়টিও দেখছে।

তারপরও অতিরিক্ত ভাড়া আদায় কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না, এমন প্রশ্নের জবাবে বিআরটিএ চেয়ারম্যান বলেন, নিয়ন্ত্রণে না আসলে জরিমানা দিবে। কেউ যদি আইন না মানে, সেটার উত্তর তো আমার কাছে নেই। যারা খারাপ কাজ করে, তারা জেল থেকে বের হয়েও খারাপ কাজ করে।

সামান্য বাস মালিকদের যদি সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে তাহলে সাধারণ মানুষ বাঁচবে কীভাবে?


প্রজন্মনিউজ২৪/মিঠুন হাসান

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন





ব্রেকিং নিউজ