ছাত্রলীগের সভাপতি হতে এনআইডি জালিয়াতি

প্রকাশিত: ২৪ জুলাই, ২০২১ ০৮:৩০:১৩ || পরিবর্তিত: ২৪ জুলাই, ২০২১ ০৮:৩০:১৩

ছাত্রলীগের সভাপতি হতে এনআইডি জালিয়াতি

ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সভাপতি মো. ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে কমিটিতে পদ পেতে মিথ্যার আশ্রয় এবং  জালিয়াতি করে একটি ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র বানিয়ে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সবশেষ সম্মেলনে মনোনয়নপত্রে বয়স কমিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

শুধুই বয়সই নয়, জালিয়াতি করতে গিয়ে ইব্রাহিম তার বাবা মায়ের নামও পরিবর্তন করেছেন বলে প্রমাণ মিলেছে।

২০১৮ সালের ১১-১২ মে সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের। সেই সম্মেলনের ২ মাস ২২ দিন পর সমালোচিত শোভন-রব্বানীকে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক করে কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি ঘোষণা করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের শীর্ষ দুটি পদের নামও। সেখানে ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সভাপতি পদে নাম ঘোষণা করা হয় মো. ইব্রাহিমের।

ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কমিটিতে পদ পাবেন সর্বোচ্চ ২৭ বছর বয়সী ছাত্ররা। তবে ২০১৮ সালের ২৯তম ঐ সম্মেলনে কয়েকজন শীর্ষ পদ প্রত্যাশির বয়স ২৮ বছর হওয়ায় বিশেষ বিবেচনায় সংগঠনটির অভিভাবক ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা অনুর্ধ্ব-২৮ বছর নির্ধারণ করে দেন।

অনুসন্ধানে দেখা যায় মো. ইব্রাহিম ঢাকা মহানগর উত্তর সভাপতির পদে ২২ নম্বর সিরিয়ালের মনোনয়ন পত্র কিনে জমা দেন এপ্রিলের ২২ তারিখ। তার মনোনয়ন পত্রটি গ্রহণ করেন ছাত্রলীগের তৎকালীন ঢাকা মহানগর উত্তরের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও সহ-সভাপতি নুসরাত জাহান নুপুর। মনোনয়ন পত্রে তিনি পিতার নাম উল্লেখ করেন মো. ইউনুস আলী ও মায়ের নামের জায়গায় লেখেন মেহেরুন নেসা। জন্ম তারিখ লেখেন ১৯৯০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। সে অনুযায়ী সম্মেলনের সময় মো. ইব্রাহিমের বয়স ছিলো ২৮ বছর আড়াই মাস। এছাড়া মনোনয়নপত্রে তার জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর লেখেন ১৯৯০৭৯১১৫৩৭০০০০৪৩।

তবে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে ভয়াবহ তথ্য। ইব্রাহিম মনোনয়ন পত্রে যে তথ্য দিয়েছেন সেখানে তার নিজের নাম ছাড়া আর বাকি সব তথ্যই ছিলো মিথ্যা। এমনকি বয়স কমাতে তিনি তার বাবা ও মায়ের নামও মনোনয়ন পত্রে মিথ্যা লেখেন বলে প্রমাণ মিলেছে। আর যে জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর লিখেছেন, নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র শাখায় খোঁজ নিয়ে এমন কোন নম্বরের হদিসই পাওয়া যায় নি।

তবে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে মো. ইব্রাহিমের আসল পরিচয়। নির্বাচন কমিশন ও পাসপোর্ট অফিসে অনুসন্ধান করে হাতে এসেছে তার জাতীয় পরিচয় পত্র ও পাসপোর্টের আসল কপি। সেই পাসপোর্ট ব্যবহার করে তিনি বেশ কয়েকটি দেশ ভ্রমণও করেছেন।

মনোনয়নপত্রে ইব্রাহিমের দেয়া তথ্যের সাথে আসল জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের তথ্যের সাথে কোন মিল পাওয়া যায় নি। ইব্রাহিমের আসল জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর হলো ১৯৮৯৭৯১৫৮১৭০০০০০৪। আর পাসপোর্ট নম্বর EB ০৪৬৬৬২৯। যেখানে তার আসল জন্মতারিখ, বাবা মায়ের সঠিক নাম পাওয়া গেছে।  সেখানে দেখা যায়, মো.ইব্রাহিমের আসল পিতার নাম মো. আদম আলী পাত্তর। মায়ের নাম শাহানারা আক্তার। এছাড়া জাতীয় পরিচয় পত্র ও পাসপোর্ট অনুযায়ী তার জন্ম তারিখ ১৯৮৯ সালের পহেলা জানুয়ারি। এর মানে হলো- যে সম্মেলনের মধ্য দিয়ে মো. ইব্রাহিম ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি হয়েছেন অর্থাৎ ২০১৮ সালের ১১ই মে তার বয়স ছিলো ২৯ বছর ৪ মাস ১০ দিন, যা গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্ধারিত বয়সের চেয়ে ২ বছর ৪ মাস ১০ দিন বেশী। 

এমনকি আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার বিশেষ বিবেচনায় যে বয়স নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন, তার চেয়েও প্রায় এক বছর সাড়ে ৪ মাস বেশী। পুরোপুরি মিথ্যার আশ্রয়ের মাধ্যমে ইব্রাহিম ছাত্রলীগের শীর্ষ একটি পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। তবে বাবা মায়ের নাম পরিবর্তন করে জালিয়াতির এমন নজির বিশ্বে সচরাচর দেখা যায় না।

তাই প্রশ্ন উঠেছে, এমন প্রমাণিত ভয়াবহ মিথ্যার আশ্রয় নিয়েও কিভাবে ৩ বছরেরও বেশী সময় ধরে দেশের সবচেয়ে পুরাতন ও বৃহৎ ছাত্র সংগঠনের শীর্ষ পদে বসে আছেন ইব্রাহিম। অভিযোগ আছে, বরিশাল বিভাগে বাড়ি ছাত্রলীগের এমন একজন কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ নেতাকে মাসোহারা দিয়ে তিনি তার পদ ধরে রেখেছেন। বরিশালে বাড়ি ঐ শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধেও গঠনতন্ত্র অমান্য করে বিবাহ করার অভিযোগ আছে।

এদিকে বয়স ও বাবা মায়ের নাম জালিয়াতি করা ইব্রাহিমের সাথে একজন নারীর ছবি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। অবিবাহিত হিসেবে পরিচিত ছাত্রলীগ নেতার সাথে এমন ঘনিষ্ট অবস্থার ছবি ছড়িয়ে পড়ায় বেশ অস্বস্তিতে পড়েছেন ছাত্র সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে শুরু করে মধ্যম সারির সকল নেতারা। প্রশ্ন উঠেছে ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সভাপতি আদৌ অবিবাহিত নাকি কমিটিতে পদ পেতে বয়স কমানোর মত বিয়ের বিষয়েও তিনি মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন। 

ঐ নারী মো. ইব্রাহিমের বিয়ে করা স্ত্রী নাকি বান্ধবি তা নিশ্চিত করে বলতে পারেন নি কেউ। তবে অসমর্থিত একটি সূত্র জানিয়েছে, ঐ নারী তার বিবাহিত স্ত্রী। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, তার নাম নিশাত জাহান তমা। তার বাড়ি বাগেরহাট জেলার রায়েন্দা থানার তাফালবাড়ি ইউনিয়নে। যদিও ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বিবাহিত কেউ এই ছাত্র সংগঠনটির কোনো পদে জায়গা পাবেন না। এমনকি পদে থাকা অবস্থায় বিয়ে করলে কমিটি থেকে তাকে পদত্যাগ করতে হবে। আর পদত্যাগ না করলে গঠনত্রন্ত অনুযায়ী বিবাহিত নেতাকে বহিস্কার করা হবে। 

ছাত্রলীগের ত্যাগী ও মাঠ পর্যায়ের নেতা কর্মীরা বলছেন, ইব্রাহিমের এমন মিথ্যার আশ্রয়ের কারণে সমাজে তাদেরকে ছোট হতে হচ্ছে। যা নিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়াও ঢাকা মহানগর উত্তরের ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা বলছেন, ইব্রাহিম সরাসরি প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সাথে বেঈমানি করছেন।

তবে এতোসব জালিয়াতি করেও থামেন নি ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সভাপতি ইব্রাহিম। প্রভাবশালী সাবেক ছাত্রনেতাদের আশির্বাদপুষ্ট ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে কমিটি বাণিজ্য, ছাত্রলীগের মধ্যে সিন্ডিকেট তৈরি ও চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে। এমনকি বহিস্কৃতদের পুনরায় কমিটিতে প্রমোশন দিয়ে আনারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ২০১৫ সালে মাদক, অস্ত্রসহ একাধিক দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কাজে জড়িত থাকার অপরাধে উত্তরা পশ্চিম ছাত্রলীগের সহ সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক জুয়েলকে অব্যাহতি দেয় উত্তরা পশ্চিম থানা ছাত্রলীগের সভাপতি অহেদুজ্জামান খান রুমন ও সাধারণ সম্পাদক সালমান খান প্রান্ত। ছয় বছর পর ২০২১ সালের ১৬ জুলাই বহিস্কৃত জুয়েলকে এই ইব্রাহিম পুনরায় উত্তরা পশ্চিম থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ দেয়। অভিযোগ আছে বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে ইব্রাহীম এমন অনিয়ম করেছে। 

ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা বলছেন, জুয়েলকে দিয়েই উত্তরার চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করেন ইব্রাহিম। কমিটি ঘোষণার পর অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইব্রাহিমের এমন সিদ্ধান্ত ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

এসব বিষয়ে ইব্রাহিমের কাছে জানতে চাইলে বলেন, সব তো জানেন ই ভাই। এসব বাদ দেন। এগুলো পুরনো বিষয়। কেন বারবার সামনে নিয়ে আসছেন। আমার বিরোধী পক্ষ এসব অভিযোগ সামনে এনে হেয়প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। আমার বিরুদ্ধে এগুলো ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। মেয়েসহ অন্তরঙ্গ ছবির বিষয়ে জানতে চাইলে বিষয়টি এড়িয়ে যান ইব্রাহিম।

এবিষয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য বলেন, আমরা কোনো অভিযোগ পাইনি। যদি অভিযোগ আসে তাহলে তদন্ত করে দেখবো। তবে বিবাহিতরা কেউ ছাত্রলীগে থাকতে পারবে না।

সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, এখন ফেসবুক, ইউটিউবসহ সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক অপপ্রচার চলছে। ছাত্রলীগ এখন ভালো কাজ করছে তাই ষড়যন্ত্রের মাত্রাও বাড়ছে। যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে এসবের কোনো সত্যতা নেই।

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ