করোনায় মৃত্যুহার বৃদ্ধির শঙ্কা: প্রতি ১৫ মিনিটে একজনের মৃত্যু!

প্রকাশিত: ২০ এপ্রিল, ২০২১ ১০:৫৫:০৯

করোনায় মৃত্যুহার বৃদ্ধির শঙ্কা: প্রতি ১৫ মিনিটে একজনের মৃত্যু!

গত কয়েক দিন ধরে দেশে করোনার সংক্রমণ অনেকটাই স্থিতিশীল। তবে করোনায় আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর রেকর্ড ভাঙছে প্রতিদিনই। দেশে করোনা ভাইরাসে এক দিনে আরো ১১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এখন পর্যন্ত এটিই এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু। এ নিয়ে টানা চার দিন দেশে দৈনিক শতাধিক মানুষের মৃত্যু হলো। দেশে করোনাভাইরাসে মোট আক্রান্ত হয়েছেন ৫ লাখ ৩৮ হাজার ৩৭৮ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ৮ হাজার ২২১ জন। সুস্থ হয়েছেন ৪ লাখ ৮৩ হাজার ৯৩১ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ১৩ হাজার ৭৬২ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। নমুনা পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার ২ দশমিক ৩০ শতাংশ।

বাংলাদেশে গত ৩ দিনের মৃত্যুহার বিবেচনা করলে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে প্রতি ১৫ মিনিটে একজনের মৃত্যু হচ্ছে। এপ্রিল মাসের মৃত্যু হার বিবেচনা করলে, কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে এই মাসে প্রতি ১৮ মিনিটে একজনের মৃত্যু হচ্ছে। গত শুক্র ও শনিবার ১০১ জন করে এবং রবিবার ১০২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, করোনার সংক্রমণ কমলেও মৃত্যু আরো বাড়তে পারে। রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি কোনো হাসপাতালেই আইসিইউ খালি নেই। এদিকে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার প্রটোকল আপডেট করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সোসাইটি অব মেডিসিনকে।

পরিসংখ্যানে দেখে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলেন, সরকারি হাসপাতালের চেয়ে বেসরকারি হাসপাতালে করোনা রোগীর মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। করোনার সংক্রমণ স্থিতিশীল কিংবা কমলেও মৃত্যু আরো বাড়বে। কেউ কেউ এক মাস পর্যন্ত মৃত্যু বৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন, দুই-এক সপ্তাহ পর মৃত্যু কমতে পারে। তবে সামনে দেশে করোনার তৃতীয় ঢেউ আসছে, যেটি দ্বিতীয় ঢেউয়ের চেয়ে আরো ভয়াবহ হবে বলে আশঙ্কা করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলেন, সবাইকে আরো সতর্ক হতে হবে। করোনা নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত সবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

করোনার চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার প্রটোকল আপডেট করতে রবিবার (১৮ এপ্রিল) স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের সঙ্গে সোসাইটি অব মেডিসিনের কর্মকর্তাবৃন্দ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বৈঠক হয়। বৈঠকে মৃত্যু বৃদ্ধির কারণ? কোথায় কতজনের মৃত্যু হচ্ছে? করোনার চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা প্রটোকল আপডেট করা যায় কি না? এসব বিষয়ে পরামর্শ দিতে সোসাইটি অব মেডিসিনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। অন্যান্য সোসাইটির বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ গ্রহণ করে সোসাইটি অব মেডিসিন চূড়ান্ত মতামত দেবে। সোসাইটি অব মেডিসিনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, এ ব্যাপারে ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। দ্রুত মতামত দেওয়া হবে।

এদিকে মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালে করোনা রোগী ভর্তি শুরু হয়েছে। গতকাল মোট ৩৮ জন করোনা রোগী ভর্তি হয়েছেন এই হাসপাতালে। এর মধ্যে ছয় জন আইসিইউতে ভর্তি হয়েছেন। আইসিইউতে নেওয়ার পর এক জন করোনা রোগী মারা গেছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, করোনার সংক্রমণ স্থিতিশীল আছে। মৃত্যু হয়তো আরও বাড়বে। তবে সংক্রমণ ও মৃত্যু কমে গেলেও স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে, না হলে করোনার তৃতীয় ঢেউ ভয়ংকর রূপ নেবে। বিশ্ব থেকে করোনা নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় গত ২৯ মার্চ বেশ কিছু বিধিনিষেধসহ ১৮ দফা নির্দেশনা জারি করেছে সরকার। যার সুফল হিসেবে দেশে বর্তমানে করোনা সংক্রমণ স্থিতিশীল। তবে মৃত্যু বাড়ছে। মৃত্যু আরো বাড়বে। হয়তো এক সপ্তাহ পর মৃত্যু কমতে পারে।

তিনি বলেন, চলমান সর্বাত্মক লকডাউনের সুফল আগামী ২৮ এপ্রিলের পর পাওয়া যাবে। আমাদের সবার সতর্ক থাকতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। করোনা সংক্রমণ কমে আসার পর অসতর্ক হলে সামনে দেশে তৃতীয় ঢেউ ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনবে।

মুগদা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, করোনায় মৃত্যু বাড়তে থাকবে। সংক্রমণ স্থিতিশীল আছে। মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে করোনা রোগীদের জন্য ৫০টি সিট খালি আছে। সরকারি হাসপাতালে মৃত্যু হার কম।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. নাজমুল হক বলেন, মৃত্যু বেশি হওয়ার কারণ, কোথায় বেশি মৃত্যু হচ্ছে, কোন বয়সিরা বেশি মারা যাচ্ছে, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা প্রটোকল আপডেট করার প্রয়োজন আছে কি না, সব কিছুর ব্যাপারে মতামত দিতে সোসাইটি অব মেডিসিনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করে তারা মতামত দেবে। করোনা সংক্রমণ কমে গেলেও ঝুঁকি আছে। তৃতীয় ঢেউ আসতে পারে। তাই সবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সৈয়দ শফি আহমেদ বলেন, করোনার বর্তমান ভ্যারিয়েন্টে প্রচুর শিশু আক্রান্ত হচ্ছে। তবে শিশু মৃতের সংখ্যা কম। করোনায় আক্রান্ত যেসব শিশু মারা যাচ্ছে তারা অন্য রোগেও আক্রান্ত। ঢাকা শিশু হাসপাতালে আইসিইউ বেড খালি নেই। বর্তমান ১৬ জন রোগী ভর্তি আছে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক বলেন, ঢামেকে বর্তমানে ৭৫০ জন করোনা রোগী ভর্তি আছেন। ১০০ বেড খালি আছে। তবে আইসিইউ শয্যা খালি নেই। গত দুই দিন ধরে করোনা রোগী কম আসছে বলে তিনি জানান।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. খলিলুর রহমান বলেন, করোনা রোগীদের জন্য পাঁচটি বেড খালি আছে। তবে আইসিইউ শয্যা খালি নেই।

কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শিহাব উদ্দিন আহমেদ বলেন, ১৫০ জন রোগী ভর্তি আছে। ২৬ বেডের আইসিইউর একটিও খালি নেই। আইসিইউর জন্য সিরিয়াল অনেক লম্বা। তবে সাধারণ শয্যা খালি আছে।

উল্লেখ্য, গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১১২ জন নিয়ে দেশে এ পর্যন্ত করোনায় মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৪৯৭ জনে। গত ৩১ মার্চ ৫২ জনের মৃত্যুর খবর দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এরপর থেকে দৈনিক মৃত্যু কখনই ৫০-এর নিচে নামেনি। গত চার দিন ধরে মৃত্যু ১০০-এর নিচে নামছে না।

গত ২৪ ঘণ্টায় আরো ৪ হাজার ২৭১ জন নতুন রোগী শনাক্তের খবর দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ নিয়ে দেশে করোনা ভাইরাসের আক্রান্তের সংখ্যা ৭ লাখ ২৩ হাজার ২২১ জনে দাঁড়াল। সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ে গত কয়েক দিন ধরেই দিনে ৬ হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হয়ে আসছিল। এর মধ্যে গত ৭ এপ্রিল রেকর্ড ৭ হাজার ৬২৬ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। গত ২৪ ঘণ্টায় সেরে উঠেছেন ৬ হাজার ৩৬৪ জন। তাদের নিয়ে সুস্থ হওয়া রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ২১ হাজার ৩০০ জন। গত এক দিনে যারা মারা গেছেন, তাদের মধ্যে ৭৫ জন পুরুষ আর নারী ৩৭ জন।#

প্রজন্মনিউজ২৪/ফাহাদ

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন