উর্পাজনে অনিশ্চয়তায় ঢাকা ছাড়ছে শ্রমজীবিরা

প্রকাশিত: ১২ এপ্রিল, ২০২১ ০৭:৫৮:২২

উর্পাজনে অনিশ্চয়তায় ঢাকা ছাড়ছে শ্রমজীবিরা

অসীম আল ইমরান, ঢাকা:

সন্তান বাড়ি এসেছে। মায়ের খুশির অন্ত নেই। সন্তানের প্রিয় খাবারগুলো রান্না করাই তার সারা দিনের কাজ। কেন না,  কয়েকদিন পরেই প্রিয় সন্তান আবারো শহরে চলে যাবে। বছরে অল্প কয়েক দিনের জন্য যতবারই সন্তানকে কাছে পাওয়া যায়, আদর যত্নের কোনো কমতি রাখেন না বাবা-মা। কখনো কখনো সন্তানকে দেখতে ইচ্ছে করলেও পড়াশুনা বা চাকরির ব্যস্ততার কারণে তারা বাড়ি আসতে পারে না। সেই সন্তানরাই এখন অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িতে ফিরছেন।

তারা দীর্ঘদিন বাড়িতে থাকবেন এমন খবরেও খুশি হতে পারেছেন না বাবা-মায়েরা। কেন না সন্তান যে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত দেখতে পেয়েই গ্রামে চলে আসছেন। কবে ফিরবেন তাও জানেন না। কেউ চাকরি হারিয়ে, কারো ইউনিভার্সিটি বা স্কুল-কলেজ বন্ধ, কেউবা চাকরি খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে হতাশায় ফিরে যাচ্ছেন। তারা জানেন না আবার এই যান্ত্রিক শহর ঢাকায় কবে ফিরবেন।

করোনা ভাইরাসের কারণে বর্তমানে সারা বিশ্বের অর্থনীতি এখন মুমূর্ষ অবস্থায়। আমাদের দেশের বেশিরভাগ চাকরিজীবীই অফিস করছেন ঘরে বসে। অথবা কারো কারো কর্মস্থলে যাওয়া লাগলেও তা সীমিত আকারে।

তবে এরমধ্যে অনেককেই চাকরি হারিয়ে কর্মস্থল ঢাকা শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যেতে হচ্ছে। আবার অনেক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী যারা বিভিন্ন মেসে থাকতেন তারাও মেস ভাড়ার ঘানি টানতে না পেরে গ্রামে যাচ্ছেন।

রাজধানীতে জানুয়ারী মাসে একবুক স্বপ্ন নিয়ে চলে আসেন দেশের রংপুরের আলিফ মিয়া। ঢাকায় আসার মূলত উদ্দেশ্যে কোন ভাবে জীবন নামক গাড়ীটার চালানোর জন্য। অপেক্ষায় ছিলেন একটি চাকুরি জোগাড় করে স্থায়ী হবেন এই শহরে। এর ফাকে অন্য কাজ করবেন। কিন্তু মহামারি করোনার আাবার ঢেউ আসাতে ভাসতে হচ্ছে তাকে। উর্পাজন নাই তাই মেস ভাড়া দিতে হিমশিম খেতে হয়। তাই বাধ্য হয়েই রাজধানী ছেড়ে গ্রামের রংপুরে চলে যাচ্ছি।

তিনি আরো বলেন, তার মেসেই তিনিসহ ছয়জন চাকরি প্রত্যাশি ছিলেন। সবাই মেস ছেড়ে দিয়ে গ্রামে চলে গেছেন।

একটি বায়িং হাউজে চাকরি করতেন কুমিল্লার বাহারুল ইসলাম। করোনার কারণে চাকরিচ্যুত হন তিনি। এরপর আরো একমাস এই শহরে ছিলেন, নতুন চাকরি খুঁজে পাওয়ার প্রত্যাশায়। নতুন চাকরির ব্যবস্থা করতে না পারায় তিনিও তিন সন্তান নিয়ে গ্রামে চলে যাচ্ছেন।

গ্রামে গিয়ে কী করবেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গ্রামে গেলে অন্তত পক্ষে বাড়ি ভাড়াটাতো আর দেওয়া লাগবে না। তবে চিন্তায় আছি সন্তানদের পড়াশুনা নিয়ে। স্কুল খুললেতো আবার ওদের নিয়ে আসতে হবে। ততোদিনে একটা চাকরির ব্যবস্থা করতে না পারলে কী হবে?

গবেষণা সংস্থা পিপিআরসি ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের কোভিড ১৯-এর প্রথম সময় জীবিকা, ক্ষতি ও সহায়তা শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনার কারণে সবচেয়ে বেশি আয় কমেছে রেস্তোরাঁর কর্মীদের। তাদের রোজগার কমেছে ৯৯ শতাংশ। রোজগার কমার ক্ষেত্রে এর পরের অবস্থানে আছেন ভাঙারির কর্মীরা। তাদের রোজগার কমেছে ৮৮ শতাংশ। রিকশাচালকদের আয় কমেছে ৮৪ শতাংশ। দিনমজুরের আয় কমেছে ৮৩ শতাংশ। শিল্পীসমাজের আয়ও কমেছে ৮৩ শতাংশ। মালি ও কারখানার কর্মীদের আয় কমেছে ৮০ শতাংশ। এ ছাড়া দক্ষ শ্রমিকদের ৭৯ শতাংশ, কৃষিশ্রমিকদের ৭৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ৭৩ শতাংশ, দোকান, সেলুন, পার্লারের রোজগার কমেছে ৭২ শতাংশ। পোশাককর্মীদের আয় কমেছে ৪৯ শতাংশ, কৃষকের ৪৪ শতাংশ, পিয়ন ও নিরাপত্তারক্ষীদের ৪৩ শতাংশ, অফিসের আনুষ্ঠানিক কর্মীদের কমেছে ৩৩ শতাংশ এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের আয় কমেছে ২৭ শতাংশ। অপর এক জরিপে দেখা যায়, কোভিড ১৯-এর কারণে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর বহুবিধ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবারের কমপক্ষে এক সদস্য চাকরি হারিয়েছেন।  

২০২০ সালে আইএলও বলেছে, বিভিন্ন আয়ের মানুষ এর ফলে ক্ষতির শিকার হবে; কিন্তু সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণি। ২০০৮-২০০৯ সালের বিশ্বমন্দার সময় যত মানুষ চাকরি হারিয়েছে, এই হার তার চেয়েও বেশি।

আইএলওর তথ্য অনুযায়ী আবাসন ও খাদ্যের পাশাপাশি নির্মাণ, খুচরা বিক্রি, ব্যবসা এবং প্রশাসনিক খাতগুলো বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছে।


প্রজন্মনিউজ২৪

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন