সুপেয় পানির তীব্র সংকট, বৃষ্টির অপেক্ষায় উপকূলবাসী

প্রকাশিত: ২২ মার্চ, ২০২১ ১১:৪৫:৫২

সুপেয় পানির তীব্র সংকট, বৃষ্টির অপেক্ষায় উপকূলবাসী

খুলনাসহ উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় খাবার পানির অন্যতম উৎস বৃষ্টির পানি। দুর্যোগপূর্ণ পরিবেশ, অনাবৃষ্টি, লবণ পানির প্রভাব, সুপেয় পানির উৎস না থাকার কারণে উপকূল অঞ্চলের মানুষ এখন খাবার পানির চরম সংকটের মধ্যে রয়েছে। প্রতি বছর মার্চে বৃষ্টি হয়। এবছর এখনও বৃষ্টির দেখা নেই। ফলে সংকট আরও তীব্র হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট জেলার শ্যামনগর, আশাশুনি, কালিগঞ্জ, তালা, দেবহাটা, কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, ডুমুরিয়া, মংলা, রামপাল, চিতলমারী, মোড়েলগঞ্জ, বাগেরহাট ও শরণখোলা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে পানি সংকট আছে।

এই এলাকার প্রায় ৫০ লাখ মানুষ কমবেশি খাবার পানির সংকটে রয়েছে। এক কলস পানি সংগ্রহের জন্য নারী ও শিশুরা ছুটে যায় গ্রাম থেকে গ্রামে। কোনও কোনও গ্রামে মিষ্টি পানির আধার বলতে আছে ২/১টি পুকুর। তবে অধিকাংশ গ্রামে পুকুরও নেই।

দাকোপ উপজেলার সুতারখালী গ্রামের গৃহিণী আলেয়া বেগম বলেন, পানির জন্য বর্ষায় আমরা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। বর্ষাকাল যেন দীর্ঘস্থায়ী হয়, আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি। বছরের ১২ মাসের মধ্যে বর্ষাকালের ৩-৪ মাস ভালো পানি পাই। বাকি সময়টুকু খাবার পানির তীব্র সংকট থাকে। ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পানির আধারগুলো অনেক দূরে থাকার ফলে পানির জন্য টিকে থাকার লড়াই আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। পানি না হলে ঘরের অন্য কাজগুলো বন্ধ থাকে। বিকালে ঘরের সব কাজ শেষ করে তিনি পানি সংগ্রহে বের হন। দুই কলসি পানি দিয়ে দিনের সব কাজ করতে হয় তাকে। এটুকু পানি সংগ্রহ করতে তার ৩ ঘণ্টারও বেশি সময় ব্যয় হয়।

এভাবেই এ গ্রামের শতাধিক পরিবার পানির জন্য লড়াই করছেন বছরের পর বছর। আর এই লড়াইয়ের অগ্রভাগে থাকেন নারী। ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল গ্রামটি। প্রায় ৫ বছর এলাকাটি ছিল পানির নিচে। সে সময় খাবার পানির সব আধার নষ্ট হয়ে যায়।

জলবায়ু পরিবর্তন আর পরিবেশগত নানা সমসয়ায় উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বাড়ছে। আইলার আগে এই এলাকায় এতটা পানির সংকট ছিল না। কিন্ত আইলার প্রলয়ে সুপেয় পানির সবগুলো আধার লবণ পানিতে ডুবে যায়। সেগুলো থেকে এখন আর লবণ পানি সরানো যাচ্ছে না। ফলে মিঠা পানির সংকট দিন দিন বাড়ছে।

দাকোপ উপজেলার কালাবগি ঝুলন্ত গ্রামের বাসিন্দা সুফিয়া বেগম বলেন, আগে আমরা এলাকা থেকেই খাবার পানি সংগ্রহ করতে পারতাম। কিন্তু কয়েক বছর ধরে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয় দাকোপ উপজেলা সদর থেকে নৌপথে। ট্রলারে করে ড্রাম ভরে পানি আনা হয়। অনেক কষ্টে খাবার সংগ্রহ করতে পারি। কিন্তু পানি সংগ্রহ করা আমাদের জন্য খুবই কঠিন।

সাতক্ষীরার গাবুরা ইউনিয়নের ১০ নম্বর সোরা গ্রামের আছমা খাতুন বলেন, একফোঁটা পানির মূল্য অনেক। নারী-পুরুষ ও শিশুরা পায়ে হেঁটে পানি আনেন, আবার কখনও ড্রাম ভরে ভ্যানে করেও আনেন। এতে পানির মূল্যটা আরও বেড়ে যায়।

আশাশুনির কুড়িকাহুনিয়া গ্রামের শাহজাহান মোড়ল বলেন, পশ্চিম উপকূলে ঠিক পাঁচ বছর আগে যেমন পানিকষ্ট ছিল, এখন সেই সংকট আরও কয়েকগুণ বেড়েছে। সংকট সমাধানে উদ্যোগের শেষ নেই। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে নানান পদক্ষেপ। তবে পানি কষ্ট খুব একটা লাঘব হয়নি। ঘরের সবদিকে পানি। অথচ খাবারের পানির জন্য আমাদের যুদ্ধ করতে হয়।

জানা গেছে, উপকূলীয় এলাকায় খাবার পানির জন্য চারটি পথ খোলা আছে। এগুলো হচ্ছে-বৃষ্টির পানি। বর্ষাকালে এলাকার মানুষ বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে। কিন্তু বড় ট্যাংকির অভাবে অনেক পারিবারের পক্ষে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় না। 

স্থানীয় ফিল্টারের পানি। স্থানীয় পর্যায়ে দুটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা লবণ পানি শোধন করে পানি খাবারযোগ্য করে। কিন্তু এর ক্যাপাসিটি মাত্র দুই হাজার পরিবার। 

উপজেলা সদর থেকে ফিল্টারের পানি সংগ্রহ। উপজেলা সদরের দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার। সেখান থেকে নৌপথে ড্রামে করে পানি সংগ্রহ করেন অনেক পরিবার।

স্থানীয় পুকুরের পানি। বাধ্য হয়ে কিছু পরিবার পুকুরের পানিতে ফিটকিরি প্রয়োগ করে ব্যবহারযোগ্য করে নেয়।

‘জলবায়ু পরিবর্তন ও লবণাক্ত এলাকা সম্প্রসারণের পরিপ্রেক্ষিতে সুপেয় পানির সন্ধানে’ শীর্ষক এক সেমিনারে  প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ পশ্চিম উপকূল এলাকায় লবণাক্ততার পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ জলাধারের বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে। এ এলাকার অবস্থান ব-দ্বীপের নিম্নাংশ। ফলে নদী বাহিত পলির আধিক্য বেশি। এ কারণে ভূগর্ভে জলাধারের জন্য উপযুক্ত মোটা দানার বালু বা পলির স্তর খুব কম পাওয়া যায়। আর পলির স্তর পাওয়া গেলেও এই বালুর স্তরের পুরুত্ব খুবই কম। আর কোথাও কোথাও এই বালুর স্তরের ভূমি থেকে অনেক গভীরে। সেখান থেকে মিষ্টি পানি উত্তোলন অত্যন্ত দুরূহ।

পানি কমিটি পর্যবেক্ষণে জানা যায়, বাংলাদেশের গভীর নলকূপগুলো সাধারণত ৩০০ থেকে ১২০০ ফুটের মধ্যে হয়। দেশের উত্তরাঞ্চলের ৩০০-৪০০ ফুটের মধ্যে গভীর নলকূপ বসানো যায়। কিন্তু দেশের দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় এই নলকূপের গভীরতা ৭০০-১২০০ ফুটের মধ্যে। এসব নলকূপের পানি তূলনামূলক কম লবণাক্ত এবং আর্সেনিকমুক্ত। তবে পলি মাটির আধিক্য, পাথরের উপস্থিতি এবং অধিক লবণাক্ততার কারণে উপকূলীয় সব এলাকার গভীর নলকূপ স্থাপন করা সম্ভব হয় না।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিস খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী আকমল হোসেন বলেন, উপকূলীয় এলাকার পানি সমস্যা সমাধানে ভূভাগের ওপরের পানি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে এবং এই পানি প্রতিটি পরিবারের জন্য সহজলভ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ৪০টি পুকুর খনন করা হচ্ছে। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য সাড়ে ৫ হাজার সংরক্ষণাগার তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া প্রয়োজনীয় এলাকায় গভীর ও অগভীর নলকূপের ব্যবস্থা থাকছে।#

প্রজন্মনিউজ২৪/ফাহাদ

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন