মাসে ১০ টাকা কেটে নেওয়ার মাধ্যমে চালু করা যায় সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা

প্রকাশিত: ০১ মার্চ, ২০২১ ১২:০০:০৬

মাসে ১০ টাকা কেটে নেওয়ার মাধ্যমে চালু করা যায় সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা

দেশে সর্বজনীন বিমাব্যবস্থা চালু নেই। দাবি আছে বহু বছর ধরে। তবে পাঁচ বছর ধরে আলোচনা চলছে। কোনো অগ্রগতি নেই। বৈঠক হয়, সিদ্ধান্ত হয়, আবার চাপা পড়ে যায়। অথচ ১০ কোটি মুঠোফোন গ্রাহকের কাছ থেকে সামান্য টাকা করে নিয়েও স্বাস্থ্যবিমা চালু করা যেতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদের প্রস্তাব এটি। সৈয়দ হামিদ বলেন, স্বাস্থ্যবিমা বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রথম দিকে গ্রুপ ধরে এগোনো যায়। মুঠোফোন গ্রাহকদের কাছ থেকে মাসে ১০ টাকা করে প্রিমিয়াম নিয়েও চালু করা যায় সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা। এটা শুধু একটা নীতিসিদ্ধান্তের বিষয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) স্বীকৃত যে স্বাস্থ্যব্যবস্থার আওতায় নাগরিকেরা আর্থিক অসচ্ছলতা থেকে মুক্ত না হয়েও স্বাস্থ্যসুবিধা পেতে পারেন, সেই স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেই বলা হয় সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা। ২০১২ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বা ইউনিভার্সেল হেলথ কভারেজ (ইউএইচসি)–সংক্রান্ত প্রস্তাবে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করে আসে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসেও নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ইউএইচসির পক্ষে প্রতিশ্রুতি দেয় বাংলাদেশ।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ হচ্ছে সেই দেশ, যে দেশে রোগীদের পকেটের টাকায় চিকিৎসা খরচ হয় সবচেয়ে বেশি। এ তথ্য ডব্লিউএইচওর ২০১৮ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত তথ্যভান্ডারের। এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে চিকিৎসাসেবায় সরকারের খরচ হয় ২৮ শতাংশ আর বাকি ৭২ শতাংশ খরচই হয় রোগীদের পকেটের পয়সায়।

যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও ব্র্যাক স্কুল অব পাবলিক হেলথের প্রতিষ্ঠাতা মোশতাক রাজা চৌধুরী বলেন, ‘কোভিড-১৯ এসে দেখিয়ে গেছে, আমাদের স্বাস্থ্য খাতের করুণ চিত্র। আমরা মধ্যম আয়ের দেশের হতে যাচ্ছি। এখন অন্তত দুরবস্থা থেকে উত্তরণ দরকার। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বা ইউএইচসি বাস্তবায়ন করা সম্ভব।’

অর্থনৈতিকভাবে সমগোত্রীয় শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও মরক্কো ইউএইচসি বাস্তবায়ন করেছে উল্লেখ করে মোশতাক চৌধুরী আরও বলেন, থাইল্যান্ড ২০০২ সালে যখন ইউএইচসি বাস্তবায়ন করে, তখন তাদের জাতীয় আয় বর্তমান বাংলাদেশের সমানই ছিল। এখন দেখতে হবে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছাটা কেমন।

সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত সর্বজনীন বিমাব্যবস্থা। ২০১৫ সালে মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় বেতন কমিশনে সরকারি কর্মচারীদের জন্য বিমা পলিসি চালুর সুপারিশ ছিল। এর দুই বছর পর দুটি জেলা প্রশাসক সম্মেলনে এ নিয়ে আলোচনাও হয়। পরে আবার চুপচাপ।

তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব অরিজিৎ চৌধুরীকে প্রধান করে গত বছর একটি কমিটি করা হয়। এই কমিটি জীবন বীমা করপোরেশনের সহায়তায় একটি প্রতিবেদন দাখিল করলেও তা ওই জায়গাতেই পড়ে আছে।

গড় আয়ু ৭২ বছরের এ দেশে স্বাস্থ্যবিমা বাধ্যতামূলক নয়, যা বিশ্বের অনেক দেশেই বাধ্যতামূলক। দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশের বয়সই ২৫–৫৪ বছরের মধ্যে। এই বয়সের মানুষই মূলত উপার্জনের ক্ষমতা রাখেন। বয়স হয়ে গেল কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন তাঁদের অনেকেই।

জাতীয় পার্টির সাংসদ রুস্তম আলী ফরাজীর এক প্রশ্নের জবাবে ২০১৯ সালের ২০ জুন সংসদে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আওয়ামী লীগ সরকার স্বাস্থ্যবিমা চালুর পরিকল্পনা করছে। এ বক্তব্যের পর পৌনে দুই বছর হতে চলল।

গড় আয়ু ৭২ বছরের এ দেশে স্বাস্থ্যবিমা বাধ্যতামূলক নয়, যা বিশ্বের অনেক দেশেই বাধ্যতামূলক। দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশের বয়সই ২৫–৫৪ বছরের মধ্যে। এই বয়সের মানুষই মূলত উপার্জনের ক্ষমতা রাখেন। বয়স হয়ে গেল কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন তাঁদের অনেকেই। তাঁদের চিকিৎসাসহ আর্থিকভাবে দুশ্চিন্তামুক্ত রাখতেই দরকার সুপরিকল্পিত বিমাব্যবস্থা। সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা দরকার এ কারণেই।

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ