এখনও নারীরা পুরুষের সমান মজুরি পাচ্ছেন না

প্রকাশিত: ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ০৩:৫১:২৮

এখনও নারীরা পুরুষের সমান মজুরি পাচ্ছেন না

পৃথিবীতে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর’ -নারী ও পুরুষকে এভাবেই দেখেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ নারী উন্নয়নে ব্যাপক সক্রিয়। অথচ এখনও এ দেশে নারী কৃষি শ্রমিকরা পুরুষের সমান মজুরি পাচ্ছেন না। এভাবেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নারী কৃষি শ্রমিকরা মজুরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষ্যমের শিকার হচ্ছে।বাধ্য হয়ে নারী কৃষি শ্রমিকদের জীবন- জীবিকার সংগ্রাম চলছে পরিহাস ও্র প্রতিবন্ধকতা মধ্য দিয়ে।

ফসলের প্রাক বপন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে ফসল উত্তোলন, বীজ সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিপণন পর্যন্ত নারী এককভাবেই করে। বাড়ির বাইরে মাঠে ফসল, সবজি চাষ, মসলা উৎপাদন, শুঁটকি ও মাছ প্রক্রিয়াকরণ, মাছ ধরার জাল তৈরি ও মেরামত, হাঁসমুরগি গবাদিপশু পালনের কাজও নারীরা করেন। সামাজিক বনায়নের কাজও হয় নারীর হাত দিয়ে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষিজীবি নারীরা এভাবেই মুখ বুজে পুরুষের পাশাপাশি কাজ করে থাকে।

দেশের দক্ষিণাঅঞ্চলের শরিয়তপুরে নারী কৃষি শ্রমিক আসমা বেগম মৌমুমে ধান কাটার কাজে কারো চেয়ে কম না। কিন্তু মজুরির বেলায় পুরুষ শ্রমিকের চেয়ে তাকে পারিশ্রমিক কম দেয়া হয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী দেশের ১ কোটি ৬৮ লাখ নারী কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে কাজ করছেন। জিডিপিতে নারীর অবদান ২০ শতাংশ। উৎপাদন খাতের মোট কর্মীর প্রায় অর্ধেকই নারী। এ খাতে ৫০ লাখ ১৫ হাজার কর্মী আছেন। তাদের মধ্যে ২২ লাখ ১৭ হাজার নারী। ২০১০ সালে যেখানে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৬২ লাখ, ২০১৩ সালে এসে তা দাঁড়ায় ১ কোটি ৬৮ লাখে। কৃষি খাতে ৯০ লাখ ১১ হাজার নারী শ্রমিক আছেন।

আন্তর্জাতিক একটি সংস্থার ২০১৫ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৯০ শতাংশ বাড়িতে মুরগি পালন নিয়ন্ত্রণ করেন নারী। ছাগল ও গরু পালনে নারীদের নিয়ন্ত্রণ ৫৫ শতাংশ। কুমড়া ও লাউ চাষিদের ৪২ শতাংশ এবং টমেটো চাষিদের ৩৮ শতাংশ নারী। আলু চাষে নারীর অংশগ্রহণ এখন বিপুল। সবজি চাষের ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা প্রধান। সবজি চাষের সময় কৃষক পরিবারের নারীরা খুব ভোরে ক্ষেতে চলে যান। ক্ষেত তৈরি করা, চারা রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, চারাগাছ বাড়ার সময় দেখাশোনা করা, সেচ, সবজি সংগ্রহ, বস্তাবন্দি করার প্রতিটি পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণই প্রধান। ফুলচাষে নারীর অংশগ্রহণ বিপুল। ভুট্টা চাষেও নারী শ্রমিকরা অবদান রাখছেন।

আবহমান কাল থেকেই কৃষিশ্রমে নারীর অবদান ছিল। প্রাচীন বাংলার সমাজ চিত্রেও দেখা যায় এ দেশের প্রধান ফসল ধান চাষের বেলায় বীজধান সংরক্ষণ, ধান মাড়াই, ধানভানাসহ অনেক কাজই নারী করতেন। কিন্তু যেখানে ধান বিক্রির প্রশ্ন সেখানে ছিল পুরুষ আধিপত্য। ফলে খাটুনি থাকলেও পরিশ্রমলব্ধ অর্থ থাকত পুরুষের হাতে।  এখন তো কৃষিক্ষেত্রে নারী শ্রমিকরা পুরুষের সমপরিমাণ শ্রম দিয়ে সব ধরনের কাজ করে চলেছেন। কিন্তু নারী ও পুরুষ শ্রমিকের বেলায় মজুরি বৈষম্য এখনো আছে।

বর্তমানে নারী শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য দূর করার বিষয়ে সব সচেতন মানুষের ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। দরকার সরকারি কঠোর পদক্ষেপ।  পুরুষ কৃষি শ্রমিককে যেমন স্বল্প টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ দেয়া হয়েছে, তেমন সুযোগ নারী কৃষি শ্রমিকদেরও দেয়া প্রয়োজন। সার, বীজ, কৃষি উপকরণ ও কৃষক কার্ডের সুবিধা নারীর জন্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কৃষির যেসব ক্ষেত্রে নারী শ্রমের অবদান ৬০-৯০ শতাংশ, সেসব ক্ষেত্রে গৃহীত বাজেটারি পদক্ষেপ ও প্রণোদনার সিংহভাগ নারীর জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে। সরকারি খাসজমি বিতরণের সময় নারীর জন্য আলাদা করে সুবিধা প্রদান করতে হবে।

কৃষি ও এর উপখাতের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে নারী। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে কৃতজ্ঞচিত্তে নারীর এ উপস্থিতির কোন হিসাব স্বীকৃতি নেই। এমনকি কৃষি কাজে জড়িত নারী শ্রমিকের মূল্যায়নও করা হয় না। এখনও গ্রামীণ সমাজে কৃষি কাজকে নারীর প্রাত্যহিক কাজের অংশ বলে বিবেচনা করা হয়, মজুরি প্রদানের বিষয়টি অবান্তর। কোন কোন ক্ষেত্রে নামমাত্র মজুরি দেয়া হয়। কাজ করে নারী নাম কেনে পুরুষ। এছাড়া অন্যান্য অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অন্য নারী শ্রমিকের মতই কৃষিখাতে নিয়োজিত নারী শ্রমিকরাও তীব্রভাবে বৈষম্যের শিকার হন। কাজে স্বীকৃতির অভাব চরমভাবে লক্ষণীয়। এছাড়া নিয়মহীন নিযুক্তি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, নারীর অধিক আন্তরিকতা, অল্প মজুরি, মজুরি বৈষম্য, দুর্ব্যবহার এবং আরও নানা ধরনের নিপীড়নতো রয়েছেই।

প্রজন্মনিউজ২৪/ওসমান গনি

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন