বিশ্ব ভালোবাসা দিবস এবং আজকের প্রেক্ষাপট

প্রকাশিত: ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ১২:০১:২৬

বিশ্ব ভালোবাসা দিবস এবং আজকের প্রেক্ষাপট
মুহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল সবুজঃ ১৪ই ফেব্রুয়ারি সারাবিশ্বে বেশ পরিচিত একটি নাম “বিশ্ব ভালোবাসা দিবস বা ভ্যালেন্টাইনস্-ডে”। ‘ভ্যালেন্টাইনস্-ডে’ আসলে কি এবং এর পেছনের লুকানো ইতিহাস কি? আমি মনে করি, একজন সচেতন মানুষ হিসেবে কান কাজ করার আগে সে কাজটি সম্পর্কে অন্ততঃপক্ষে সম্যক ধারণা থাকা উচিৎ। ভালোবাসা দিবস বা ভ্যালেন্টাইনস্-ডেঃ ‘ভ্যালেন্টাইনস্-ডে’ একটি বার্ষিক উৎসবের দিন যা ১৪ই ফেব্রুয়ারিতে প্রেম এবং অনুরাগের মাধ্যমে উদযাপিত হয়। এদিন মানুষ তার ভালোবাসার মানুষকে ফুল, চিঠি, কার্ড, গহনা প্রভৃতি উপহার প্রদান করে দিনটি উদযাপন করে থাকে। বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসঃ ‘ভ্যালেন্টাইনস-ডে’র ইতিহাস প্রাচীনতম ইতিহাস। এর উৎস হচ্ছে ১৭’শ বছর আগের পৌত্তলিক রোমকদের মাঝে প্রচলিত আধ্যাত্মিক ভালোবাসার উৎসব। এ পৌত্তলিক উৎসবের সাথে কিছু কল্পকাহিনী জড়িত ছিল, যা পরবর্তীতে রোমীয় খ্রীস্টানদের মাঝেও প্রচলিত হয়। এই সমস্ত কল্প-কাহিনীর অন্যতম হচ্ছে এদিনে পৌত্তলিক (অগ্নি উপাসক) পৌরাণিক কাহিনীতে বর্ণিত- রোমিউলাস নামক জনৈক ব্যক্তি একদা নেকড়ের দুধ পান করায় অসীম শক্তি ও জ্ঞানের অধিকারী হয়ে প্রাচীন রোমের প্রতিষ্ঠা করেন। রোমানরা এ পৌরাণিক কাহিনীকে কেন্দ্র করে ১৫ই ফেব্রুয়ারি উৎসব পালন করতো। এই দিনে পালিত বিচিত্র অনুষ্ঠানাদির মধ্যে একটি হচ্ছে দু’জন শক্তিশালী পেশীবহুল যুবক গায়ে কুকুর ও ভেড়ার রক্ত মাখতো। অতঃপর দুধ দিয়ে তা ধুয়ে ফেলার পর এ দু’জনকে সামনে নিয়ে বের করা হতো দীর্ঘ পদযাত্রা। এই দু’যুবকের হাতে চাবুক থাকত যা দিয়ে তারা পদযাত্রার সামনে দিয়ে অতিক্রমকারীকে আঘাত করতো। রোমক রমণীদের মাঝে কুসংস্কার ছিল যে, তারা যদি এই চাবুকের আঘাত গ্রহণ করে তবে তারা বন্ধ্যাত্ব থেকে মুক্তি পাবে। এ উদ্দেশ্যে তারা এই মিছিলের সামনে দিয়ে যাতায়াত করতো। রোমকরা খ্রীস্ট ধর্ম গ্রহণের পরও এই উৎসব উদযাপনকে অব্যাহত রাখে। কিন্তু এর পৌত্তলিক খোলস পাল্টে ফেলে খ্রীস্টিয় খোলস পরানোর জন্য তারা এই উৎসবকে ভিন্ন এক ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট করে। প্রায় ২৭০ সালের দিকে ইতালির রোম শাসন করতেন রাজা ক্লডিয়াস-২। তখন রাজ্যে চলছিল সুশাসনের অভাব, আইনের অপশাসন, অপশিক্ষা, স্বজন-প্রীতি, দুর্নীতি এবং কর বৃদ্ধি। এতে সাধারণ জনগন ফুঁসছিল। সাম্রাজ্যবাদী, রক্তলোলুপ রোমান সম্রাট ক্লডিয়াসের দরকার ছিল এক বিশাল সেনাবাহিনীর। একসময় তার সেনাবাহিনীতে সেনা সংকট দেখা দেয়। কিন্তু কেউ তার সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে রাজি নয়। সম্রাট লক্ষ্য করলেন যে, অবিবাহিত যুবকরা যুদ্ধের কঠিন মুহুর্তে অত্যধিক ধৈর্যশীল। কারণ রাজা বিশ্বাস করতেন যে, বিয়ে মানুষকে দুর্বল ও কাপুরুষ করে তোলে। ফলে তিনি যুবকদের বিবাহ কিংবা যুগলবন্দি হওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। যাতে তারা সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে অনীহা প্রকাশ না করে। তার এই ঘোষণায় দেশের তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতীরা ক্ষেপে যায়। এসময় সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামক জনৈক যাজক সেন্ট মারিয়াসকে বিয়ের মাধ্যমে রাজার আদেশকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং তার গীর্জায় গোপনে বিয়ে পড়ানোর কাজ চালাতে থাকেন। একটি রুমে বর-বধু বসিয়ে মোমবাতির স্বল্প আলোয় ভ্যালেন্টাইন ফিস ফিস করে বিয়ের মন্ত্র পড়াতেন। তিনি পরিচিতি পেলেন ‘ভালোবাসার বন্ধু বা ‘Friend of Lovers’ নামে। কিন্তু তাকে নির্দেশ অমান্য করার কারণে রাষ্ট্রদ্রোহীতার দায়ে আটক করা হল। জেলে থাকাকালীন ভ্যালেন্টাইনের সাথে পরিচয় হয় জেল রক্ষক আস্ট্রেরিয়াসের সাথে। আস্ট্রেরিয়াস জানতো ভ্যালেন্টাইনের আধ্যাত্মিক ক্ষমতা সম্পর্কে। তিনি তাকে অনুরোধ করলেন তার অন্ধ মেয়ের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিতে। ভ্যালেন্টাইন পরবর্তীতে মেয়েটির দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেয়। এতে মেয়েটির সাথে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। রাজা তার এই আধ্যাত্মিকতার সংবাদ শুনে তাকে রাজ দরবারে ডেকে পাঠান এবং তাকে রাজকার্যে সহযোগিতার জন্য বলেন। কিন্তু ভ্যালেন্টাইন বিয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা না তোলায় সহযোগিতায় অস্বীকৃতি জানান। এতে রাজা ক্ষুব্ধ হয়ে তার মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করেন। মৃত্যুদন্ডের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে ভ্যালেন্টাইন কারারক্ষীদের কাছে একটি কলম ও কাগজ চান। তিনি মেয়েটির কাছে একটি গোপন চিঠি লেখেন এবং শেষাংশে বিদায় সম্ভাষণে লেখা হয় ‘From your Valentine’। এটি এমন একটি শব্দ যা হৃদয়কে বিষাদগ্রাহ্য করে। অতঃপর ১৪ই ফেব্রুয়ারি ২৭০ সালে ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। সেই থেকে সারাবিশ্বে ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’ পালন করা হয়। মধ্য ইংল্যান্ডের ডারবিশায়ার কাউন্টির তরুণীরা ‘ভ্যালেন্টাইনস্-ডে’র মধ্য রাতে দল বেঁধে ৩ থেকে ১২ বার চার্চ প্রদক্ষিণ করতো এবং এই চরণগুলো সুর দিয়ে আবৃত্তি করতো প্রদক্ষিণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত- I sow hempseed Hempseed I sow, He that love me best, Come after me now. তারা মনে করত- এই কথাগুলো বারবার আবৃত্তি করলে রাত্রিতে প্রেমিকজন অবশ্যই ধরা দেবে। বাংলাদেশে ভ্যালেন্টাইনস্-ডে যেভাবে আসল: ১৯৯৩ সালের দিকে বাংলাদেশে বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের আবির্ভাব ঘটে ‘যায় যায় দিন’ পত্রিকার তৎকালীন সম্পাদক শফিক রেহমানের মাধ্যমে। তিনি পড়াশোনা করেছেন লন্ডনে। পাশ্চাত্যের ছোঁয়া নিয়ে দেশে এসে লন্ডনী সংস্কৃতির প্রাকটিস শুরু করেন। তিনিই প্রথম ‘যায় যায় দিন’ পত্রিকার মাধ্যমে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস বাংলাদেশীদের কাছে তুলে ধরেন। তেজগাঁওয়ে তার পত্রিকা অফিসে চাকরি নিতে গেলে নাকি তার সাথে গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে যেতে হতো। প্রেমের যুগলবন্দি কপোত-কপোতীকে দেখে উনি নাকি খুব খুশী হতেন। এই অভিধান প্রথম ব্যবহার করেন শফিক রেহমান, এজন্য শফিক রেহমানকে বাংলাদেশে বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের জনক বলা হয়। আজ তথাকথিত ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’ সারাবিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমরাও পালন করছি। কিন্তু এই একই দিনে আমাদের ইতিহাস যে আরো বেশি রক্ত রাঙ্গা সে খবর মনে হয় খুব একটা বেশি মানুষের জানা নেই। আজ সেই দিন যেদিনে ১৯৮৩ সালে সামরিক শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে প্রথম কোন বড় ধরণের আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। আজ সেই দিন যেদিন সৈরশাসক এরশাদ ছাত্রদের মিছিলের উপর ট্রাক তুলে দিয়েছিল। কয়জন মনে রেখেছে সেদিনের শহীদ জাফর, জয়নার আর দিপালী শাহাকে। যা ‘মধ্য ফেব্রুয়ারির আন্দোলন’ নামে পরিচিত। সেই থেকে দিনটি স্বৈরাচার বিরোধী ‘ছাত্র প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে নানা আয়োজনে পালিত হয়ে আসছে। আমরা আজ যে কতটা অথর্ব এবং জাতীয় স্বার্থবিমূখ তার প্রমাণ বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমরা জেনে-বুঝে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছি। আজ কোনটি আমাদের জন্য গুরুত্ব¡পূর্ণ- গণতন্ত্রের জন্য জনগণের সংগ্রামের চতনা, নাকি সেই চেতনাকে আড়াল করার জন্য উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে প্রতিষ্ঠিত আনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব ব্যক্তি কেন্দ্রিক স্বার্থবাদী ভালোবাসার চেতনা? আমাদেরই ঠিক করতে হবে পথ। মজার ব্যাপার হলো যেটাকে বিশ্ব বাদ দিয়েছে, সেটাকে আমরা আরম্ভ করেছি। ভ্যালেন্টাইনস্-ডের চেতনা বিনষ্ট হওয়ায় ১৭৭৬ সালে ফ্রান্স সরকার কর্তৃক ভ্যালেন্টাইন উৎসব নিষিদ্ধ হয়। ইংল্যান্ডে ক্ষমতাসীন পিউরিটানরাও একসময় প্রশাসনিকভাবে এ দিবস উদযাপন করা নিষিদ্ধ করে। এছাড়া অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি ও জার্মানিতেও বিভিন্ন সময় এই দিবস প্রত্যাখ্যাত হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস: ভালোবাসা পবিত্র জিনিস, যা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে আমরা পেয়েছি। ভালোবাসা শব্দটি ইতিবাচক আর আল্লাহ তায়ালা সকল ইতিবাচক কর্ম-সম্পাদনকারীকে ভালবাসেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন- “এবং স্বহস্তে নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না। তোমরা সৎকর্ম করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুহসিনদের ভালবাসেন।” (সূরা আল-বাকারা: ১৯৫) ভুলের পর ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং পবিত্রতা অবলম্বন করা এ দু’টিই ইতিবাচক কর্ম। তাই আল্লাহ তওবাকারী ও পবিত্রতা অবলম্বনকারীদেরকে ভালোবাসেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন- “নিশ্চয় আল্লাহ তওবাকারী ও পবিত্রতা অবলম্বনকারীদেরকে ভালোবাসেন।” (সূরা আল বাকারা: ২২২) তাকওয়া সকল কল্যাণের মূল। তাই আল্লাহ মুত্তাকিদেরকে খুবই ভালোবাসেন। তিনি বলেন- “আর নিশ্চয় আল্লাহ মুত্তাকিদেরকে ভালোবাসেন।” (সূরা আল-ইমরান: ৭৬) পবিত্র এ ভালোবাসার সাথে অপবিত্র ও নেতিবাচক কোন কিছুর সংমিশ্রণ হলে তা আর ভালোবাসা থাকে না, পবিত্রও থাকে না বরং তা হয়ে যায় ছলনা ও শঠতা স্বার্থপরতা। ভালোবাসা হৃদয়ে লুকিয়ে থাকা এক অদৃশ্য সুতার টান। কোনদিন কাউকে না দেখেও যে ভালোবাসা হয় এবং ভালবাসার গভীর টানে রুহের গতির একদিনের দূরত্ব পেরিয়েও যে দুই মুমিনের সাক্ষাৎ হতে পারে তাই ইবনে আব্বাস (রা:)-এর বর্ণনা থেকে আমরা পাই। তিনি বলেন- “কত নেয়ামতের না-শুকরি করা হয়, কত আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা হয়, কিন্তু অন্তরসমূহের ঘনিষ্ঠতার মতো শক্তিশালী কোনকিছু আমি কখনো দেখিনি।” (ইমাম বুখারী, আল আদাবুল মুফরাদ: হাদীস নং ২৬২) ভালোবাসার মানদন্ড: কাউকে ভালোবাসা এবং কারো সাথে শত্রুতা রাখার মানদন্ড একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি। শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কাউকে ভালোবাসতে হবে এবং শত্রুতাও যদি কারো সাথে রাখতে হয় তাও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই। এটাই শ্রেষ্ঠ কর্মপন্থা। রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেন- “নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট শ্রেষ্ঠ আমল হলো কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাউকে ভালোবাসা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কারো সাথে শত্রুতা রাখা।” (আহমেদ, মুসনাদুল আনসার হাদিস নং ২০৩৪) পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা বৃদ্ধি করার উপায়: ইসলাম বলে- পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য স্থাপিত না হলে পরিপূর্ণ ঈমানদার হওয়া যায় না, শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করা যায় না, এমনকি জান্নাতও লাভ করা যাবে না। তাই রাসূলুল্লাহ (সা:) পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা বৃদ্ধির জন্য একটি চমৎকার পন্থা বলে দিয়েছেন। তিনি বলেন- “তোমরা বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার না হবে, তোমরা ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করবে।” আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি বিষয়ের কথা বলব না যা করলে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা-সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠিত হবে? সাহাবীগণ বললেন নিশ্চয় ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা:)। তিনি বলেন, “তোমাদের মধ্যে বহুল পরিমাণে সালাম প্রচলন কর।” আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ভালোবাসার ফজিলত: আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের মহত্ত্বের নিমিত্তে যারা পরস্পর ভালোবাসার সম্পর্ক স্থাপন করে কিয়ামতের দিন তাদেরকে তিনি তাঁর রহমতের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন। রাসূল (সা:) বলেন- “কেয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা বলবেন আমার মহত্ত্বের নিমিত্তে পরস্পর ভালোবাসার সম্পর্ক স্থাপনকারীরা কোথায়? আজ আমি তাদেরকে আমার বিশেষ ছায়ায় আশ্রয় দান করব। আজ এমন দিন যেদিন আমার ছায়া ব্যতীত অন্য কোন ছায়া নেই।” (মুসলিম, কিতাবুল বিররি ওয়াস্-সিলাহ, হাদীস নং ৪৬৫৫) বিশ্ব ভালোবাসা দিবস পালনের ক্ষতিকর কিছু দিক: ১) ভালোবাসা নামের এই শব্দটির সাথে এক চরিত্রহীন লম্পটের স্মৃতি জড়িয়ে যারা ভালোবাসার জয়গান গেয়ে চলেছেন, পৃথিবীবাসীকে তারা সোনার পেয়ালায় করে নীল বিষ পান করিয়ে বেড়াচ্ছেন। ২) তরুণ-তরুণীদের সস্তা যৌন আবেগকে সুঁড়সুঁড়ি দিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা ও ফাসাদ সৃষ্টি করা হচ্ছে। অথচ আল্লাহ তা’আলা ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের ভালোবাসেন না। আল্লাহ তা’আলা বলেন- “আর তারা তো পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি কওে বেড়ায় আর আল্লাহ ফাসাদ সৃষ্টিকারীদেরকে ভালোবাসেন না।” (সূরা আল-মায়েদাহ: ৬৪) ৩) নৈতিক অবক্ষয় দাবানলের মত ছড়িয়ে যাচ্ছে। ৪) নির্লজ্জতা ও বেহায়াপনা জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি লাভ করছে। যারা সমাজে এ ধরনের অশ্লীলতার বিস্তার ঘটায়, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা বলেন, “যারা মু’মিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে তাদের জন্য আছে দুনিয়া ও আখেরাতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (সূরা আন-নূর:১৯) বস্তুত যে সমাজে চরিত্রহীনতার কাজ ব্যাপক, সেখানে আল্লাহর নিকট থেকে কঠিন আজাবসমূহ ক্রমাগত অবতীর্ণ হওয়া অবধারিত। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা:) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন- “যে জনগোষ্ঠীর মধ্যে নির্লজ্জতা প্রকাশমান, পরে তারা তারই ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করে, যার অনিবার্য পরিণতি স্বরূপ মহামারী, সংক্রামক রোগ এবং ক্ষুধা-দুর্ভিক্ষ এতই প্রকট হয়ে দেখা দেবে যা তাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে কখনো দেখা যায়নি।” (ইবনে মাজাহ, কিতাবুল ফিতান, হাদিস নং ৪০০৯) প্রথমেই ‘ভ্যালেন্টাইনস্-ডে’র একটি বাস্তব বিশ্লেষণ করি- “বলুন তো পশ্চিমারা বিবাহ করার পরও অন্য পুরুষ এবং মহিলাদের সাথে সম্পর্ক করে কিনা (যদিও আমাদের সমাজে এমন কিছু লোক আছে)?” আপনি হয়ত উত্তর দেবেন, “এটাতো তাদের কাছে মামুলি একটা ব্যাপার” তাদের কাছে এটাই কালচার। তাই নয় কী? এখন তারা যদি চিন্তা করে যে, সারা বছর তো অন্য মেয়ে বা পুরুষকেই দিয়েছি আজকের এই একটা দিন আমরা স্ত্রী বা স্বামীকে দেই। এটা শুনলে কি আপনি অবাক হবেন?? হ্যাঁ এগুলোই তারা করছে। আমাদের সমাজও সেদিকেই পা বাড়াচ্ছে। যেভাবে আজকে মেয়েরা জিন্স আর ছেলেরা কানের দুল পরছে তা একসময় ছিল না। একজন মুসলিম মূলত তিনটি কারণে ‘ভ্যালেন্টাইনস্-ডে’ পালন করবে না- প্রথমত: ইসলামে নব আবিষ্কৃত যেকোন উৎসবই প্রত্যাখ্যাত। আয়েশা (রা:) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন- “দ্বীন ইসলামে নতুন কিছু প্রবর্তন করলে, তা প্রত্যাখ্যান করা হবে (বুখারী ও মুসলিম)”। দ্বিতীয়ত: একজন মুসলিম বিবাহ বহির্ভূত কোন প্রেম ভালোবাসার সম্পর্ক রাখতে পারেনা। আর বিবাহিতদের ক্ষেত্রে একজন স্বামী তার স্ত্রীকে এবং স্ত্রী তার স্বামীকে বছরের এক দিন ঘটা করে ভালোবাসবে, অন্যান্য দিন উদাসীন থাকবে এমনটি হতে পারেনা। তৃতীয়ত: আমরা ইসলামের এই মূলনীতি সবসময় মনে রাখব যে, “যে সম্প্রদায়ের অনুকরণ করবে সে তাদের অন্তর্ভূক্ত (আহমাদ, আবু দাউদ)।” বাংলাদেশের মুসলমান কোটি মানুষের প্রতি আকুল আবেদন জানাই- এই দিবস আমাদের জন্য নয়, এদিবস কাফের-মুশরিকদের দিবস। আমাদের ঈমানে প্যারালাইসিস হয়েছে তাই এমন জঘন্য দিবস পালনেও আমাদের বিবেকে বাঁধে না। বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের মানে এ নয় যে, তা জমা করে ১৪ই ফেব্রুয়ারি পালন করতে হবে। আমরা মানুষকে ভালোবাসবো প্রতিটি ক্ষণে, প্রতিদিন, প্রতিটি কাজে। পশুবৃত্তি একদিনের ভালোবাসা হাজার দিনের ভালোবাসাকে অপমান করার শামিল। তাই কোন পশুবৃত্তি নয়, কোন বেহায়াপনা নয়। আমাদের আশেপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আদর-অনাদরে পড়ে থাকা মানুষগুলোর কথা ভাবার বড়ই প্রয়োজন। কারণ মানুষ “আশরাফুল মাখলুকাত”। বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের নামের এসব ঈমান বিধ্বংসী কর্মকান্ড হতে আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে হেফাজত করুন। -আমিন!! লেখক: বিশিষ্ট সাংবাদিক ও গবেষক

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন