চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন

আবারও ভুতুড়ে কাণ্ড ভোট নিয়ে

প্রকাশিত: ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ১২:১৫:৩৫

আবারও ভুতুড়ে কাণ্ড ভোট নিয়ে

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিলের নির্বাচনের পর প্রথম আলোয় (১১ জুন ২০১৫) ‘ভোট নিয়ে ভুতুড়ে কাণ্ড’ শিরোনামে আমি একটি উপসম্পাদকীয় লিখেছিলাম। রকিবউদ্দীন কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী আ জ ম নাছিরের বিরুদ্ধে কেন্দ্র দখল করে সিল মেরে জয়ী হওয়ার অভিযোগ ওঠে। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করে আমরা তখন দেখিয়েছিলাম, যেসব কেন্দ্রে ভোট দেওয়ার হার ছিল ৪৩ শতাংশ ও তার কম, সেসব কেন্দ্রে বিএনপির প্রার্থী মনজুর আলম জয়ী হয়েছিলেন; পক্ষান্তরে ৪৩ শতাংশের বেশি ভোট পড়া সব কেন্দ্রে নাছির জিতেছিলেন। নাছিরের এ জয়ের কারণ ছিল মূলত কেন্দ্র দখল করে জাল ভোট দেওয়া। নির্বাচনে জাল ভোট দেওয়া এমন বিশৃঙ্খল ছিল যে কোনো কোনো কেন্দ্রে বৈধ ভোটের তুলনায় বাতিল ভোটের পরিমাণ ছিল বেশি। প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল পেপার ব্যালটে এবং ওই নির্বাচনে মনজুর আলম কেন্দ্র দখলের অভিযোগে দুপুরের মধ্যেই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেও নাছিরের ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৩৬১ (৫৭.৮৭%) ভোটের বিপরীতে তিনি পেয়েছিলেন ৩ লাখ ৪ হাজার ৮৩৭ (৩৭.১১%) ভোট।

স্মরণ করা যেতে পারে, পেপার ব্যালটে ভোট হলে কেন্দ্র দখল করে জাল ভোট দেওয়া ও আগের রাতে বাক্স ভর্তি করার সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে বর্তমান নির্বাচন কমিশন সব বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের আপত্তি উপেক্ষা করে ২০১৮ সালে ৩ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা ব্যয় করে ইভিএম কেনে। ইভিএমের পক্ষে আরও যুক্তি দেখানো হয় যে এর মাধ্যমে নির্বাচনী ব্যয় সাশ্রয় হবে (যদিও তা হয়নি) এবং দ্রুত নির্বাচনী ফলাফল পাওয়া যাবে। বর্তমান কমিশন ইভিএম কেনার ব্যাপারে এত অতি উৎসাহী ছিল যে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প অনুমোদনের এবং প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের আগেই কমিশন ইভিএমের ক্রয়াদেশ দেয়।

সাম্প্রতিক চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ইভিএমে এবং এতে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরীর ৩ লাখ ৬৯ হাজার ২৪৮ ভোটের বিপরীতে বিএনপির মনোনীত শাহাদাত হোসেন ৫২ হাজার ৪৮৯ ভোট পান। এ নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থী ছাড়া অন্য ছয়জন প্রার্থীই তাঁদের জামানত হারিয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, এতেও ভয়াবহ ভুতুড়ে কাণ্ড ঘটেছে, যার মূল কারণ হলো ইভিএমের ব্যবহার।

আন্তর্জাতিক কারিগরি প্রতিষ্ঠান ‘ভেরিফায়েড ভোটিং ফাউন্ডেশন’-এর মতে, নির্বাচন–পরবর্তীকালে ভোটের ফলাফল নিরীক্ষার সুযোগ রাখার জন্য ইভিএমে ‘ভোটার ভেরিফায়েবল পেপার অডিট ট্রেইল’ (ভিভিপিএটি) বা ভোটের একটি কাগুজে রেকর্ড রাখা অপরিহার্য। ফাউন্ডেশনের মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা ছাড়া ইভিএমকে এখন ‘সার্টিফাই’ করা হয় না। অথচ ভোট গ্রহণের প্রক্রিয়াকে ত্রুটিমুক্ত করার কথা আমাদের সিইসি বারবার বললেও ভোট গ্রহণ-গণনার প্রক্রিয়াকে যথাসম্ভব ত্রুটিমুক্ত ও স্বচ্ছ রাখার জন্য উন্নত দেশগুলোয় ব্যবহৃত ভিভিপিএটি ব্যবহারে কমিশনের প্রচণ্ড অনীহা লক্ষণীয়। এ অনীহার কারণেই ইভিএম-সম্পর্কিত কারিগরি উপদেষ্টা কমিটি ভিভিপিএটি সংযুক্ত করার পরামর্শ দিলেও কমিশন তা অগ্রাহ্য করে, যার ফলে কমিটির প্রধান অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী সংশ্লিষ্ট সুপারিশে স্বাক্ষর করেননি। অর্থাৎ আমাদের ব্যবহৃত ইভিএম কেনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডই শুধু উপেক্ষা করা হয়নি, আমাদের দেশীয় বিশেষজ্ঞের পরামর্শও অগ্রাহ্য করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতির কাছে ৪২ জন নাগরিকের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৩ ডিসেম্বর গণমাধ্যমের সামনে সিইসি এক লিখিত বক্তব্যে জানান, ইভিএমে ভিভিপিএটি যুক্ত করলে ‘পুরো ইভিএম সিস্টেম বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা থাকে বিধায়’ ইভিএমে ভিভিপিএটির আধুনিক সংস্করণ ভোটার যাচাইযোগ্য ডিজিটাল অডিট ট্রেইল (ভিভিডিএটি) সংযুক্ত রয়েছে। ডিজিটাল অডিট ট্রেইলে ভোটের তথ্য ইলেকট্রনিক্যালি ইভিএমের মেমোরিতে সংরক্ষিত থাকে, যা পরবর্তী সময়ে বিধি মোতাবেক পুনর্গণনা করা যায় বলে সিইসি দাবি করেছেন। ভিভিপিএটি সংযুক্ত করলে আমাদের ব্যবহৃত ইভিএম যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে এটি নিঃসন্দেহে কারিগরি দিক থেকে ত্রুটিপূর্ণ, কারণ অন্যান্য দেশে ব্যবহৃত ইভিএমে ভিভিপিএটি যুক্ত রয়েছে।

ইভিএমে পেপার ট্রেইল ব্যবহার করার মূল কারণ হলো ভোটের একটি প্রিন্ট কপি সংরক্ষণ করা, যাতে ভোটের ফলাফলের বিশ্বাসযোগ্যতা তথা ইভিএমের কারিগরি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠলে প্রিন্ট কপি গণনা করে তা নিরীক্ষা করা যায়।

এ প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন, ইভিএমে পেপার ট্রেইল ব্যবহার করার মূল কারণ হলো ভোটের একটি প্রিন্ট কপি সংরক্ষণ করা, যাতে ভোটের ফলাফলের বিশ্বাসযোগ্যতা তথা ইভিএমের কারিগরি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠলে প্রিন্ট কপি গণনা করে তা নিরীক্ষা করা যায়। শুধু ডিজিটাল রেকর্ড রাখলে ভোটের ফলাফল নিয়ে ডিজিটাল টেম্পারিং করার একটা সুযোগ থেকে যায়। এ থেকে প্রতিকারের উদ্দেশ্যেই সর্বজনস্বীকৃত ভিভিপিএটি, যা ব্যবহারে কমিশনের অনীহা কোনোভাবেই বোধগম্য নয়। বস্তুত, এমন অনীহা কমিশনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দেহের উদ্রেক না করে পারে না। ইভিএমের মাধ্যমে গৃহীত ভোটের ফলাফলের বিশ্বাসযোগ্যতার সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তাদের ব্যবহৃত ইভিএমে পেপার ট্রেইল যুক্ত করা হয়েছে এবং তাদের ইভিএমের তুলনায় আমাদের ইভিএমের মূল্য ১১ গুণ বেশি।

উল্লেখ্য, ইভিএমের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে কমিশনের হাতে এবং কমিশন ইচ্ছা করলে ডিজিটাল টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে ভোটের ফলাফল বদলিয়ে দিতে পারে, যা নিরসনের লক্ষ্যেই ভিভিপিএটি। পেপার অডিট ট্রেইলের অনুপস্থিতিতে ইভিএম দিয়ে জালিয়াতি হলে তার বিহিত করার কোনো সুযোগ থাকে না। তাই পেপার ট্রেইলবিহীন ইভিএমে বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে মূলত নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর; কিন্তু চরম পক্ষপাতদুষ্টতা, নির্বাচন নিয়ে অতীতের জালিয়াতি এবং আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগের কারণে আমাদের বর্তমান কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা এখন শূন্যের কোঠায়।

সাম্প্রতিক চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে ভুতুড়ে কাণ্ড ঘটেছে মূলত এতে ব্যবহৃত ইভিএমে ভিভিপিএটি না থাকা এবং নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতার অভাবের কারণে। এ নির্বাচনে অন্তত দুবার ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। প্রথমবার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে ভোট শেষ হওয়ার ১০ ঘণ্টা পরে রাত দুইটায়, যা নিয়ে অনেক প্রশ্ন ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। এ ফলাফলে দেখানো হয় যে ৭৩৩টি কেন্দ্রের মধ্যে বিএনপি-মনোনীত শাহাদাত হোসেন ২২টি কেন্দ্রে শূন্য ভোট পেয়েছেন। এ ছাড়া তিনি ১ থেকে ১০ ভোট পেয়েছেন ১৮৪টি কেন্দ্রে এবং তাঁর ভোটের শেয়ার মাত্র ১২ শতাংশ, যা সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক। পরদিন ২৯ জানুয়ারি রিটার্নিং কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত যে ফলাফল ঘোষণা করা হয়, তাতে দেখানো হয় যে তিনি মাত্র দুটি কেন্দ্রে শূন্য ভোট পেয়েছেন, যদিও তাতে ১০৮টি কেন্দ্রের ফলাফল ছিল না। পরবর্তী সময়ে ‘প্রথম আলোর পক্ষ থেকে ওই ১০৮টি কেন্দ্রসহ ৭৩৩টি কেন্দ্রের একীভূত ফল সংগ্রহ করে দেখা যায়, ধানের শীষ তিনটি কেন্দ্রে শূন্য ভোট পায়’ (৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১)।

দুবার ফলাফল ঘোষণা এবং এর মধ্যে পার্থক্য চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে বিভিন্ন মহল থেকে ডিজিটাল জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগের প্রতি সমর্থন জুগিয়েছে যেসব কেন্দ্রে ৭০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে, সেসব কেন্দ্রের ফলাফলের ইভিএমের মুদ্রণ কপি না পাওয়ার কারণে। যেসব কেন্দ্রে অস্বাভাবিক বেশি হারে ভোট পড়েছে, সেসব কেন্দ্রে ইভিএমের মুদ্রণ অনুলিপির পরিবর্তে প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা ভোটের ফলাফল কাগজে লিখে স্বাক্ষর করে জমা দিয়েছেন। ‘এসব কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা চাপের মুখে বেশি ভোট দেখাতে বাধ্য হন বলে অভিযোগ উঠেছে’ (প্রথম আলো, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১)। অভিযোগ উঠেছে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফলাফল বদলিয়ে দিতে অর্থ দাবিরও।

দুবার ফলাফল প্রকাশ, বিধি মোতাবেক ইভিএমের মুদ্রণ অনুলিপি প্রদানে ব্যর্থতা এবং ফলাফলের পার্থক্য ও অস্বাভাবিকতা ইভিএম ব্যবহারসংক্রান্ত জালিয়াতির অভিযোগকেই জোরালো করে। তা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে চট্টগ্রামে সুষ্ঠু ভোট হয়েছে বলে দাবি করা হয় এবং এসব গুরুতর অভিযোগের কোনো রূপ তদন্ত না করেই গেজেট প্রকাশ করা হয়। ফলে নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি ইভিএমের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট রয়েই গেল।

● ড. বদিউল আলম মজুমদার সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)

প্রজন্মনিউজ২৪/নাজমুল

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন