১৭০০ কোটি টাকার অবকাঠামো উন্নয়ন দৃশ্যমান নয়

প্রকাশিত: ১০ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ১২:৫১:৫৭

১৭০০ কোটি টাকার অবকাঠামো উন্নয়ন দৃশ্যমান নয়

নগরবাসীর প্রশান্তির জন্য পার্ক তৈরি থেকে শুরু করে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন পর্যন্ত নানা অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ বাস্তবায়ন করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। ‘ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন (দ্বিতীয় সংশোধিত)’ শীর্ষক এক প্রকল্পের অধীনে এসব কাজ করা হচ্ছে। প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয় ২০১৬ সালে সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনের আমলে। এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা চলতি বছরের জুনে। যদিও প্রকল্পের অধীন অনেক কাজ এখনো অর্ধেকও এগোয়নি। সংশ্লিষ্ট নানা পক্ষের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন দীর্ঘায়িত হয়ে উঠেছে বলে পর্যবেক্ষণ সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি)। অন্যদিকে প্রকল্পের আওতায় যেসব এলাকায় কাজগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে সেখানকার স্থানীয়রা বলছেন, এসব কাজের ক্ষেত্রে স্থানীয়দের সুযোগ-সুবিধার কথা বিবেচনায় আনা হয়নি একেবারেই। ফলে একদিকে যেমন নগরবাসীর দুর্ভোগ বেড়েছে, তেমনি স্থানে স্থানে বেড়েছে দুর্ঘটনার শঙ্কাও।

রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম সড়ক ধানমন্ডি ২৭ নম্বর। এখানকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়নের কাজ করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। বসানো হচ্ছে বড় ব্যাসের পাইপ। এজন্য রাস্তা খুঁড়ে রাখা হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। এলাকাবাসীর সুবিধা-অসুবিধাকে বিবেচনায় না নিয়েই কাজটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তারা বলছেন, এ কাজ কবে শেষ হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। যদিও এলাকাবাসীকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নিয়মিতভাবে। দৈনন্দিন জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে ধুলায়। চলাফেরাও করতে হচ্ছে দুর্ঘটনার আতঙ্ক নিয়ে। এ সড়ক দিয়ে অনেক ভিআইপি নিয়মিত যাতায়াত করেন, কিন্তু তার পরও এখানকার কাজে যত্নের ছাপ প্রায় অনুপস্থিত। সিটি করপোরেশনের তদারকি ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত দুর্বল।

ডিএসসিসির অবকাঠামো আধুনিকায়নে নেয়া প্রকল্পটিতে মোট বরাদ্দ ১ হাজার ৭১৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। উন্নত নাগরিক সেবা দেয়ার তাগিদে গৃহীত প্রকল্পটির প্রধান কার্যক্রমগুলোর মধ্যে রয়েছে সড়ক ও ফুটপাত উন্নয়ন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, এলইডি লাইট স্থাপন, ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণ ও উন্নয়ন, বাস স্টপেজ/যাত্রী ছাউনি/পুলিশ বক্স ও মিডিয়ানের সৌন্দর্যবর্ধন, পাবলিক টয়লেট নির্মাণ ও উন্নয়ন, পার্ক ও খেলার মাঠ উন্নয়ন, ধানমন্ডি লেক সংস্কার, আধুনিক কসাইখানা নির্মাণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সেকেন্ডারি ট্রান্সফরমার স্টেশন স্থাপন, কবরস্থান উন্নয়ন, হাসপাতাল উন্নয়ন, নগরীর পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ ও নগর ভবন সংস্কার।

প্রকল্পটি সম্পর্কে আইএমইডির মূল্যায়ন, প্রকল্পে এরই মধ্যে শেষ হওয়া কাজগুলো সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ ও পর্যবেক্ষণের কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। বিভিন্ন সেবা সংস্থার সঙ্গে ডিএসসিসির কাজের সমন্বয়ের অভাবে দেখা যায়, একটি রাস্তা ঠিক করার কিছুদিনের মধ্যেই অন্য সংস্থা রাস্তাটি খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করে। ফলে জনগণের ভোগান্তির কোনো অন্ত থাকে না। এছাড়া ডিএসসিসির আঞ্চলিক কার্যালয়ে জনবলের তুলনায় কাজের চাপ অনেক বেশি। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে জনবলের ঘাটতিও প্রকট। একই সঙ্গে এলাকাভিত্তিক সম্পন্ন হওয়া কাজ সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ ও পর্যবেক্ষণের জন্য এখনো কোনো কমিটি গঠন করা হয়নি।

তবে এর পরও সময়মতো প্রকল্পের কাজ শেষ করা নিয়ে আশাবাদী ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অতিরিক্ত সচিব এবিএম আমিন উল্লাহ নুরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, প্রকল্পে আমাদের তদারকি আছে, যার ধারাবাহিকতায় আমাদের সব অবকাঠামো উন্নয়নকাজ প্রতি সপ্তাহে মূল্যায়ন করা হয়। যেখানে কাজ থেমে আছে বা গতি কম, সেখানেই গতি বৃদ্ধির চেষ্টাও চলমান আছে। অর্থাৎ আমাদের উদ্যোগ আছে। আশা করছি সময়মতো প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পারব।

ঢাকা দক্ষিণে বিভিন্ন রাস্তা, ফুটপাত ও সংলগ্ন ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে গত পাঁচ বছরে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে প্রায় ২৭০ কোটি টাকা। এতে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে সামান্যই। বিশেষ করে পুরান ঢাকা ও আশপাশের এলাকাগুলোর অধিকাংশ সড়কই এখনো খানাখন্দে ভরা। এর মধ্যে জুরাইন, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, ডেমরা, গেন্ডারিয়ার রাস্তা সবচেয়ে বেশি খারাপ। এসব এলাকায় প্রতিনিয়তই কোনো না কোনো দুর্ঘটনা ঘটছে।

শনির আখড়ার একটি কালভার্ট ভেঙে পড়েছে তিন বছর আগে, যা এখনো সংস্কার করা হয়নি। এ ভাঙা কালভার্টে সংঘটিত দুর্ঘটনার ফলে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও অনেক। বাংলাবাজার, সুত্রাপুরসহ কয়েকটি এলাকায় গত বছর সড়কের সংস্কার করা হয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা মোটেও উল্লেখযোগ্য নয়।

ডিএসসিসির ড্রেনেজের অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুমে তীব্র জলাবদ্ধতার শিকার হয় সাধারণ জনগণ। গুলিস্তান, পল্টন, লালবাগ, হাজারীবাগ, সায়েদাবাদ, ওয়ারী, গেন্ডারিয়া, সুত্রাপুরসহ অধিকাংশ এলাকায় নিয়মিত ড্রেনেজ পরিষ্কার না করার ফলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় জনগণকে। যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, ডেমরাসহ রাজধানীর প্রায় সব খালই আবর্জনার কারণে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে অনেক এলাকায় ড্রেনেজের অব্যবস্থাপনার কারণে প্রায় সারা বছরই জলাবদ্ধতা থাকে।

প্রসঙ্গত, ‘ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন’ শীর্ষক মূল অনুমোদিত প্রকল্পটি ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা ছিল। কিন্তু পরে প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে এক বছর বাড়িয়ে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ করা হয়। এতেও কাজ শেষ না হওয়ায় দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে দুই বছর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। প্রথমে প্রকল্পটির মূল ব্যয় ছিল ১ হাজার ২০২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এরপর দুই দফা সংশোধনীর পর মোট ব্যয় দাঁড়ায় ১ হাজার ৭১৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকায়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ৯৫ শতাংশের জোগান আসছে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে। বাকি ৫ শতাংশে ব্যয় হচ্ছে ডিএসসিসির নিজস্ব তহবিলের অর্থ।

দুবার মেয়াদ বাড়ানোর পরেও প্রকল্পের অনেক কাজেরই অগ্রগতি এখনো খুবই ধীর। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ডিএসসিসির আওতাধীন পান্থকুঞ্জ পার্কের আধুনিকায়ন কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে। ওই সময় থেকে জনসাধারণের জন্য পার্কটি বন্ধ। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও গত জুন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি মাত্র ১৫ শতাংশ। উপরন্তু মেট্রোরেল প্রকল্পের কারণে পরিবর্তন পার্কটির নকশায় আনতে হচ্ছে। ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় মেট্রোরেলের কাজ শেষ হওয়া অবধি আধুনিকায়নের কাজ বন্ধই রাখতে হচ্ছে। প্রকল্পের অধীন বেশির ভাগ পার্ক ও খেলার মাঠেরই এখন এ দশা। যদিও এসব পার্ক ও খেলার মাঠ আধুনিকায়ন করতে গিয়ে গত পাঁচ বছরে বরাদ্দ হয়েছে প্রায় ৪৫৩ কোটি টাকা, যা ডিএসসিসির বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নে চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ব্যয়ের খাত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংশ্লিষ্টরা যদি বার্ষিক বা আরো দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে, সেগুলোর জন্যও পরিকল্পনামাফিক সময় বরাদ্দ থাকে। পাশাপাশি এর অর্থ বরাদ্দ, কর্মপন্থা, কর্মপদ্ধতি, কর্মসূচি এগুলো সবই নির্ধারিত থাকে। সে কর্মসূচি ও পদ্ধতি অনুযায়ী কাজ এগোনোর আশা থাকলেও অনেক সময় কাজ ধীর হয়ে যায় বা নির্ধারিত সময় থেকে পিছিয়ে যায়। ১২ মাসের কাজ ১২ মাসে যদি পুরোপুরি শেষ না হয়, তাহলে হয়তো ৭৫ বা ৮০ শতাংশ হবে। কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই অগ্রগতি ৬০ শতাংশেরও নিচে থাকে। এ ধরনের ক্ষেত্রে এটা স্পষ্ট, প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ এগোয়নি।

এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ প্রফেসর নজরুল ইসলাম বলেন, ঢাকাকে ঘিরে প্রতিটি উন্নয়নকাজের সময় দীর্ঘায়িত করা হয়। সময় দীর্ঘ করা মানেই হলো আর্থিক ব্যয়ও বৃদ্ধি হওয়া। কাজ যতটুকুই হোক, তা মানসম্পন্ন হচ্ছে কিনা, কাজটি পুনরায় আবার করতে হয় কিনা, ছয় মাস পরেই ভাঙতে হয় কিনা এগুলো খেয়াল রাখাটাই বেশি প্রয়োজন। অর্থাৎ গুণমান রক্ষা করে, সময় রক্ষা করে, অর্থ বরাদ্দ সঠিক রেখে কাজ করাটাই হলো সুপরিচালন ও সুব্যবস্থার পরিচয়। কিন্তু সার্বিক ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্টদের দুর্বলতার বিষয়টি স্পষ্ট।

প্রজন্মনিউজ২৪/এলএম

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ