করোনা মহামারিতে দারিদ্রের হার বেড়েছে গ্রামে

প্রকাশিত: ২৪ জানুয়ারী, ২০২১ ১১:৪০:৪৯

করোনা মহামারিতে দারিদ্রের হার বেড়েছে গ্রামে

করোনার প্রভাবে দেশে দারিদ্র্য বেড়েছে, এ কথা এত দিন নানাভাবে বলা হয়েছে। এবার সানেমের নিজস্ব জরিপে জানা গেল, করোনার প্রভাবে দেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার (আপার পোভার্টি রেট) বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশ। দেশব্যাপী খানাপর্যায়ের জরিপের ভিত্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। নিজেদের অর্থায়নে এ জরিপ পরিচালনা করেছে সানেম। শুধু ভোগ নয়, শিক্ষা ও চিকিৎসা দারিদ্র্যও নিরূপণ করা হয়েছে জরিপে।

বিবিএসের খানা জরিপ অনুসারে, ২০১৬ সালে দেশের গ্রামাঞ্চলের সার্বিক দারিদ্র্য ছিল ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ, ২০১৮ সালের জিইডি-সানেম জরিপ অনুসারে যা ছিল ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু করোনার প্রভাবে ২০২০ সালে এ হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক ৩ শতাংশ। শহরাঞ্চলে সার্বিক দারিদ্র্যের হার ২০১৬ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০১৮ সালে ছিল ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ আর করোনার সময়ে ২০২০ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ করোনার কারণে শহরের চেয়ে গ্রামে দারিদ্র অনেক বেশি বেড়েছে।

‘দারিদ্র্য ও জীবিকার ওপর কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব’ শীর্ষক এক ভার্চ্যুয়াল অনুষ্ঠানে গতকাল এ জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

দারিদ্র্যের আরেকটি ফল হলো শিক্ষা গ্রহণ ব্যাহত হওয়া। জরিপে দেখা গেছে, ২০১৮ এবং ২০২০ সালের মধ্যে মাথাপিছু গড় শিক্ষাব্যয় কমেছে। অতি দরিদ্র পরিবারের জন্য এ হার হ্রাস সবচেয়ে বেশি, ৫৮ শতাংশ। পাশাপাশি অনলাইন শিক্ষায় দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণও কম। অন্যদিকে, গড় মাথাপিছু স্বাস্থ্যব্যয় বেড়েছে। মধ্যম ও অদরিদ্রদের ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে বেশি-যথাক্রমে ৯৭ ও ১০৪ শতাংশ।

জরিপের ফলাফল তুলে ধরেন সানেমের গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান। তিনি বলেন, জরিপ পরিচালনার খরচ আছে। তবে তহবিল পাওয়া না গেলেও সানেম নিজস্ব অর্থায়নে জরিপটি পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়। তাঁর ভাষ্যমতে, ‘এটা না হলে আমরা একটি পরিপ্রেক্ষিত হারিয়ে ফেলতাম। সেই তাড়না থেকেই এ জরিপ।’ দারিদ্র্য, অসমতা ও কর্মসংস্থান—এ তিন ক্ষেত্রে কোভিডের প্রভাব নিরূপণ করা হয়েছে বলে জানান সেলিম রায়হান।

জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, কোভিডজনিত দারিদ্র্যের কারণে মানুষ খাদ্যবহির্ভূত ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি অনেকে সঞ্চয় ভেঙে খেয়েছেন, ঋণ নিয়েছেন এবং খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এনেছেন। আবার জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৭ দশমিক ৫২ শতাংশ পরিবার বলেছে, তারা খাপ খাওয়ানোর পথই খুঁজে পায়নি।

জরিপের ফলাফল নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, দারিদ্র্য পরিমাপ করা হয় সাধারণত ভোগ দিয়ে। কিন্তু দারিদ্র্য যে বহুমুখী ধারণা, যেমন শিক্ষা ও চিকিৎসায়ও এর প্রভাব দেখা যায়, সানেমের জরিপ এই প্রথম এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিচ্ছে। শিক্ষাদারিদ্র্য বেড়েছে, শিক্ষায় ব্যয় কমেছে, বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থায় বেশির ভাগই অংশ নিতে পারছে না, এমনকি বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা আগের শিক্ষাব্যবস্থার তুলনায় কতটা কম কার্যকর, সেটিও জানতে পারলে আরও ভালো হতো বলে মন্তব্য করেন জাহিদ হোসেন।

জাহিদ হোসেন আরও বলেন, পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয়-ব্যয় জরিপে দারিদ্র্য যেভাবে পরিমাপ করা হয়, খাদ্য ও অন্যান্য ভোগের তথ্য যেভাবে আলাদা পদ্ধতিতে সারা বছর ধরে সংগ্রহ করা হয়, সানেমের জরিপে সেই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়নি। সে জন্য তিনি মনে করেন, এ দুই জরিপের তথ্য তুলনা করা ঠিক নয়।

জরিপের আরেকটি উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো, ২০২০ সালে দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের ব্যাপক প্রবৃদ্ধি হলেও ব্যক্তিক পর্যায়ে তা বরং কমে গেছে। কারণ হিসেবে বলা হয়, অনানুষ্ঠানিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবাসী আয় এসেছে। এতে বিনিময় হার কমে গেছে।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন। তিনি বলেন, কোভিডের কারণে শিগগিরই অসমতা থেকে মুক্তির পথ নেই। কোভিডের আগে প্রবৃদ্ধি ছিল কর্মসংস্থানবিহীন, কোভিডের প্রভাবে তাতে আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। যেসব চাকরি গেছে, সেগুলো পুনরুদ্ধার এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে বেশ কয়েক বছর লেগে যাবে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সানেমের গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক সায়েমা হক। এ ছাড়া বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা ও শিক্ষার্থীরাও এতে অংশ নেন। দেশের ৬৪ টি জেলার ৫ হাজার ৫৭৭টি পরিবারের ওপর এই জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে।

প্রজন্মনিউজ২৪/সাইফুল

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন