শিক্ষা খাতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে সরকার

প্রকাশিত: ২০ জানুয়ারী, ২০২১ ১১:২৩:৫২

শিক্ষা খাতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে সরকার

করোনার কারণে সৃষ্ট বৈষম্য দূর করা, বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ এবং সর্বস্তরে আইসিটিনির্ভর শিক্ষা কার্যকর করা ২০২১ সালে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে বলে শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তারা বলছেন, এই তিন সমস্যা সমাধানে হলে আরও তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। সেগুলো হচ্ছে—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের কারণে শিক্ষার্থীদের পাঠন-পাঠনের ক্ষতি পোষানো, ধারাবাহিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা এবং মনো-সামাজিক সমস্যা থেকে বের করে এনে শিক্ষার্থীদের সামাজিকীকরণ করা।

শিক্ষাবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধে পঠন-পাঠনের যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ করা ২০২১ সালে বড় চ্যালেঞ্জ। অনলাইন কার্যক্রমে শিক্ষার্থীরা অংশ নিলেও শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক মূল্যায়ন হয়নি। চেষ্টা করা হচ্ছে অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে সেটা করার। এছাড়া দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে মনো-সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। তাদের সামাজিকীকরণ করা সামনের দিনে বড় চ্যালেঞ্জ। করোনা পরিস্থিতি অনুকূলে আসার পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিলে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিদ্যালয়ে কার্যকর পঠন-পাঠন নিশ্চিত করা খুব সহজ হবে না। এসব চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হবে আমাদের। 

শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বৈষম্য, বাণিজ্যিকীকরণ ও সর্বস্তরে আইসিটি শিক্ষা কার্যকর করা ২০২১ সালে শিক্ষায় বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। এই তিন চ্যালেঞ্জরে মধ্যে রয়েছে আরও তিনটি চ্যালেঞ্জ। এগুলো হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধে পঠন-পাঠনের ক্ষতি, অনলাইন কার্যক্রম অংশ নিলেও শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক মূল্যায়ন হচ্ছে না এবং তৃতীয়টি হচ্ছে মনো-সামাজিক সমস্যা থেকে সামাজিকীকরণ করা।

গণস্বাক্ষরতা অভিযানের উপপরিচালক কে এম এনামুল বলেন, ‘করোনার কারণে ২০২০ সালে শহর ও গ্রামে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। গ্রাম পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বড় অংশ অনলাইন শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেনি। ফলে শহরের শিক্ষার্থীদের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছে গ্রামের শিক্ষার্থীরা। এছাড়া প্রতিবন্ধী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে আমাদের সামনে। এছাড়া ২০২০ সালে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত।’

শিক্ষাবিদরা বলেন, ‘করোনার কারণে শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নিতে অভিভাবকরা কোচিং করানোসহ বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালাবেন। ফলে বিদ্যালয় খুলে দিলেও শিক্ষায় বাণিজ্যিকীকরণ শুর হবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে এতে বৈষম্যের সৃষ্টি হবে। শুধু বাংলাদেশ নয় বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিকীকরণ শুরু হবে।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২১ সালে বিদ্যালয় খুলে দেওয়া হলেও করোনার প্রভাবমুক্ত হতে সময় লাগবে। ফলে আইসিটিভিত্তিক শিক্ষা খুবই জরুরি। কিন্তু ২০২০ সালের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আইসিটি শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনও নাজুক অবস্থায়। করোনার কারণে আইসিটিভিত্তিক শিক্ষা শুরু করেছে বাংলাদেশ। কেন্দ্রীয়ভাবে আইসিটি শিক্ষা ব্যবস্থা চালু নেই দেশে। বিচ্ছিন্নভাবে অনলাইনে যে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে তা সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবে না। ফলে আইসিটি শিক্ষায় ২০২১ সালে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

সমস্যা সমাধানে যে সব সুপারিশ করেছেন শিক্ষাবিদরা তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে শিক্ষকদের আইসিটি বিষয়ে অভিজ্ঞ করে তোলা। শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই দেওয়া হয়। বিনামূল্যে বা স্বল্প মূল্যে বিভিন্ন ডিভাইস দিয়ে অনলাইন ক্লাসে সব শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। শেখ রাসেল আইসিটি ল্যাব কার্যকর করতে হবে। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কী হবে তা ঠিক করতে হবে। উপজেলাভিত্তিক শিক্ষা পরিকল্পনা প্রস্তুত করতে হবে। করোনার কারণে শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে সেকেন্ড চান্স এডুকেশনের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

২০২০ সালে করোনার বন্ধের সময় শিক্ষকদের আইসিটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার একটা সুযোগ ছিল। সেটি যতটা সম্ভব দ্রুত করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আইসিটিভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন জোরদার মনিটরিং। শুধু শিক্ষা প্রশাসন নয়, স্থানীয় সরকার বিভাগকেও কাজে লাগানো যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

বিদ্যালয় খোলা গেলেও শিক্ষার্থীদের অনলাইন ও অফলাইন দুভাবেই সমান গুরুত্ব দিয়ে পাঠ কার্যক্রম চালাতে হবে। ব্লান্ডেড ও ফ্লিপড লার্নিংয়ের পরিকল্পনা আগেই প্রস্তুত করতে হবে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।

এক্ষেত্রে অনলাইন ও অফলাইনের মিশ্র ব্যবস্থা কেমন হবে তা নির্ধারণ করতে হবে। বিগত যে কোনও সময়ের চেয়ে শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হবে। অভিভাবকদেরও সচেতনভাবে সহযোগিতা করতে হবে শিক্ষার্থীদের পাঠ কার্যক্রমে।

এ সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ২০২০ সালের করোনার কারণে বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় অনলাইন ক্লাস নেওয়া, ভিডিও ক্লাস ওয়েবসাইটে আপলোড করা, সংসদ টেলিভিশনে সারাবছর ভিডিও ক্লাস পরিচালনা করা হবে। শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নে অ্যাসাইনমেন্ট ব্যবস্থা চলবে সারাবছর। ফেব্রুয়ারিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা গেলে শিক্ষার্থীদের পর্যায়ক্রমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান করানো হবে। স্বাস্থ্য অধিদফতর ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী বিদ্যালয় পরিচালনা করা হবে।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষার্থীদের শিফট করে বিদ্যালয়ে পাঠদান করানো হবে। বিদ্যালয় খোলা সম্ভব হলেও অনলাইন ক্লাস অব্যাহত থাকবে। একইসঙ্গে অ্যাসাইনমেন্টের ব্যবস্থাও রাখা হবে সারাবছর। দেরিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হলে সংক্ষিপ্ত সিলেবাস করে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করানো হবে। ২০২০ সালের ঘাটতি পূরণে কাজ করবেন শিক্ষকরা।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেন, ‘অনলাইন ক্লাস, সংসদ টেলিভিশনে ক্লাস অব্যাহত থাকবে। অ্যাসাইনমেন্ট ব্যবস্থা চালু রাখা হবে। ফেব্রুয়ারিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা গেলে সমস্যা কাটিয়ে উঠা সম্ভব। শিক্ষায় বাণিজ্যিকীকরণ অন্য সময়গুলোর চেয়ে বাড়ার সুযোগ নেই। অনলাইনে ভিডিও ক্লাস থাকতে, ফলে কোচিং করার প্রয়োজন হবে না। শিক্ষার্থীরা ভিডিও ক্লাস বার বার দেখে সেখান থেকে তাদের সমস্যার সমাধান করতে হবে। তবে শিক্ষক ও অভিভাবকদের এসব বিষয়ে খুবই যত্নশীল থাকতে হবে। আমরা যেকোনও সময়ের চেয়ে মনিটরিংয়ে গুরুত্ব দিচ্ছি ২০২১ সালের শিক্ষা কার্যক্রমে। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সরকার সচেষ্ট থাকবে।’

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক আলমগীর মুহম্মদ মনসুরুল আলম বলেন, ‘আমরা ২০২০ সাল থেকে করোনার প্রভাব মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিয়েছি। ফেব্রুয়ারির মধ্যে বিদ্যালয় খোলা সম্ভব হলে কোনও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাই কঠিন হবে না।’

প্রজন্মনিউজ২৪/লিংকন

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ