বাংলাদেশের কৃষি বিপ্লবে নতুন সম্ভাবনায় 'কাসাবা'

প্রকাশিত: ২৪ ডিসেম্বর, ২০২০ ০২:০৪:৪০ || পরিবর্তিত: ২৪ ডিসেম্বর, ২০২০ ০২:০৪:৪০

বাংলাদেশের কৃষি বিপ্লবে নতুন সম্ভাবনায় 'কাসাবা'

নূরুল ইসলাম ফরহাদ: 'কাসাবা' আমাদের কাছে নতুন হলেও এটি বিশ্বে জনপ্রিয় একটি খাবার। এই উদ্ভিদটি পাহাড়ী এলাকায় খুব ভালো হলেও সমতল ভূমিতেও হয়। কাসাবা এক প্রকার আলু। শিমুল গাছের মতো দেখা যায় বলে আমাদের দেশে এটি শিমুল আলু নামে পরিচিত। এটি হচ্ছে গাছের শেকড়জাত এক ধরনের আলু, জন্মে মাটির নিচে। ইংরেজি হতে আগত নাম হলেও আমাদের দেশেও অনেকে খাদ্যটিকে কাসাভা বলে অভিহিত করে। কাসাবা দক্ষিণ আমেরিকার গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ, এটি ব্যাপকভাবে ক্রান্তীয় এবং প্রায় ক্রান্তীয় অঞ্চলে বার্ষিক ফসল হিসেবে চাষ করা হয়।

শিমুল আলু চাল ও ভুট্টার পর ক্রান্তীয় অঞ্চলে খাদ্য শর্করার তৃতীয় বৃহত্তম উৎস। শিমুল আলু উন্নয়নশীল বিশ্বের একটি প্রধান খাদ্য, যা পঞ্চাশ লক্ষ মানুষের মৌলিক খাদ্য। এটা সবচেয়ে খরা সহনশীল ফসল। নাইজেরিয়ান বিশ্বে শিমুল আলুর বৃহত্তম উৎপাদনকারী এবং থাইল্যান্ড বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ।

প্রতি ইঞ্চি জমির সর্বোত্তম ব্যবহারের লক্ষ্যে কাসাবা হচ্ছে একটি সম্ভাবনাময় ফসল। উৎপাদনের দিক থেকে গম, ধান, ভুট্টা, গোল আলু ও বার্লির পরই কাসাবার স্থান। টাংগাইলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আগে থেকেই বিচ্ছিন্নভাবে কাসাবার চাষাবাদ করা হচ্ছে। চট্টগ্রামে এখন ব্যাপকভাবে কাসাবার চাষ হচ্ছে। খাগড়াছড়ি, বান্দরবান এবং রাঙামাটিতেও চাষ হচ্ছে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত দুটি জাতের কাসাবার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে এবং এগুলো ফিলিপাইন থেকে এসেছে। একটি লাল অপরটি সাদাটে। দেশে ক্রমবর্ধমান খাদ্য খাটতি মোকাবেলায় কাসাবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কাসাবা চাষে কোনো ঝামেলা নেই বললেই চলে। অল্প পরিশ্রমে অধিক ফসল পাওয়া যায়।

কাসাবা নিয়ে ইতিপূর্বে অনেক গবেষণা হয়েছে, সম্প্রতি বরিশালের গৌরনদীতে ভেষজ গবেষক আহছান উল্লাহ স্বল্প পরিসরে কাসাবা নিয়ে গবেষণা করে জানিয়েছেন, কাসাবা চারা রোপণের ৬ মাস পর থেকে টিউবার সংগ্রহ করা যায় এবং সঠিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের মাধ্যমে হেক্টর প্রতি ২০/২৫ টন কাসাবা উৎপাদন করা যায়। কাসাবা চাষের জমিতে যাতে বন্যা অথবা বৃষ্টির পানি না দাঁড়ায় এ জন্য নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা করতে হবে। কাসাবা যদিও খরা সহনশীল গাছ, তথাপিও বারবার করার ফলে ফলন কমে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, খরা মৌসুমে সপ্তাহে ১৫/২০ দিন পানি পেলে ফলন বৃদ্ধি পায়। একটি গাছ কমপক্ষে তিন বছর ধরে ফলন দেয়।

কাসাবার বংশ বিস্তার সাধারণত স্টেম কাটিংয়ের মাধ্যমে করা হয়। ৮ থেকে ১২ মাসে ২/৩ সেন্টিমিটার পুরুত্ববিশিষ্ট রোগ ও পোকামাকড়মুক্ত কা- চারা তৈরির জন্য আদর্শ। ফেব্রুয়ারি, মার্চ মাসে রোগমুক্ত কা- সংগ্রহ করে ধারালো ছুরি অথবা ডাবল সিকেসা দিয়ে এক বা দুই পর্ববিশিষ্ট ২০/৩০ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট কা- পলি ব্যাগে বা সয়েল বেডে ৫ সেন্টিমিটার গভীরতায় ৪৫ ডিগ্রি কোণ দক্ষিণে হেলিয়ে রোপণ করতে হয়।

কাসাবা সাধারণত যেসব রোগে আক্রান্ত হয়, তার মধ্যে উল্ল্লেখযোগ্য হলো কাসাবা স্কেল, প্রিপস মাইট হর্নওয়াম, হোয়াইট গ্রাব, উইপোকা নেমাটোড ও ইঁদুর। তবে সঠিক ভাবে রোগ নির্ণয় করে ওষুধ ব্যবহার করলে এসব রোগ, পোকা দমন করা যায়। গবেষণায় আরো দেখা গেছে, কাসাবা জৈব প্রযুক্তিতে চাষাবাদ করলে রোগ ও পোকা-মাকড়ের আক্রমণ কম হয়।

আমাদের দেশে কৃষিদ্রব্য উৎপাদনে যে সম্ভাবনা রয়েছে তা বিভিন্ন পারিপাশ্বর্িক কারণে এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগের অভাবে তা বাস্তবায়নে তেমন আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় না। বরং উৎপাদন ধীরে ধীরে নিম্নগামী হচ্ছে। স্বল্পমেয়াদী লাভজনক এ কাসাবা সম্পর্কে তৃণমূল পর্যায়ে কৃষকদের বুঝাতে পারলে চাষীদের মাঝে উৎপাদনের উদ্দীপনা সৃষ্টি হবে। কাসাবা চাষ সমগ্র বাংলাদেশে সমপ্রসারণ করে কৃষিক্ষেত্রে প্রচুর কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের বৃহত্তর ভূমিহীন শ্রেণীকে উৎপাদন কাজে নিয়োজিত করে শ্রেণী বিভক্ত সমাজে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন কাসাবা চাষীদের প্রয়োজনীয় উৎসাহ ও উৎপাদনের অনুকূল পরিবেশের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া। কাসাবা চাষের মাধ্যমে এদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। পরিকল্পিত কাসাবা চাষে কৃষক পরিবারে অতিরিক্ত আয় ও কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। সমগ্র বাংলাদেশের আবহাওয়া কাসাবা চাষের সম্পূর্ণ উপযোগী। কৃষি ও শিল্পভিত্তিক এই কাসাবা উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জনপদের হতদরিদ্র ও গ্রামীণ জনগণের বাড়তি আয়, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, স্বল্প পুঁজিতে কুটির শিল্পের প্রসার তথা দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে এ পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় করার একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে বলে সচেতন মহল মত প্রকাশ করেছেন।

দেশে কাসাবার বড় ক্রেতা প্রাণ, রহমান কেমিক্যাল, স্কয়ারসহ বড় বড় কোম্পানি। তারা সরাসরি কৃষকের কাছে এসে কাসাবা কিনে নিয়ে যায়। কাসাবা থেকে উন্নতমানের সাদা আটা পাওয়া যায়, যা দিয়ে রুটি, বিস্কুট, চিপস, গ্নুকোজ, সাগু, বিয়ার, পোলট্রি ফিড তৈরি করা যায়, বস্ত্র ও কাগজ তৈরি শিল্পে প্রচুর কাসাবা ব্যবহার হয়। এছাড়াও ঔষধের কাঁচামালও তৈরি করছে। এলকোহল শিল্পে প্রচুর কাসাবা ব্যবহার করা হয়।

প্রজন্মনিউজ২৪/নাজমুল

 

 

 

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ