কয়লার ব্যবহার এখনই বন্ধ করতে হবে

প্রকাশিত: ০৫ ডিসেম্বর, ২০২০ ০৩:৪৫:১৮

কয়লার ব্যবহার এখনই বন্ধ করতে হবে

বিশ্বজুড়ে নানা ধরনের পরিবর্তন আসছে। বিভিন্ন দেশের শাসকদের মনোভাবে পরিবর্তন আসছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়গুলো সবাইকেই ভাবিয়ে তুলছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০৬০ সালের মধ্যে তার দেশে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ শূণ্যতে নামিয়ে আনার লক্ষ্য গ্রহণ করেছেন। অপরদিকে, চীনের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্রের নব-নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র আবারও প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় আছে।

প্রায় পাঁচ বছর আগে অর্থাৎ ২০১৫ সালে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি স্বাক্ষর হয়। কিন্তু ২০১৭ সালেই ওই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণের সময়ই জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। সে সময় জলবায়ু চুক্তিকে ‘ধাপ্পাবাজি’ বলে উল্লেখ করেছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু চলতি বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণায় প্রথম থেকেই বাইডেন প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছেন যে, তিনি ওই চুক্তিতে আবারও ফিরে যাবেন।

এটি এমন একটি সময় যখন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কয়লাক্ষেত্রে ইতিহাস গড়ে তোলার সময় এসেছে। মূলত গ্রীন হাউস গ্যাসের সবচেয়ে বড় উৎস হচ্ছে এই কয়লা। তবে ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে কয়লার ব্যবহার ৩৪ শতাংশ কমেছে। প্যারিসভিত্তিক আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা বলছে, কোভিড পূর্ববর্তী অবস্থায় যে পরিমাণ কয়লার ব্যবহার হয়েছে বিশ্ব এখন আর তা অতিক্রম করতে পারবে না।

তবে গাড়ি থেকে শুরু করে সব ধরনের বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রে শক্তির যোগান দিতে কাঁচামালের ক্ষেত্রে এখনও প্রায় ২৭ শতাংশ কয়লা ব্যবহৃত হচ্ছে। কয়লার ব্যবহার বাড়লে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণও পাল্লা দিয়ে বাড়বে। যদি বিশ্বজুড়ে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনা যায় এবং তা যদি দ্রুত সম্ভব হয় তবে পশ্চিমা দেশগুলোর সফলতা দ্বিগুণ হয়ে যাবে। একই চিত্র দেখা যাবে এশিয়াতেও। যদিও সেটা এতটা সহজও নয়।

শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বে কয়লার ব্যবহার শুরু হয়। ১৯৩০ সালের দিকে ধনী দেশগুলো বিভিন্ন ক্ষেত্রে কয়লার ব্যবহার শুরু করে। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমা দেশগুলোতে কয়লার ব্যবহার কমে গেছে। ২০২২ সালের মধ্যেই ব্রিটেনের সর্বশেষ কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম কয়লা খনি পিবডি এনার্জি সতর্ক করেছে যে, পাঁচ বছরে দ্বিতীয়বারের মতো দেউলিয়া হতে যাচ্ছে তারা।

ব্লুমবার্গনেফ নামের একটি ডাটা সংস্থা বলছে, বিভিন্ন সোলার ফার্ম এবং উপকূলীয় বাতাসের মাধ্যমে সবচেয়ে কম খরচে নতুন করে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে যা, বর্তমান বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের চাহিদা পূরণে সক্ষম। ফলে বিদ্যুৎক্ষেত্রে কয়লার ব্যবহার কমে আসছে।

২০১৫ সালের জলবায়ু চুক্তি অনুযায়ী, অনেক দেশই এখন কয়লার ব্যবহার একেবারেই শূণ্যে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করেছে। জীবাশ্ম জ্বালানিগুলোর মধ্যে সর্বাধিক পরিবেশ দূষণকারী হচ্ছে খনিজ কয়লা, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পৃথিবীর অনেক দেশই এখন কয়লার ওপর নির্ভরতা কমানোর জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

যুক্তরাজ্য ২০২৫ সালের মধ্যে দেশকে পুরোপুরি কয়লামুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। অপরদিকে জার্মানি ২০৩৮ সালের মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণভাবে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা করেছে এবং ধাপে ধাপে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে তারা।

এটা একটি বিজয়ই বলা যায়, যদিও তা আংশিক। গত ১০ বছরে ইউরোপের দেশগুলো কয়লার ব্যবহার থেকে সরে আসছে। কিন্তু একই সময়ে কয়লার পেছনে এশিয়ার দেশগুলোর ব্যয় এক চতুর্থাংশ বেড়ে গেছে। বিশ্বের মোট কয়লা ব্যবহারের ৭৭ শতাংশই হচ্ছে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। চীন একাই এর দুই-তৃতীয়াংশ ব্যবহার করছে। এই তালিকায় চীনের চেয়ে এগিয়ে আছে ভারত।

ইন্দোনেশিয়া এবং ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোতে কিছু মাঝারি ও দ্রুত বর্ধমান অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কয়লার আধিপত্য রয়েছে। প্রাক-শিল্প স্তরে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপর সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য থাকলে কয়লার ব্যবহার কমিয়ে আনতে এশিয়ার দেশগুলোকে আর অপেক্ষা করা উচিত হবে না। এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এখনও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হচ্ছে।

কয়লার ব্যবহার থেকে বেরিয়ে আসতে এশিয়ার নতুন নীতিমালা প্রয়োজন এবং তা যত দ্রুত সম্ভব হবে ততোই ভালো। নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বন্ধ এবং যেগুলো ইতোমধ্যেই রয়েছে সেগুলো বন্ধ করে দেওয়ার লক্ষ্য গ্রহণ করতে হবে তাদের।

ফিলিপাইনে ইতোমধ্যেই আইন জারি করে নতুন প্লান্ট তৈরি স্থগিত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে জাপান এবং বাংলাদেশেও এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ কমিয়ে আনা হচ্ছে। চীনের পাঁচ বছরের নতুন পরিকল্পনার মধ্যেও কয়লার ব্যবহার কমিয়ে আনা হতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে।

এশিয়ার দেশগুলো যদি এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারে তবে এর সঙ্গে সঙ্গে তাদের কিছু সমস্যাও মোকাবিলা করতে হবে। ইউরোপ এবং আমেরিকায় কিছু পরিকল্পনা সহজ কারণ সেখানে বিভিন্ন খনি কোম্পানি, বিদ্যুৎকেন্দ্র, যন্ত্রপাতি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান এবং তাদের অর্থ যোগানদাতা বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যাংকগুলোর বেশিরভাগই রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত।

তবে শেষ পর্যন্ত এশিয়াকে তাদের নিজেদের দায়িত্ব নিজেদেরই নিতে হবে। এক্ষেত্রে একটি সুসংবাদ হচ্ছে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ এক্ষেত্রে আগ্রহী হয়ে উঠছে।

এই অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খরা, বন্যা, ঝড় এবং সমুদ্রের পানির প্রবাহ বৃদ্ধি জনসংখ্যা, অবকাঠামো এবং কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। কয়লার ব্যবহার অচিরেই নিঃশেষ হতে হবে এবং যত দ্রুত সেটা হবে ততোই আমাদের জীবন-যাত্রা এবং পরিবেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে। এক সময় হয়তো ইতিহাসের পাতা আর বিভিন্ন জাদুঘরে এ সম্পর্কে জানব আমরা। ততদিনে বাস্তব জীবনে কয়লার ব্যবহার বিলীন হয়ে যাবে সেটাই প্রত্যাশা।

প্রজন্মনিউজ২৪/মেহেদী

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন





ব্রেকিং নিউজ