ব্রয়লার মুরগি যেভাবে খাবারের টেবিলে জায়গা করে নিলো

প্রকাশিত: ১৭ নভেম্বর, ২০২০ ০১:২৫:৫৯

ব্রয়লার মুরগি যেভাবে খাবারের টেবিলে জায়গা করে নিলো

বাংলাদেশের মুরগির বাজারের প্রায় ৭০ শতাংশ আর ডিমের বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশই বিদেশি জাতের মুরগির দখলে।

পোল্ট্রি বা খামারে লালনপালন করা বিদেশি জাতের বা শংকর করা মোরগ-মুরগি, এখন বাংলাদেশের মানুষের খাদ্য তালিকার প্রায় নিয়মিত একটি অংশ।বাংলাদেশে অনেকের কাছে এসব মুরগি ফার্মের মুরগি,পোলট্রি,সোনালী বা কক হিসাবে পরিচিত। খবর বিবিসির।

কিন্তু খাদ্য তালিকায় ফার্মে লালনপালন করা মোরগ-মুরগির অন্তর্ভুক্তি খুব সহজে হয়নি।প্রথমদিকে বাংলাদেশের মানুষের এ ধরণের মুরগি খাওয়ার প্রতি এক ধরণের অনীহাও কাজ করতো।

কিন্তু গত কয়েক দশকের মধ্যে সেই পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে।এখন দেশের মুরগির বাজারের প্রায় ৭০ শতাংশ আর ডিমের বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশই এই জাতীয় মুরগির দখলে।

প্রথম দফার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল

বাংলাদেশে প্রথম বিদেশি জাতের মোরগ-মুরগি চাষের চেষ্টা শুরু হয় ১৯৭১ সালের আগে থেকেই।সেই সময় সরকারি প্রকল্পের আওতায় বিদেশি জাতের মোরগ বা মুরগি দেশীয় জাতের মোরগ-মুরগির সঙ্গে সংমিশ্রণ করানোর একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি সায়েন্সের অধ্যাপক ড. সচ্চিদানন্দ দাস চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ‘ষাট ও সত্তরের দুই দশক ধরে সরকার চাইছিল, খামারি বা কৃষকরা যেন তাদের দেশি মুরগির সঙ্গে বিদেশি জাতের মোরগ লালনপালন করবেন। তাহলে প্রাকৃতিকভাবে নতুন উন্নত জাতের তৈরি হবে।’

জেলা-উপজেলা পশুপালন দপ্তরগুলোর মাধ্যমে বিদেশি উন্নত জাতের মোরগ স্থানীয়দের বিতরণ করা হতো,যাতে সেগুলো দেশীয় মুরগির সঙ্গে মিশে যেতে পারে। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়ায় এসে বেশিরভাগ বিদেশি মোরগ মারা যায়। এক পর্যায়ে সেই প্রকল্প ব্যর্থ হয়ে যায়।

তখন গবেষকরা ভাবতে শুরু করলেন, বিদেশি কোন জাতের মোরগ-মুরগি বাংলাদেশের পরিবেশে খাপ খাওয়াতে পারবে।

এই গবেষণার সূত্র ধরে ইটালির হোয়াইট লেগ মুরগির সঙ্গে আমেরিকান রোড আইল্যান্ড মোরগের শংকর করা শুরু হয়।সেই জাতের নামকরণ করা দেয়া হয় ককরেল।

আর মিশরের ফায়োমিন মুরগির সঙ্গে আমেরিকান রোড আইল্যান্ড মোরগ মিশিয়ে যে জাত তৈরি করা হয়,সেটার নাম দেয়া হয় সোনালী।অনেকটা দেশি মুরগির মতো দেখতে ও স্বাদ হওয়ায় সোনালী মুরগিটি বেশ বাজার পায়।

বাংলাদেশে এখন সবমিলিয়ে মুরগির খামারিদের সংখ্যা ৭০ হাজারের বেশি।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইন্সটিটিউটের মহাপরিচালক ড. নাথু রাম সরকার বলছেন, ‘স্বাধীনতার পরপর বাংলাদেশে এগস এন্ড হেনস নামে গাজীপুরের জয়দেবপুরে একটি ব্রয়লার মুরগির প্রতিষ্ঠান ছিল।তবে বাংলাদেশে ব্রয়লার মুরগির জনপ্রিয় হতে শুরু করে বিমান বাংলাদেশের হাত ধরে।’

গবেষকরা জানিয়েছেন,সেই সময় বিমান বাংলাদেশে তাদের নিজস্ব ক্যাটারিংয়ের জন্য সাভারের গণকবাড়িতে একটি ব্রয়লার মুরগির খামার স্থাপন করে।বিদেশ থেকে উন্নত জাতের বাচ্চা এনে সেখানে মাংসের জন্য বড় করা হতো।বিমানের নিজস্ব খাবারের জন্য সেইসব মাংস ব্যবহার করা হতো।

এসব মুরগির টিকে যাওয়া দেখে বিমানের খামার থেকে সেসব বাচ্চা নিয়ে গবেষণা করতে শুরু করে বাংলাদেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা।আরও অনেকেই বিমান থেকে বাচ্চা সংগ্রহ করতে শুরু করেন।

এর কয়েক বছরের মধ্যে নারায়ণগঞ্জে সামিউল হোসেন নামের একটি পোলট্রির বড় খামার তৈরি হয়।ফিনিশ পোলট্রি নামের আরেকটি খামারও ছিল।এসব খামার থেকে অনেকেই একদিনের বাচ্চা নিয়ে ব্রয়লার মুরগির লালনপালন করতে শুরু করেন।

সরকারিভাবেও বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় এরকম খামার তৈরি করতে উদ্বুদ্ধ করা হতো। স্বল্প সুদে ঋণ, প্রণোদনা, পরামর্শ দেয়া হতো।

কিন্তু বড় পরিবর্তন আসে নব্বইয়ের দশকে।

অধ্যাপক ড. সচ্চিদানন্দ দাস চৌধুরী বলছেন, ‘মূলত নব্বইয়ের দশক থেকে পোলট্রি মুরগির পালনে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন হতে শুরু করে। আগে বিমানে করে বিদেশ থেকে একদিনের বাচ্চা আনতে হতো। কিন্তু নব্বুইয়ের দশকের দিকে দেশের অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান এই মোরগ-মুরগীর ব্যবসায় এগিয়ে আসে। তারা বড় বড় খামার করে বিদেশি জাতের মুরগি নিয়ে এসে দেশেই বাচ্চা উৎপাদন করতে শুরু করলেন।’

সেই সঙ্গে মুরগীর খাবার ও ওষুধের সহযোগী অনেক প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠতে শুরু করে।

কম খরচে খামার তৈরি করে লালনপালন, সহজে বাচ্চা পাওয়া, অল্প দিনের ভেতর বিক্রি করে মুনাফা করতে পারা- ইত্যাদি কারণে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় অনেকেই পোলট্রি মুরগির খামার গড়ে উৎসাহিত হয়ে উঠলেন।

বরিশালের একটি পোলট্রি ফার্মের মালিক আঁখি আক্তার বলছেন, ‘একটি চাকরির পাশাপাশি আমি একশো মুরগি নিয়ে একটি ছোট খামার দিয়েছি। বাড়ির সবাই মিলে সেটা দেখাশোনা করে। তাতে একদিকে আমাদের মাংসের চাহিদাও মিটছে, আবার বাড়তি কিছু আয়ও হচ্ছে।’

উনিশশো নব্বইয়ের দশক থেকে বাংলাদেশে ফার্মের মুরগি ও ডিম খাওয়ার ব্যাপারে মানুষের মধ্যেও একটা আগ্রহ গড়ে উঠতে শুরু করলো।

বাংলাদেশে এখন সব মিলিয়ে মুরগির খামারিদের সংখ্যা ৭০ হাজারের বেশি।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইন্সটিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের পোলট্রি ব্যবসার আকার ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।

প্রথমে অনেকেই ব্রয়লার মুরগী খেতে চাইতেন না

উনিশশো আশির দশকের প্রথমদিকে যখন আস্তে আস্তে ব্রয়লার মুরগির খামার গড়ে উঠতে শুরু করলো, তখন অনেকেই এরকম মুরগি খেতে চাইতেন না। কারণ দেশীয় মুরগির মাংসের তুলনায় এগুলোর মাংস নরম ছিল, রান্নার সময় অনেক সময় মাংস হাড় থেকে ছুটে যেতো।

অধ্যাপক ড. সচ্চিদানন্দ দাস চৌধুরী বলছেন, ‘শুরুর দিকে মানুষ ব্রয়লার বা লেয়ার মুরগি পছন্দ করতেন না। তখনো বাজারে দেশি মুরগিও পাওয়া যেতো। মানুষ সেটাই বেশি পছন্দ করতো। আবার অনেকের ধারণা ছিল, এটা বিদেশি জাতের মুরগি, খেলে আবার কী হবে, এরকম অনেক ভ্রান্ত ধারণা ছিল।’তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সেই মানসিকতায় পরিবর্তন আসতে শুরু করে।

ড. চৌধুরী বলছিলেন, ‘স্বাধীনতার পর দেশে যে জনসংখ্যা ছিল, এখন তা দ্বিগুণের বেশি হয়ে গেছে। ফলে মানুষের খাবারের চাহিদাও বেড়েছে। কিন্তু দেশী মুরগি বা ডিম তো আর সেভাবেই বাড়েনি।’

‘বরং ফার্মের মুরগির কারণে মাংস আর ডিম মানুষের ক্রয় ক্ষমতার ভেতরে রয়েছে। মানুষ যখন দেখেছে, অন্য মাংসের তুলনায় কম মূল্যে মুরগির মাংস ও ডিম পাওয়া যাচ্ছে, তখন তারা এটি খাওয়ার প্রতি আগ্রহী হয়েছে। পাশাপাশি মানুষের ব্যস্ততা আর শহরমুখী হওয়ার কারণে দেশীয় মুরগির লালনপালনও কমেছে। এসব কারণে মানুষ আস্তে আস্তে ব্রয়লার মুরগি ও ডিম খেতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।’

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুসারে, ২০১৯ সালে একদিনের ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা উৎপাদন হয়েছে ৭০ কোটির বেশি আর লেয়ার উৎপাদিত হয়েছে ৪ কোটি ৭০ লাখ।

গত বছর বাংলাদেশের খামারগুলোয় মোট ডিম উৎপাদিত হয়েছে ১ হাজার ৭১১ কোটি।

শুরুর দিকে বিদেশ থেকে সরাসরি একদিনের বাচ্চা নিয়ে এসে দেশের খামারে বড় করে বিক্রি করা হতো। তবে এখন বাংলাদেশেই মুরগির বাচ্চা উৎপাদনের প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে।

ইউরোপীয় এবং কানাডার বিভিন্ন উন্নত জাতের মুরগি বাংলাদেশে নিয়ে এসে শংকরায়ন করে ডিম ফুটিয়ে শংকর জাতের বাচ্চা তৈরি করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানকে বলা হয় গ্র্যান্ড প্যারেন্টিং ফার্ম। বাংলাদেশে এরকম ১৬টি ফার্ম রয়েছে।

এদের কাছ থেকে সেইসব একদিনের বাচ্চা কিনে নিয়ে বড় করে এগুলোর ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা তৈরি করে খামারিদের কাছে বিক্রি করা হয়। এগুলোকে বলা হয় প্যারেন্টিং ফার্ম। বাংলাদেশে এরকম কয়েকশো প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

তাদের কাছ থেকে একদিনের মুরগির বাচ্চা কিনে খামারিরা অন্তত চার সপ্তাহ লালন পালন করার পর বাজারে বিক্রি করে থাকেন। এটাই সাদা ব্রয়লার মুরগি হিসাবে পরিচিত।

যারা ডিম পাড়া মুরগি পালন করেন, তারাও একদিনের মুরগি কিনে এনে বড় করেন।

বাংলাদেশের পোলট্রি শিল্প সমন্বয় কমিটির হিসেবে প্রায় ৭০ হাজারের মতো পোলট্রি ফার্ম রয়েছে সারাদেশে। এখন বাংলাদেশে এই খাত সরকার স্বীকৃত একটি শিল্প খাত।

প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইন্সটিটিউটের মহাপরিচালক ড. নাথু রাম সরকার বলছেন, ‘পোলট্রি মুরগি নিয়ে অনেক সময় অনেক বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে, যার বেশিরভাগের ভিত্তি নেই। ফলে কখনো কখনো এই খাতটি অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও পড়েছে। কিন্তু কম মূল্যে মাংস ও ডিমের জোগান দেয়ার কারণে এই খাতটি দেশের আমিষের বড় একটি চাহিদা পূরণ করে যাচ্ছে।’

বাংলাদেশের বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইন্সটিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের পোলট্রি মার্কেটে আকার ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।

খামারের মোরগ-মুরগির প্রকারভেদ

বাংলাদেশে খামারে এখন মূলত চার ধরণের মোরগ-মুরগির লালন-পালন করা হয়।

ব্রয়লার

লেয়ার

কক

সোনালী

শুধুমাত্র মাংসের জন্য যেসব মুরগি লালনপালন করা হয়, সেগুলো ব্রয়লার। ডিম পাড়া মুরগিকে বলে লেয়ার। তবে ডিম পাড়ার বয়স শেষ হয়ে গেলে সেগুলোকেও মাংসের জন্য বিক্রি করা হয়ে থাকে।

মূলত কানাডা এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর মুরগির জাত থেকে লেয়ার বা ব্রয়লারের জাত তৈরি করা হয়।

মিশরের ফায়োমিন মুরগির সঙ্গে আমেরিকান রোড আইল্যান্ড মোরগ মিশিয়ে যে জাত তৈরি করা হয়, সেটার নাম দেয়া হয় সোনালী। এগুলোও খামারে বড় করা হয়। এগুলো যেমন মাংসের জন্য বিক্রি করা হয়, আবার অনেকে ডিমের জন্য লালন পালন করেন। এগুলোর ডিম অনেকটা দেশি মোরগের ডিমের মতোই হয়।

প্যারেন্টিং ফার্ম থেকে এরকম একদিনের মুরগির বাচ্চা বড় করে সেগুলোকে ব্রয়লারের মতোই লালনপালন করে বিক্রি করা হয়।

কক বা পাকিস্তানি মুরগি বলে যেটা পরিচিত, সেটাও আসলে খামারে পালন করা মোরগ।

ডিম পাড়া মুরগির সঙ্গে যখন বাচ্চা ফোটানো হয়, যেখানে প্রথমেই ছেলে-মেয়ে জাত আলাদা করে ফেলা হয়। মুরগি বড় হয়ে হয় ডিম পাড়া লেয়ার। আর মোরগগুলোকে আলাদাভাবে বড় করে পরবর্তীতে বিক্রি করা হয়, যা অনেকের কাছে কক বা পাকিস্তানি মুরগি বলেও পরিচিত।

অধ্যাপক ড. সচ্চিদানন্দ দাস চৌধুরী বলছেন, একসময় মিশরীয় স্ত্রী জাতের মুরগির বাচ্চা পাকিস্তান থেকে আমদানি করা হতো। এই কারণে এগুলোকে অনেকে পাকিস্তানি মুরগি বলে চেনেন। তবে এখন এগুলো বাংলাদেশেই উৎপাদিত হয়।

 

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন





ব্রেকিং নিউজ












ব্রেকিং নিউজ