ব্যাচেলর জীবনের প্রথম প্রেম

প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর, ২০২০ ১০:৫১:১৯ || পরিবর্তিত: ১১ অক্টোবর, ২০২০ ১০:৫১:১৯

কতগুলো প্রেম করেছি ব্যাচেলর জীবনে সেটা বলা সম্ভব নয়। কিন্তু সে প্রেম আমাকে শক্তি জুগিয়েছে, বল জুগিয়েছে এবং সর্বোপরি বিয়ে করার সাহস জুগিয়েছে। সে প্রেম ছিল তেমনই।

ব্যাচেলর জীবনের তিনটি ধরন আছে। ১ নম্বর সহজ ব্যাচেলর জীবন, ২ নম্বর কঠিন ব্যাচেলর জীবন এবং ৩ নম্বর তস্যকঠিন ব্যাচেলর জীবন।

ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকেই মানুষের ব্যাচেলর জীবন শুরু হয়। আমারও তাই হয়েছিল। তবে যত দিন মায়ের আঁচলের তলায় ছিলাম, তত দিন ব্যাচেলর জীবন ছিল সহজ। তারপর পরিবার থেকে পৃথক হয়ে যখন মেসে বন্ধুদের সঙ্গে থাকতে শুরু করলাম, সেটা ছিল কঠিন ব্যাচেলর জীবন। প্রথম প্রেমের প্রথম দিন প্রথম চোখাচোখি হওয়ার মতো কঠিন। পড়াশোনা শেষ করে যখন চাকরির জন্য ঘুরছি এবং ব্যাচেলর হওয়ার জন্য বাসা ভাড়া পাচ্ছি না তিন মাসের আগাম বাসা ভাড়ার খত দিয়েও, সেটা ছিল তস্যকঠিন ব্যাচেলর জীবন। পাথরে ফুল ফোটানোর তপস্যার মতো কঠিন। মনে হতো, বাড়িওয়ালারা বুঝি কোনো দিন ব্যাচেলর ছিলেনই না! কিংবা সব ব্যাচেলরই তাঁর নিষ্পাপ কন্যাকে ফুসলিয়ে নিয়ে যাবে। পরে এই বাড়ির দাবিদার হয়ে উঠবে!


যা হোক, বলছিলাম ব্যাচেলর জীবনের প্রেমের কথা। এত গাঢ় প্রেম ছিল যে কোনো কোনো দিন সকাল-বিকেল-দুপুর-রাত সব সময়ই দেখা হতো আমাদের। কখনো কখনো বিরক্ত হতাম। জীবন জ্বলে-পুড়ে খাক হয়ে গেল বলে কপাল চাপড়াতাম। কিন্তু তিন দিনের বিচ্ছেদ সহ্য হতো না। তবে বিচ্ছেদকালেও তার সুঘ্রাণের মৌতাতে কেমন যেন লাগত, এই এত দিন পর এখনো যেমন লাগে। আর সে কী বাহার! কখনো হালকা সোনালি তো কখনো হলুদ। কখনো আবার হলুদের মধ্যে কেমন একটু সবুজের ছোঁয়া দেখে মুগ্ধ হয়ে যেতাম। যেভাবেই দেখতাম না কেন, আকর্ষণের কোনো কমতি ছিল না। সত্যি কথা কি, জিব থেকে লালা ঝরত মাঝেমধ্যেই, নোলা ছোঁক ছোঁক করত! এমনই মাখো মাখো ছিল সে প্রেম।


ডিম: ব্যাচেলর জীবনের প্রেমছবি: পেকজেলসডটকম
ব্যাচেলর জীবনে আমার প্রথম প্রেম শুরু হয় ডিমের সঙ্গে। কী বিশ্বাস হচ্ছে না তো? বিশ্বাস না করে যাবেনই বা কোথায়। খেয়াল করুন তো আপনার সন্তানের ব্যাচেলর জীবনের শুরুর সময়টা। ডাক্তারের নির্দেশে ‘রিলিজিয়াসলি’ প্রতিদিন অন্তত একটি করে ডিম খাওয়ানো বাধ্যতামূলক। কারণ ডাক্তার বলেছেন, ডিম একটি আদর্শ খাবার বা সুপার ফুড। শিশুর বুদ্ধি বাড়ানো এবং শরীরের অন্যান্য উপকারের জন্য তাই ডিম খাওয়ানো বাধ্যতামূলক। আমিও তো শিশু ছিলাম আর আমারও মা-বাবা আছেন। তাঁরাও আমাকে রিলিজিয়াসলি-ই ডিম খাইয়েছেন, প্রতিদিন কমপক্ষে একটা। না চাইলেও খেতেই হতো। সেই থেকে ডিমের সঙ্গে লুকোচুরির সম্পর্ক শুরু।

ছোট বেলায় না বুঝেই খেতে চাইতাম না। কিন্তু বড় বেলায়, কঠিন ব্যাচেলর জীবনে ডিম খাওয়া ছাড়ার কোনো উপায় ছিল না। তখন তো আমরা লায়েক হয়ে উঠেছি, থাকি হোস্টেল বা মেসে। সকালের নাশতায় ডিম-পরোটা। দুপুরে আলু আর ধনে পাতার তরকারিতে টুক করে ছেড়ে দেওয়া হতো সেদ্ধ করে হালকা ভেজে নেওয়া গোটা ডিম।


ডিমের সঙ্গে পেঁয়াজের সম্পর্ক নিবিড় : পেকজেলসডটকম
এখনকার মতো তখন পেঁয়াজের দাম বেশি ছিল না বলে পেঁয়াজের পরিমাণ থাকত বেশি। রাতে মেসে খাবার ভালো লাগছে না আবার বেশি টাকাও পকেটে নেই, অগত্যা একটা ডিম ভাজা দিয়ে দু প্লেট ভাত সাঁটিয়ে দেওয়া ছিল আমাদের রোজকার অভ্যাস।

বন্ধুরা দেখা করতে এলে অমুক মামার দোকানের ডিম বান কিংবা তমুক চাচার দোকানের ডিম পাউরুটি ছিল অভিজাত আপ্যায়ন। আর সেই মামা-চাচারাও বলিহারি, কী যে সুন্দর করে ভেজে দিতেন সেসব! বন্ধুরা তো বটেই, কত বান্ধবীকে যে সেসব ডিম বান বা ডিম পাউরুটি সাপ্লাই দিয়েছিলাম, তার কোনো লেখাজোখা নেই। বান্ধবীদের বেশির ভাগের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলেও ব্যাচেলর জীবনের সেই ডিম বান বা ডিম পাউরুটির সুবাদে এখনো কয়েকজন মামা-চাচার সঙ্গে আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক টিকে আছে দেশের বেশ কয়েকটি শহরে।

আর ডিমের মামলেট? না, এখন ভদ্রলোকেরা মামলেট শুনলে নাক কোঁচকোয়। ওটা নাকি অমলেট! যা হোক, কেমন একটা ওম ওম ব্যাপার আছে না?

অমলেট : অমলেট ইউরোপ থেকে আসা খাবার। ইউরোপে অমলেট করার শত শত প্রণালি আছে। মোদ্দা কথাটা হলো, ডিমকে না পুড়িয়ে হালকা করে ভেজে নেওয়া। অমলেট যখন মামলেট হয়ে যাচ্ছে এ দেশে এসে, তখন বোঝাই যায় ভিন্নতা কিছুটা আছেই। আমাদের মামলেট হলো, ডিমের সঙ্গে কুচি কুচি করে কাটা মরিচ, পেঁয়াজ, হালকা নুন যোগ করে ইচ্ছেমতো ঘুঁটা মেরে একটু বেশি তেল দিয়ে তাতে ভেজে খাওয়া। এর সঙ্গে একটু ক্যারদানি করতে পারলে সেটা আরও অন্য রকম হয়। যেমন ডিম যত ফ্যাটানো হবে, ভাজার সময় ঢেকে দিলে সেটা তত ফুলবে। আবার মামলেট করার সময় যখন একটু ভাজা ভাজা গন্ধ ছড়াতে শুরু করে, সেই মোক্ষম সময়ে যদি হালকা পানির ছিটে দিয়ে ঢেকে দেন, তাহলেও ডিম ফুলতে থাকে।

বাঙালির ডিমের সঙ্গে লবণ, মরিচ, পেঁয়াজ, ধনেপাতা দেওয়া এই অতি উপাদেয় মামলেট খাওয়ার চল এখন প্রায় নেই বললেই চলে। এখন বরং সানি সাইড আপ বা ডাউনের যুগ, পোচের যুগ। বয়েল কতটা হবে, কুসুম কতটা জমাট বাঁধবে, তাই নিয়ে চলে চুলোচুলি। অথচ আজকের সুসভ্য ইউরোপে আঠারো-উনিশ শতকে যখন আমাদের মতোই পাত্রী দেখে বিয়ের প্রচলন ছিল, তখনো নাকি ফরাসিদের দেশে বিবাহযোগ্যা পাত্রীর যোগ্যতা মাপার একটা পরীক্ষা ছিল অমলেট বানানো। যে পাত্রী যত সূক্ষ্মভাবে, যত যত্ন করে, যত সুন্দর— হলুদ নয় বরং সোনালি রঙের অমলেট বানাতে পারতেন, বিয়ের বাজারে তাঁর নাকি তত কদর ছিল বলে শোনা যায়।


আমাদের ব্যাচেলর জীবন ছিল মামলেটের যুগ। এখনকার মতো অত স্বাস্থ্যবাতিক আমাদের ছিল না বলে ডুবো তেলে মামলেট ভাজাই ছিল দস্তুর। আর কীভাবে যেন আমি মামলেট ভাজতে পারতাম দারুণ। ব্যাচেলর জীবনের বিভিন্ন সময় আমার ‘জাস্ট ফ্রেন্ড’ বান্ধবীদের কত রকমের মামলেট যে খাইয়েছি, তার কোনো হিসাব নেই।
যাঁরা নামী রেস্টুরেন্টে খেয়েছেন, হয়তো খেয়াল করে থাকবেন ডিমের যেকোনো খাবারের সঙ্গে তাঁরা গোলমরিচের গুঁড়া দেন। গোলমরিচের গুঁড়ায় নাকি ডিমের স্বাদ খোলে। ব্যক্তিগতভাবে অবশ্য আমার গোলমরিচের চেয়ে ডিমের যেকোনো খাবারে লবণের পরিমাণকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।

 

সকাল-দুপুর-বিকেল অথবা রাতে তো বটেই, টাকা থাকলেও কিংবা না থাকলেও ডিম খাওয়া ছিল ব্যাচেলর জীবনের বাস্তবতা। আর শীত এলে তো কথাই নেই। দল বেঁধে সেদ্ধ ডিমের ঝুড়ি খালি করার রেকর্ডও আছে কারও কারও ঝুলিতে। নরম সেদ্ধ ডিম সুতা দিয়ে মাঝামাঝি কেটে ডিম মামা যখন কুসুমের ওপর বিটলবণ ছিটিয়ে দিতেন নিপুণ হাতে অথবা শর্ষের তেলে মাখানো পোড়া শুকনো মরিচের গুঁড়া আর পেঁয়াজের কুচি দিয়ে এগিয়ে দিতেন, আহা! এই বিবাহিত জীবনের অনেকখানি পার করে এসেও কত শীতের সন্ধ্যায় যে আধা হালি ডিম খেয়ে ব্লাড প্রেশার বাড়িয়ে চুপচাপ বাসায় ফিরে গেছি, সে হিসাব জানে শুধু সে সন্ধ্যাগুলোই।

আজ এই বিশ্ব ডিম দিবসে স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে ব্যাচেলর জীবনের মতোই এখনো ডিম খাই। দিনে কতটি ডিম খাওয়া যাবে আর যাবে না, কুসুমছাড়া নাকি কুসুমসহ সে হিসেব করার সময় এখনো থাকে না ডিম দেখলে!


প্রজন্মনিউজ/শেখ নিপ্পন

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন





ব্রেকিং নিউজ