চীন-ভারত উত্তেজনা: হঠাৎ করেই সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দুই পক্ষের!

প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০৪:৪২:০০


বিদেশ ডেস্ক:

বিরোধপূর্ণ হিমালয় সীমান্তে কয়েক মাসের টানা উত্তেজনার পর হঠাৎ করেই ভারত ও চীন দ্রুত সেনা প্রত্যাহারের যৌথ ঘোষণা দেওয়ায় অনেকেই বিস্মিত। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, মস্কোতে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র শুক্রবারের দীর্ঘ বৈঠকের পর এই ঘোষণা দেওয়া হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, পারমাণবিক শক্তিধর দুই প্রতিবেশির মধ্যে প্রচণ্ড উত্তেজনার মধ্যেই এমন ঘোষণা আসার নেপথ্য কারণ সম্ভাব্য যুদ্ধ এড়ানো। তবে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণার ধারাবাহিকতায় কত দ্রুত ভারত ও চীনের মধ্যে শান্তি স্থাপিত হতে পারে; তা নিশ্চিত নয়। কারণ এ সংক্রান্ত যৌথ ঘোষণায় তথ্যের ঘাটতি রয়েছে।

এ সপ্তাহেই চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত্ব গ্লোবাল টাইমসে বলা হয় দিল্লি যুদ্ধের উস্কানি দিলে চীনা সেনারা দ্রুত ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান চালাবে আর তাদের ধ্বংস করে দেওয়া হবে। ভারতও পাল্টা হুমকি দেয়। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং জানিয়ে দেন আঞ্চলিক মর্যাদা রক্ষায় তার দেশের ভূমিকা নিয়ে কোনও সন্দেহ রাখা উচিত নয়।

পাল্টাপাল্টি এসব বক্তব্যে উঠে আসে সীমান্তের বাস্তব পরিস্থিতি তথা দুই সেনাবাহিনীর মুখোমুখি অবস্থান। জুনে দুই বাহিনী লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সংঘাতে জড়ায়। এতে ভারতের ২০ সেনা নিহত হয়। দুই দেশ এখনও সীমান্ত অঞ্চলটিতে বিপুল সংখ্যক সেনা মোতায়েন রেখেছে। অঞ্চলটিতে সীমান্ত নিয়ে দুই দেশেরই পরস্পরবিরোধী অবস্থান রয়েছে আর তার সমাধান করা খুব সহজ নয়।

তাহলে খুব কম সংখ্যক মানুষের প্রত্যাশা মাফিক কেন দুই দেশ উত্তেজনা নিরসনে সম্মত হলো?

থিংকট্যাংক উইলসন সেন্টারের ডেপুটি পরিচালক মাইকেল কুজেলম্যানসহ অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন সংঘাতের প্রস্তুতি থাকলেও দুই দেশ এটাও উপলব্ধি করতে পেরেছে যে, খুব সীমিত আকারে কোনও যুদ্ধও প্রত্যাশিত নয়। তিনি বলেন, ‘এটা উভয় দেশ এবং বৃহত্তর অঞ্চলের জন্য বিপর্যয়কর হয়ে উঠতে পারতো। যুদ্ধের জন্য অর্থনৈতিক সূচকগুলো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ছিল।’

বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এস জয়শঙ্কর বহু বছর বেইজিংয়ে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে আর চীনা কূটনীতিকদের সঙ্গে তার সুসম্পর্কের বিষয়টিও কারও অজানা নয়। দুই দেশের উত্তেজনা নিরসনে এগুলো ভূমিকা রেখেছে বলে মনে হচ্ছে। কুজেলম্যান বলেন, এতে করে বরফ গলতে পারে।  ব্যক্তিগত সম্পর্ক অনেক সময় কূটনৈতিক দরকষাকষিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সেনা প্রত্যাহারে পারস্পরিক সম্মতির নেপথ্যে আরেকটি ফ্যাক্টর হিসেবে আবহাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে হচ্ছে। শীতকালে যাতায়াতের অনুপযোগী হয়ে পড়ে গালওয়ানের সুউচ্চ উপত্যকা। ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল বিনোদ ভাটিয়া বলেন, সেনাবাহিনী কঠোর পরিস্থিতিতে কার্যক্রম চালাতে অভ্যস্ত কিন্তু সুযোগ পেলে উভয় দেশের সেনাবাহিনীই তা এড়িয়ে যেতে চাইবে।

বিভিন্ন খবরে জানা যাচ্ছে, সম্প্রতি ভারতীয় সেনাবাহিনী চীনা সেনাবাহিনীর পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত কয়েকটি পাহাড় চূড়ার দখল নিয়েছে। যদিও কোনও দেশই এসব খবর স্বীকার করেনি। ভাটিয়া বলেন, ‘এই সুযোগকে ভারত দাবার গুটি হিসেবেও ব্যবহার করে থাকতে পারে।’

সীমান্তে বিরোধ ছাড়াও উভয় দেশেরই অন্য বেশ কিছু সমস্যা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ভারতে কোভিড-১৯ এ আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে দ্রুত বাড়ছে আর জেরে অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। আর কোনও সশস্ত্র সংঘাত শুরু হলে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশটির সক্ষমতা আক্রান্ত হবে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য কয়েকটি দেশের সঙ্গে চীনের বিরোধ চলছে। পাশাপাশি বিতর্কিত হংকং নিরাপত্তা আইন নিয়ে বিশ্বজুড়ে সমালোচনার মুখেও রয়েছে বেইজিং। এইসব ফ্যাক্টর সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাংক স্টিমসন সেন্টারের পরিচালক ইয়ান সান মনে করেন, দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে বিস্তারিত তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। প্রথমত এতে দুই দেশের সীমান্ত প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার (এলএসি) কথা উল্লেখ করা হয়নি। তিনি বলেন, ‘এলএসি’র কয়েকটি এলাকা বিরোধপূর্ণ সেসব এলাকায় এখনও সেনা মোতায়েন রয়েছে। ফলে এসব ইস্যুতে ওই ঘোষণায় পরিষ্কার কিছু বলা হয়নি।’

ভারতের অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল ভাটিয়া বলেন, উত্তেজনা নিরসনে সময় লাগবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আরও বেশি সময় লাগবে। তিনি বলেন, ‘এলাকাটি খুব বড় আর কমান্ডারদের বোঝাপড়ায় পৌঁছাতে সময় দরকার পড়বে।’

দুই দেশই স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে চায়। আর সেটা খুবই কৌশলী বলে মনে করেন ইয়ান সান। তিনি বলেন, দুই দেশের কাছেই স্থিতাবস্থার ব্যাখ্যা আলাদা। তিনি বলেন, চীনা সেনাবাহিনী ভারতের দাবিকৃত অঞ্চলের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। আর সেখান থেকে তারা সরে আসবে কিনা তা স্পষ্ট নয়। যে কারণে উত্তেজনা বেড়েছে সেটিও নির্ধারণ করবে কত দ্রুত দুই দেশ সেনা প্রত্যাহার করে নিতে সক্ষম হবে। উত্তেজনার সূত্র হিসেবে বলা হচ্ছে ভারতের একটি সেনাঘাঁটি ও বিমানঘাঁটির মধ্যকার সংযোগ সড়ক নির্মাণ। তবে ইয়ান সান মনে করেন কেবল রাস্তা নির্মাণই উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণ নয়। কারণ এটি নির্মাণে লাগবে ২০ বছর আর এটি গোপনীয় কোনও বিষয় নয়। তার বিশ্বাস আরও অনেকগুলো ফ্যাক্টর এখানে কাজ করেছে। কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন বাতিলের ভারতীয় সিদ্ধান্ত এবং দিল্লির সঙ্গে ওয়াশিংটনের ক্রমাগত সম্পর্ক উন্নয়ন এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন তিনি। বলেছেন, ‘বেইজিং মনে করেছে ভারতকে শাস্তি দেওয়া গেলে একই সঙ্গে দিল্লি ও ওয়াশিংটনকে শিক্ষা দেওয়া হবে। কিন্তু তারা হিসাব করে উঠতে পারেনি যে ভারতও পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পিছুপা হবে না।’

করোনাভাইরাসে প্রাদুর্ভাব চীন কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে পারেনি বলে যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ তোলার পর থেকে বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গেই বেইজিংয়ের কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছে। ফলে তারা অতিরিক্ত আগ্রাসী হয়ে উঠেছে আর সেই আগ্রাসনের প্রতিফলন বেইজিংয়ের কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক বিবৃতিগুলোতে রয়েছে বলে মনে করেন ইয়ান সান। গত কয়েক মাসে চীনের পররাষ্ট্র নীতিতে আগ্রাসন গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন তিনি। আর চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রায়ই বেইজিংয়ের ব্যাপক সামরিক সক্ষমতার কথা প্রতিবেশিদের স্মরণ করিয়ে দেয়।

উইলসন সেন্টারের ডেপুটি পরিচালক মাইকেল কুজেলম্যান মনে করেন, সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণার কারণ দুই দেশ তাদের সম্পর্ক উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের উদ্যোগকে ক্ষতিগ্রস্থ করতে চাননি। ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর দুই নেতা ১৮ বার দেখা করেছেন। কুজেলম্যান বলেন, ‘কিন্তু গত কয়েক দিনে এর সবই বিফলে গেছে আর এখনন চীন ও ভারত তাদের ঘোষণা দুই দেশের জনগণের কাছে কিভাবে প্রচার করে তা দেখা খুবই মজার হবে।’

তবে ইয়ান সান মনে করেন, কয়েক দশকের পুরনো তিন হাজার ৪৪০ কিলোমিটারের এলএসির বিরোধ কয়েক দিনের মধ্যে মিটে যাবে না। ‘সুতরাং শুরু হিসেবে এটা ভালো। আলোচনা থেমে থাকার চেয়ে চলা ভালো তবে আশাবাদী হওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের সাবধানী হতে হবে,’ বলেন তিনি।

প্রজন্মনিউজ/এম.এইচ.টি

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ