শিক্ষিত বেকার সমস্যা ও আগামীর বাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২৩ জুলাই, ২০২০ ০৩:৩৯:০২

বয়স্ক গুরুজনেরা বলতেন, " লেখাপড়া করে যে, গাড়ি-ঘোড়ায় চলে সে।" ছোটবেলায় পড়াশোনায় মনোযোগী করানোর জন্য এমন উৎসাহ মূলক কথা শুনেনি মানুষের সংখ্যা একেবারেই কম।বর্তমানে দেশে উচ্চ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ। বর্তমানে দেশে ১০০ এর অধিক বিশ্ববিদ্যালয় বিদ্যার বাতিঘর হিসেবে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে দেশের প্রতিটি প্রান্তে ।

কিন্তু শিক্ষিত মানুষের বৃদ্ধি হারের সাথে বৃদ্ধি পায়নি উপযোগী কর্মসংস্হান। সৃষ্টি করেছে বিশাল শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীর।

২০১৯ সালে সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ ( বিআইডিএস)  এক গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বেকার সমস্যার বর্তমান চিত্র তুলে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকারত্বের হার প্রায় ৩৭ শতাংশ ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী বেকারত্বের হার ৩৪ শতাংশ।

অন্যদিকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাস বেকারত্বের হার ৩০ এর নিচে অবস্থান করছে। বিআইডিএসের গবেষণায় আরো বলা হয়েছে, দেশের মাধ্যমিক থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী তরুণদের ৩৩•৩২ শতাংশ  পুরোপুরি বেকার।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস)সর্বশেষ শ্রমশক্তি  জরিপ (২০১৬-১৭) অনুযায়ী বাংলাদেশে তখন ২৬ লাখ ৭৭ হাজার বেকার লোক ছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো,  যারা যত বেশি উচ্চ শিক্ষিত তারা তত বেশি বেকার। জরিপ অনুযায়ী ১০ লাখ  ৪৩ হাজার তরুণ প্রজন্মের মানুষ মাধ্যমিক থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেও বেকার। অন্যদিকে, যারা তেমন পড়াশোনা করতে পারেননি তারাই সবচেয়ে কম বেকার।  এজন্য প্রধান দায়ী করা হয়  আমাদের দেশের দুর্বল শিক্ষাব্যবস্হাকে।

শিক্ষাব্যবস্হার মানহীনতার জন্য শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না। দেশে এতগুলো  বিশ্ববিদ্যালয় থাকা সত্বেও মানসম্মত উচ্চ শিক্ষা প্রদান করা যাচ্ছে না।

দেশের শিক্ষা হার বেড়েছে এটা যেমন আনন্দের সংবাদ। অন্যদিকে, দেশের এক তৃতীয়াংশ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী যখন বেকার, তখন এ আনন্দ বিষাদে রূপান্তরিত হয়ে যায়। শিক্ষা মূল উদ্দেশ্য তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ জনসম্পদে রুপান্তর করা। রাষ্ট্র ও পরিবার প্রতিবছর বিপুল পরিমাণে বিনিয়োগ করে থাকে এ শিক্ষা খাতে। কিন্তু বাস্তবে এক তৃতীয়াংশ শিক্ষিত তরুণ যদি বেকার থাকে, তখন তা দেশ ও জাতির জন্য অশনিসংকেত।

শিক্ষিত বেকারদের নিয়ে ভাবার সময় এসেছে গেছে আজ। দিন পর দিন বেকারত্বের অভিশাপে জর্জরিত শিক্ষিত বেকারদের জীবন বর্তমানে এমন পর্যায় এসে দাঁড়িয়েছে যে, পরিবার ও সমাজে তাদেরকে আজ বোঝা হিসেবে দেখা হয়। হতাশা, দুশ্চিন্তা ও পারিবারিক অশান্তির কারণে  অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছে শিক্ষিত বেকাররা। তাদের মধ্যে  আত্মহত্যা প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। 

পাশাপাশি  দুর্নীতির মাধ্যমে চাকরি  নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে আশংকাজনক হারে। একটি সরকারি চাকুরি লাভের আশায় দিনের পর দিন সাধনা করে যাচ্ছে দেশের লাখো উচ্চ শিক্ষিত তরুণ। অনেকের বিয়ে বয়স পেরিয়ে যায় কিন্তু ভালো কর্মসংস্হানের অভাবে বিয়ে করতে  পারছেনা।

জিডিপির আকার বাড়ছে প্রতিবছর কিন্তু বাড়েনি কর্মসংস্হানের সুযোগ।তরুণ  বেকার সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে সবধরনের ব্যবসায়ী সুযোগ ( স্টার্টআপ) এর জন্য  যে বরাদ্দ রয়েছে, সে তুলনায়  বেকার সংখ্যা অনেক। সরকারি উচ্চমহলের  তরুণ প্রজন্মের বেকার সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে যুগোপযোগী সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় দেশের লাখো তরুণ বেকার। 

তরুণ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা, সরকার   বেকার সমস্যা সমাধানের জন্য কম সুদে ব্যাংক ঋণ,  কারিগরি সহায়তা, উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য পরামর্শ সেবামূলক কার্যক্রমে বরাদ্দ বাড়াবে । 

প্রযুক্তি ও কারিগরি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো জন্য প্রণোদনা দেওয়া উচিত। যাতে, দেশীয় ও বিদেশী বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন নতুন কর্মসংস্হানের সুযোগ বৃদ্ধি পায়। কৃষিখাতে গ্রামীণ শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মকে সংযুক্ত করা যায় কিনা, সে বিষয়ে ভাবতে হবে সরকারি নীতিনির্ধারকদের।

পাশাপাশি দেশে বিদেশি জনশক্তিদের চাকরির সুযোগ না দিয়ে দেশীয় বেকারদের সেসব চাকরির সুযোগের সৃষ্টির জন্য কার্যকারী আইন প্রণয়নের দাবি সবার।

প্রজন্মনিউজ২৪/ফাহাদ  হোসেন  হৃদয়

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন





ব্রেকিং নিউজ