মহামারি ও রবীন্দ্রনাথ

প্রকাশিত: ০৮ মে, ২০২০ ০৩:২৪:৩০

১৯১১ সালের ভারতবর্ষ। কলকাতাসহ নানা জায়গায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে প্লেগ। চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছে অগণিত মানুষ। অসহায় মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসতে প্লেগের হাসপাতাল তৈরির সিদ্ধান্ত নিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর এই উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত হলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ভগিনী নিবেদিতা। হঠাৎ ১৩৯ নম্বর ধর্মতলা স্ট্রিট থেকে একটি চিঠি এল। এই ঠিকানায় ববিবাবুর পরিচিত কেউ থাকে না। তবে চিঠি খুলে তিনি দেখলেন, সেটি লিখেছেন অকৃত্রিম সুহৃদ বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু। চিঠিতে তিনি লিখেছেন: ‘উপরের ঠিকানা হইতে বুঝিতে পারিয়াছেন যে, আমি পলাতক প্লেগের অনুগ্রহে। আমার একজন ভৃত্য ছুটি লইয়া একদিন বড়বাজার গিয়াছিল। সেখান হইতে আসিয়া একদিন পরেই প্লেগ হয়। আর ৩০ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু। বাড়ি ছাড়িয়া উক্ত ঠিকানায় আছি। কতদিন পলায়ন চলিবে জানি না।’


জীবদ্দশায় ম্যালেরিয়া, গুটিবসন্ত, প্লেগের মতো প্রাণঘাতী বিপর্যয় প্রত্যক্ষ করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর সাহিত্যকর্মে এসব মহামারির জীবন্ত চিত্র ফুটে উঠেছে।

গত শতাব্দীর প্রারম্ভে গুটিবসন্তে ভারতবর্ষে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে গেছে। এই মহামারিতে প্রাণ হারায় অগণিত মানুষ। রবীন্দ্রনাথের ‘অভিসার’ কবিতায় রাজনর্তকী বাসবদত্তা গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়েছিল। কবির ভাষায়, ‘নিদারুণ রোগে মারীগুটিকায় ভরে গেছে তার অঙ্গ/রোগমসী-ঢালা কালি তনু তার/লয়ে প্রজাগণে পুরপরিখার/বাহিরে ফেলেছে করি পরিহার বিষাক্ত তার সঙ্গ।’ সন্ন্যাসী উপগুপ্ত এই দুঃসময়ে সেবা করে বাসবদত্তার প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। ‘পুরাতন ভৃত্য’ কবিতায় পুরাতন ভৃত্য কেষ্টার মৃত্যুও হয়েছিল গুটিবসন্তে আক্রান্ত মনিবকে মনপ্রাণ দিয়ে সেবাযত্নের মাধ্যমে সুস্থ করে তোলার পর। চতুরঙ্গ উপন্যাসের জ্যাঠামশাই প্রতিবেশীদের কাছে পরিচিতি পেয়েছিলেন ‘নাস্তিক’ হিসেবে। যখন প্লেগের আক্রমণে সবাই দিশেহারা হয়ে নিরাপদ স্থানে পালাচ্ছে, তখন তিনি দায়িত্ব নিলেন অসহায় চামারদের নিরাপত্তা বিধানের। নিজের বাড়িতে প্লেগ রোগীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল স্থাপন করলেন। মুসলমান ও গরিব রোগীদের সেবা করতে করতে নিজেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। 

প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারায় অবনীন্দ্রনাথের শিশুকন্যা। অসংখ্য পরিবারে তখন মৃত্যুর আওয়াজ। হননের কালে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, ‘...ম্যালেরিয়া-প্লেগ-দুর্ভিক্ষ কেবল উপলক্ষমাত্র, তাহারা বাহ্য লক্ষণমাত্র—মূল ব্যাধি দেশের মজ্জার মধ্যে প্রবেশ করিয়াছে। আমরা এতদিন একভাবে চলিয়া আসিতেছিলাম আমাদের হাটে বাটে গ্রামে পল্লীতে আমরা একভাবে বাঁচিবার ব্যবস্থা করিয়াছিলাম, আমাদের সে ব্যবস্থা বহুকালের পুরাতন। তাহার পরে বাহিরের সংঘাতে আমাদের অবস্থান্তর ঘটিয়াছে। এই নতুন অবস্থার সহিত এখনো আমরা সম্পূর্ণ আপস করিয়া লইতে পারি নাই; এক জায়গায় মিলাইয়া লইতে গিয়া আর এক জায়গায় অঘটন ঘটিতেছে। যদি এই নতুনের সহিত আমরা কোনোদিন সামঞ্জস্য করিয়া লইতে না পারি তবে আমাদিগকে মরিতেই হইবে।’

 

করোনা বিপর্যয় আমাদের সম্পূর্ণ নতুন পরিস্থিতির সম্মুখীন করেছে। মানুষ সামাজিক জীব। সংঘবদ্ধতাই মানুষের ধর্ম। অথচ সামাজিক দূরত্ব তথা বিচ্ছিন্নতাই এ সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিজের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে, সর্বোপরি ধরণির স্বার্থে এই নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে আমাদের সামঞ্জস্যবিধান করতেই হবে। ‘যদি এই নতুনের সহিত আমরা কোনোদিন সামঞ্জস্য করিয়া লইতে না পারি তবে আমাদিগকে মরিতেই হইবে’—রবীন্দ্রনাথের এই সাবধানবাণী কাকতালীয়ভাবে বর্তমান মহামারির সময়ে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

projonmonews24/maruf

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ