করোনার চেয়েও ভয়ঙ্কর গার্মেন্টস মালিক সিন্ডিকেট

প্রকাশিত: ০৯ এপ্রিল, ২০২০ ১১:৫৭:৩৪

আজ কত তারিখ, বার কী? জানতে হয়। নিজ থেকে আর মনে থাকে না। করোনাভাইরাসের ভয়াবহতার মুখে নিস্তব্ধ অসহায় পৃথিবীর সন্তান আমরা এখন। গোটা মানবজাতিই করোনার তাণ্ডবলীলায় মর্মান্তিক মৃত্যুর ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে। কিয়ামতের এমন আজাব অতীতে দেখেনি পৃথিবী। এমন অসহায় কোনো বিশ্বযুদ্ধেও হয়নি। মানবজাতি আজ বিষাদগ্রস্ত হৃদয়ে, লাশের মিছিলের সামনে অচল পৃথিবীর লকডাউনে এক মোহনায় মিলিত। বাকরুদ্ধ মানুষের নিঃশব্দ আর্তনাদে এমন ভারী দমবন্ধ পরিবেশ দুনিয়ায় কখনো নামেনি। এত দিন আমরা পৃথিবীজুড়ে করোনাভাইরাসের বিভীষিকা দেখেছি। দেখেছি হাশরের ময়দানের মতো কেউ কারও নয় নিয়তির এমন বিধানে। এমন হৃদয়বিদারক মৃত্যু যে মা সন্তান থেকে ছিটকে পড়ে, পিতা-কন্যার কাছ থেকে, আর প্রিয়জন প্রিয়জন থেকে। একজন আক্রান্ত হলে গোটা পরিবার আইসোলেশনে, এলাকা হাসপাতাল লকডাউন হয়ে যায়! মৃতের শরীর ভাইরাস ছড়ায় না, তবু লাশের গোসল নেই, জানাজায় লোক নেই। ভয়ের ত্রাস।

এই মৃত্যুর থাবাকে ক্ষমতাবান কে বিত্তবান কে ইমাম কে ধর্মযাজক কে পুরোহিত কে রাষ্ট্রনায়ক কে- দেখে না। তাবৎ পৃথিবীর মানুষকে এক কাতারে এনে নামিয়েছে। শত শত বছরের চিকিৎসা, বিজ্ঞান গবেষণা জ্ঞানের গরিমা, ক্ষমতার দম্ভকে অসার করে দিয়েছে। ভেঙে চুরমার করেছে। প্রতাপশালী হোয়াইট হাউস থেকে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট হয়ে পৃথিবীর সব ক্ষমতার ঘর অসহায়। এখনো ঘর্মাক্ত শোকার্ত আতঙ্কিত বিষণ্ণ দুনিয়া একটা ভ্যাকসিন বা ক্যাপসুল বের করেনি! হয়তো শেষ পর্যন্ত মানবজাতি জয়ী হবে আবিষ্কারে কিন্তু তত দিনে ধ্বংসলীলায় মানুষের লাশের পাহাড় আর আতঙ্কিত ভয়ার্ত দমবন্ধ জীবনের দীর্ঘশ্বাসে লেখা হবে এক মানবসভ্যতা মহাবিপর্যয়ের করুণ ইতিহাস। যেখানে যুদ্ধবাজ হিংস্র শক্তির উন্মত্ততা লজ্জাগ্লানিতে চাপা পড়ে যাবে। প্রতাপশালীদের নাম লেখা হবে মৃতদের আত্মার অভিশাপে।

আমরা এত দিন চীনের আর্তনাদ শুনেছি। ধর্মান্ধরা নির্বোধের মতো বলেছে, আল্লাহর গজব নেমেছে মুসলমানদের ওপর নাস্তিক রাষ্ট্রের নির্যাতনে। ভেবেছেন তারা সবাই নিরাপদ। যারা সজাগ সতর্ক হয়েছিল, নেপালের মতো দেশও পাশে থেকে নিরাপদ হয়েছে সেদিন বিমানবন্দর লকডাউন করে। চীনে নিয়ন্ত্রণে এলেও আক্রান্ত ইতালির মর্মান্তিক মৃত্যুযন্ত্রণা আর লাশের দীর্ঘ মিছিল দেখেছি, দেখেছি কীভাবে ঘটছে স্পেনে আর যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহতা। চিকিৎসাব্যবস্থা ভেঙে পড়ে চিরচঞ্চল পৃথিবীর বাণিজ্যিক নগরী নিউইয়র্ক নীরব নিস্তব্ধ ভুতুড়ে নগরী হয়ে আর্তনাদে সবার বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে।

ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, আমেরিকা হয়ে এশিয়া এখন আক্রান্ত। এখন আমরা আমাদের মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগের, স্বজনদের মর্মান্তিক পরিণতির আশঙ্কায় গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ডুবছি। আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী যিনি সেদিনও ছিলেন উদাসীন সোমবার বলছেন, আগামী ৩০ দিন ভয়ঙ্কর! আমাদের এখানেও আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। আমরা বারবার তাগিদ দিয়েছি সচেতন করতে, কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে। আমরা তো সময়ের কান্না সময়ে শুনিনি, দেখিনি ভাবিওনি! আমরা করোনা আক্রান্ত ইতালিফেরত বিদেশিদের জন্য বিমানবন্দর উন্মুক্ত করে দিয়েছি। তাদের পরীক্ষার ব্যবস্থা করিনি। প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করিনি। একদল মন্ত্রীর অতিকথনে অতিষ্ঠ হয়েছি। তাদের নিয়ে কৌতুক করেছে মানুষ। তাদের দায়িত্বহীন ভাঁড়ামিতে বিরক্ত হয়েছে। এখন দেখলেই গা-জ্বালা করে।

ইতালিফেরতদের মাধ্যমে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যু নিশ্চিত হলেও আমরা লকডাউনে যেতে পারিনি। চীন থেকে আমাদের ছাত্রছাত্রীদের আনার পর বলা হলো, বন্ধ করে দেওয়া হবে। হলো না। কত কিছুর রপ্তানি! ডলারের লোভে আকাশপথ খোলা রাখা হলো। ক্ষমতাবানদের তদবিরে সর্বনাশ হলো, আবার পরীক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে বড় বড় কথা শোনানো হলো।

সময় অনেকটা চলে গেলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রনায়কের মতো সরকারি ছুটিসহ নানা পদক্ষেপ নিলেন। জাতির পিতার জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠান, স্বাধীনতা দিবসের কর্মসূচি সব বাতিল করলেন।

আস্তে সব যোগাযোগ বন্ধ করে, গরিবের ঘরে খাবার পাঠানোর ব্যবস্থা করে কার্যত লকডাউনের পথই নিলেন। সেনাবাহিনীকেও নামানো হলো প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে। চিকিৎসকদের সরঞ্জাম নেই, প্রস্তুতি কর্মশালা, সুসংগঠিত পরিকল্পনা কিছুই নেই। তাও মেরামত হলো। সবাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নামলেন। সামাজিক দূরত্ব, কোয়ারেন্টাইন বা সঙ্গরোধ ও গৃহবন্দী করতে চেষ্টা চালানো হলো। আমাদের জনগণেরও খাসলত কোয়ারেন্টাইন শুনলে ভিড় করে! করোনা আক্রান্ত শুনলে ভিড় বাড়ায়, জমায়েত হয়! এমন উৎসুক জনতা পৃথিবীর কোথাও নেই। মসজিদে জামাতে নামাজে ঢল, পুণ্যস্নানে ঢল! আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর হলে আমরা সমালোচনা করি। এতে তারা শিথিল হলে পেয়ে বসি। নগরে মানুষ বের হতে থাকে, শহরে গ্রামে হাটবাজারে সমাগম আড্ডাবাজি বেড়ে যায়, সামাজিক সঙ্গরোধ নিষেধাজ্ঞা অকার্যকর হতে থাকে। অন্যদিকে দেশে ভয়ের ছায়ায় মানুষের চিকিৎসাও মেলে না। গাইবান্ধায় গর্ভবতী মা হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে ঠাঁই পান না। বাইরেই সন্তানের জন্ম দেন।

চিকিৎসকের ভয়, রোগীর ভয়। দেশে দেশে চিকিৎসকও কম মারা যাননি। সেবা দিতে দিতে ইউরোপ, আমেরিকায় ক্লান্ত চিকিৎসক-নার্সেরা। সবখানে অচলাবস্থা। এখানেও চিকিৎসক আক্রান্ত হয়েছেন। আমাদের দেশে চিকিৎসাব্যবস্থা সুসংগঠিত নয়। চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট, কর্মী সবার সরঞ্জাম দিয়ে স্বাস্থ্যসেবায় প্রণোদনা দরকার। করোনাযুদ্ধে মারা গেলে পরিবারের দায় রাষ্ট্রের নেওয়ার ব্যবস্থা অনিবার্য। চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীদেরও জীবনের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার সাহস দেখাতে হবে। আল্লাহর পরে রোগীর কাছে চিকিৎসক-নার্স কর্মীরা। এর চেয়ে নিবিড় মানবসেবা আর কোনো পেশায় নেই। আমেরিকায় যেখানে চিকিৎসক সংকট আমাদের সেখানে কত করুণ অবস্থা! তবু এ যুদ্ধে আজ মানুষও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের দুয়ারে খাবার দিতে নেমেছে। দেশের ব্যবসায়ীরাও প্রধানমন্ত্রীর পাশে দাঁড়াতে শুরু করেছেন। বসুন্ধরা গ্রুপ নগদ অর্থই দেয়নি, ৫ হাজার বেডের হাসপাতাল করার ব্যবস্থাই করে দেয়নি, মাস্ক, খাদ্য মানুষ ও প্রশাসনের দুয়ারে পৌঁছে দিচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, জনগণের পাশে আছেন, মনিটর করছেন। তিনিই ঐক্যবদ্ধ জাতিকে সাহস ও দক্ষতার সঙ্গে গভীর দেশপ্রেমে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার পাশে তিনি ছাড়া কোনো ক্রাইসিস ম্যানেজারও নেই। কয়েক মন্ত্রী রীতিমতো বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী প্রথমেই ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ দেন গার্মেন্ট খাতের জন্য। সে সময় সরকারি ছুটি ঘোষণা করতেই সামাজিক দূরত্ব না মেনেই ঈদের ছুটির মতো সব পথেই ব্যাপক ভিড় ঠাসাঠাসি অবস্থায় সবাই ছোটেন গ্রামের বাড়িতে। ঢাকা ফাঁকা হয়ে যায়। তবু ঠিক ছিল এক জায়গায় চলে গেল। যার যার মতো কোয়ারেন্টাইনে যেতে পারবে।

প্রজন্মনিউজ২৪/সবুজ

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন