নাজাসাত বা অপবিত্রতার পরিচয়, প্রকার ও জরুরি কিছু মাসয়ালা

প্রকাশিত: ২৬ জানুয়ারী, ২০১৮ ১১:৫৯:০০

নাজাসাত বা অপবিত্রতার পরিচয়, প্রকার ও জরুরি কিছু মাসয়ালা

মো:হামিদুর রহমান/প্রজন্ম নিউজ২৪ : নবুয়তের মর্যাদায় ভূষিত হবার পর নবীর দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করার জন্যে নবী মুস্তফা (সা.) এর উপর প্রথমে যে অহী নাযিল হয় তাতে তৌহিদের শিক্ষার পরই এ নির্দেশ দেয়া হয় যে, পরিপূর্ণ পরিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা (তাহারাত) অবলম্বন করতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন, নিজেকে পাক পবিত্র ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন। [মুদ্দাসসির- ৪]

সিয়াব বলতে শুধুমাত্র পোশাক-পরিচ্ছদ বুঝানো হয়নি। বরঞ্চ শরীর, পোশাক, মন-মস্তিস্ক মোট কথা সমগ্র ব্যক্তিসত্তাকে বুঝানো হয়েছে। আরবী ভাষায় “সাওবুন ত্বহীরুন”  ঐ ব্যক্তিকে বলা হয় যে সকল ক্রটি-বিচ্যুতি ও মলিনতার উর্দ্ধে। কুরআনের নির্দেশের মর্ম এই যে, স্বীয় পোশাক, শরীর ও মন-মস্তিস্কের মলিনতার অর্থ শির্ক কুফরের ভ্রন্ত মতবাদ ও চিন্তাধারা এবং চরিত্রের উপর তার প্রতিফলন। শরীর ও পোশাক পরিচ্ছদের মলিনতার অর্থ এমন অপবিত্রতা ও অশুচিতা যা অনুভব করা যায় এবং রুচিপ্রকৃতির কাছে ঘৃণ্য। অতপর শরীয়তও যার অপবিত্র (নাপাক) হওয়ার ঘোষণা করেছে।

পবিত্রতার এ গুরুত্বকে সামনে রেখে কুরআন পাক স্থানে স্থনে এর জন্যে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে। কুরআনের দুইটি স্থনে আল্লাহ তায়ালা  ইরশাদ করেন যে, যারা পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করে তারা তাঁর প্রিয়া বান্দাহ। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, যারা পাকসাফ এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকে, আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন। [তওবা: ১০৮]

পবিত্র কুরআনে আরো ইরশাদ হয়েছে, যারা বার বার তওবা করে এবং পাক-পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন থাকে, আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন। [বাকারা: ২২২]

নবী পাক (সা.)  স্বয়ং পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার অতুলনীয় দৃষ্টান্ত ছিলেন। উম্মতকে তিনি পবিত্রতা-পরিচ্ছন্নতার জন্যে বিশেষভাবে তাগীদ করেছেন এবং বিভিন্নভাবে তার গুরুত্ব বর্ণনা করে পাকসাফ থাকার জন্যে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন, পবিত্রতা-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অর্ধেক। অতপর তিনি বিস্তারিতভাবে ও সুস্পষ্টরূপে তার হুকুম-আহকাম ও পন্থা বলে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, তিনি স্বয়ং তাঁর বাস্তব জীবনে তা কার্যকর করে তাঁর অনুসারীদেরকে বুঝাবার এবং হৃদয়ংগম করার হক আদায় করেছেন।

অতএব প্রতিটি মুসলমানের অপরিহার্য কর্তব্য হচ্ছে তাঁর সে সব মূল্যবান নির্দেশ মেনে নেয়া স্মরণ রাখা এবং তদনুযায়ী নিজের যাহের ও বাতেনকে (বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ দিক) পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন রাখা। মন ও মস্তিস্ককে ভ্রন্ত মতবাদ ও চিন্তধারা এবং শির্ক ও কুফরের আকীদাহ-বিশ্বাস থেকে পবিত্র রাখা, নিজের শরীর, পোশাক ও তৎসংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়গুলোকেও সকল প্রকার অপবিত্রতা ও মলিনতা থেকে পাক রাখাও প্রত্যেকের অপরিহার্য কর্তব্য। শির্ক কুফরের আকীদাহ-বিশ্বাসসমূহ পূর্ববর্তী অধ্যায়ে বর্ণনা করা হয়েছে। পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলোতে প্রকাশ্যে নাজাসাতগুলোর (নাপাকীর) হুকুম বর্ণনা করা হচ্ছে।

নাজাসাত বা অপবিত্রতার বর্ণনা : নাজাসাতের  অর্থ হচ্ছে মলিনতা, অশুচিতা ও অপবিত্রতা। এ হলো তাহারাত বা পবিত্রতার বিপরীত। তাহারাতের মর্ম পন্থা-পদ্ধতি, হুকুম-আহকাম এবং মাসয়ালা জানার জন্যে প্রথমে প্রয়োজন হচ্ছে যে, নাজাসাতের মর্ম, তার প্রকারভেদ এবং তা পাক করার নিয়মপদ্ধতি জেজে নিতে হবে। এ জন্যে প্রথমেই নাজাসাতের হুকুমগুলো ও সে সম্পর্কিত মাসয়ালাগুলো বর্ণনা করা হচ্ছে। [এসো ফিকাহ শিখি, লেখক: আবু তাহের মিসবাহ]

নাজাসাতের প্রকারভেদ : নাজাসাত দুই প্রকারের। নাজাসাতে হাকিকী ও নাজাসাতে হুকমী। উভয়ের হুকুম আহকাম ও মাসয়ালা পৃথক পৃথক। পবিত্রতা অর্জন করার জন্যে তার হুকুম ও মাসয়ালাগুলো ভালো করে বুঝেসুঝে তা মনে রাখা অত্যন্ত জুরুরী।

কিছু নাজাসাতে হাকিকী : ঐ সব জিনিসকে নাজাসাতে গালিযা বলা হয় যাদের নাপাক হওয়া সম্পর্কে কোন প্রশ্নই থাকতে পারে না। মানুষের স্বভাব প্রকৃতি গুলোকে ঘৃণা করে এবং শরীয়ত সেগুলোকে নাপাক বলে ঘোষণা করে। এ সবের অপবিত্রতা অসুচিত্রা খুব তীব্রভাবে অনুভূত হয় এবং সে জন্যে শরীয়তে এ সবের জন্যে কঠোর নির্দেশ রয়েছে। নিম্নে নাজাসাতে গালিযার কিছু বর্ণনা করা হচ্ছে।

কিছু নাজাসাতে হাকিকী :
প্রথম: শূকর। তার প্রতিটি বস্তুই নাজাসাতে গালযা। সে জীবিত হোক অথবা মৃত।
দ্বিতীয়: মানুষের পেশাব, পায়খানা, বীর্য, প্রশ্রাবের দ্বার দিয়ে নির্গত যে কোন তরল বস্তু, সকল পশুর বীর্য এবং ছোট ছেলেমেয়েদের পেশাব-পায়খানা।
তৃতীয়: মানুষ অথবা পশুর রক্ত।
চতুর্থ: বমি যে কোন বয়সের মানুষের হোক।
পঞ্চম: মেয়েদের প্রস্রাবের দ্বার দিয়ে নির্গত রক্ত।
ষষ্ঠ: মেয়েদের প্রস্রাবের দ্বার দিয়ে নির্গত কোন তরল পদার্থ।
সপ্তম: ক্ষতস্থান থেকে নির্গত পূঁজ, রস অথবা অন্য কোন তরর পদার্থ।
অষ্টম: যে সব পশুর ঝুটা নাপাক তাদের ঘাম ও লালা।
নবম: যবেহ করা ব্যতীত যে সব পশু মারা গেছে তাদের গোশত, চর্বি ইত্যাদি এবং চামড়া নাজাসাতে গালিযা। অবশ্য চামড়া দাবাগাত (tanning) করা হলে তা পাক। ঠিক তেমনি যার মধ্যে রক্ত চলাচল করে না যেমন শিং দাঁত ক্ষুর ইত্যাদি পাক।
দশম: হারাম পশুর-জীবিত অথবা মৃত-দুধ এবং মৃত পশুর (হালাল অথবা হারাম) দুধ।

[ আসান ফিকাহ, লেখক: মাওলানা ইউসুফ ইসলাহী]
নাজাসাতে খফিফা : ঐ সব জিনিস নাজাসাতে খফিফা যার মায়লা কিছুটা হালাকা। শরীয়তের কোন কোন দলিল-প্রমাণ থেকে তাদের পাক হওয়ার সন্দেহ হয়। এ জন্যে শরীয়তে তাদের সম্পর্কে হুকুমও কিছুটা লঘু। নিম্নে এমন সব জিনিসের নাম করা হচ্ছে যাদের নাজাসাত নাজাসাতে খফিফা ।

নাজাসাতে খফিফা :
প্রথম: হালাল পশুর পেশাব, যেমন গরু, মহিষ, ছাগল ইত্যাদি।
দ্বিতীয়: ঘোড়ার পেশাব।
তৃতীয়: হারাম পাখীর মল, যেমন কাক, চিল, বাজ প্রভৃতি। অবশ্যি বাদুরের পেশাব-পায়খানা পাক।

চতুর্থ: হালাল পাখীর পায়খানা যদি দুর্গন্ধযুক্ত হয়।

পঞ্চম: নাজাসাতে খফিফা যদি নাজাসাতে গালিযার সাথে মিশে যায় তা গলিযার পরিমাণ যতোই কম হোক না কেন, তথাপি সব নাজাসাতে গালিযা হয়ে যাবে।

হেদায়া বাংলা, অনুবাদক: আবু তাহের মিসবাহ]

নাজাসাতে হাকিকী থেকে পাক করার পদ্ধতি : নাপাক হওয়ার জিনিসগুলো যেমন বিভিন্ন ধরনের তেমনি তা থেকে পাক হওয়ার পদ্ধতিও বিভিন্ন, যেমন কতকগুলো জিনিস স্থির থাকে। কতকগুলো হালকা এবং বয়ে যায়। কতকগুলো আর্দ্রতায় শুকে যায়। কতকগুলো শুকায় না অথবা অল্পমাত্রায় শুকায়। কতকগুলো ময়লা নিঃশেষ হয়ে যায়। আবার  কতকগুলো হয় না। সে জন্যে তাদের পাক করার নিয়ম-পদ্ধতি ভালো করে বুঝে নিতে হবে।

জমাট জিনিস পাক করার নিয়ম : জমাট হওয়া ঘি, চর্বি অথবা মধু যদি নাপাক হয়, তাহলে নাপাক অংশটুকু বাদ দিলেই পাক হয়ে যাবে।  সানা আটা অথবা শুকনো আটা নাপাক হয়ে গেলে আপাক অংশ তুলে ফেললেই বাকীটা পাক হয়ে যাবে। যেমন সানা আটার উপরে কুকুরে মুখ দিয়েছে, তাহলে সে অংশটুকু ফেলে দিলেই পাক হয়ে যাবে অথবা শুকনো আটায় যদি মুখ দেয় তাহলে তার মুখের লালা যতখানিতে লেগেছে বলে মনে হবে ততখানি আলাদা করে দিলে বাকীটুকু পাক হয়ে যাবে। সাবানে যদি কোন নাপাক লাগে তাহলে নাপাক অংশ কেটে ফেললেই বাকী অংশ পাক থাকবে।

চামড়া পাক করার নিয়ম : দাবাগত (পাকা) করার পর প্রত্যেক চামড়া পাক হয়ে যায়। সে চামড়া হালাল পশুর হোক অথবা হারাম পশুর। হিংস্র পশুর হোক অথবা তৃণভোজী পশুর। কিন্তু শূকরের চামড়া কোনক্রমেই পাক হবে না। হালাল পশুর চামড়া যবেহ করার পরই পাক হয়, তা পাক করার জন্যে দাবাগাত করার দরকার হয় না। যদি শুকরের চর্বি অথবা অন্য কোন নাপাক জিনিস দিয়ে চামড়া পাকা করা হয় তাহলে তা তিনবার ধুয়ে ফেললেই পাক হবে। [হেদায়া বাংলা, অনুবাদক: আবু তাহের মিসবাহ]

শরীর পাক করার নিয়ম :
প্রথম: শরীরে নাজাসাতে হাকিকী লাগলে তিনবার ধুলেই পাক হবে। যদি বীর্য লাগে এবং শুকে যায় তাহলে তা তুলে ফেললেই শরীর পাক হবে। বীর্য তরল হলে ধুলে পাক হবে। 
দ্বিতীয়: যদি নাপাক রঙে শরীর বা চুল রাঙানো হয়, তাহলে এতটুকু ধুলে যথেষ্ট হবে যাতে পরিস্কার পানি বেরুতে থাকে। রং তুলে ফেলার দরকার করে না।
তৃতীয়: শরীরে খোদাই করে যদি তার মধ্যে কোন নাপাক জিনিস ভরে দেয়া হয়, তাহলে তিনবার ধুলেই শরীর পাক হবে ঐ নাপাক জিনিস বের করে ফেলার দরকার নেই।
চতুর্থ: যদি ক্ষতের মধ্যে কোন নাপাক জিনিস ঢুকিয়ে দেয়া হয় তারপর ক্ষত ভালো হয়ে গেল, তাহলে ঐ নাপাক জিনিস বের করে ফেলার দরকার নেই। শুধু ধুলেই শরীর পাক হবে। যদি হাড় ভেঙ্গে যায় তার স্থানে যদি নাপাক হাড় বসানো হয়, অথবা ক্ষতস্থান নাপাক জিনিস দিয়ে সিলাই করা হলো, অথবা ভাঙ্গা দাঁত কোন জিনিস দিয়ে জমিয়ে দেয়া হলো- এ সকল অবস্থায় সুস্থ হওয়ার পর তিনবার পানি দিয়ে ধুলেই পাক হয়ে যাবে।
পঞ্চম: শরীরে নাপাক তেল অথবা অন্য কোন তৈলাক্ত কিছু মালিশ করার পর শুধু তিনবার ধুয়ে ফেললেই শরীর পাক হবে। তৈলাক্ততা দূর করার প্রয়োজন নেই।

[আসান ফিকাহ, লেখক: মাওলানা ইউসুফ ইসলাহী]

পাক নাপাকের বিভিন্ন মাসয়ালা :

প্রথম: মাছ, মাছি, মশা, ছারপোকার রক্ত নাপাক নয়। শরীর এবং কাপড়েগ তা লাগলে নাপাক হবে না।

দ্বিতীয়: সতরঞ্চি, চাটাই বা এ ধরণের কোন বিছানার এক অংশ নাপাক এবং বাকী অংশ পাক হলে পাক অংশের উপর নামায পড়া ঠিক হবে।

তৃতীয়: হাত, পা এবং চুলে মেহেদী লাগাবার পর মনে হলো যে মেহেদী নাপাক ছিল। তখন তিন বার ধুয়ে ফেললেই পাক হবে, মেহেদীর রং উঠাবার প্রয়োজন নেই।

চতুর্থ: চোখে সুরমা আথবা কাজল লাগানোর পর জানা গেল যে, এ নাপাক ছিল। এখন তা মুছে ফেলা বা ধুয়ে ফেলা ওয়াজেব নয়। কিন্তু কিছু পরিমাণ যদি প্রবাহিত হয়ে বাহির বেরিয়ে আসে। তা ধুয়ে ফেলতে হবে।
পঞ্চম: কুকুরের লালা নাপাক কিন্তু শরীর নাপাক নয়। কুকুর যদি কারো শরীর অথবা কাপড় ছুয়ে দেয় আর যদি তার গা ভিজাও হয়, তথাপি কাপড় বা শরীর নাপাক হবে না। কিন্তু কুকুরের গায়ে নাপাকী লেগে থাকলে তখন সে ছুলে কাপড় বা শরীর নাপাক হবে।
ষষ্ঠ: এমন মোটা তক্তা যে তা মাঝখানে থেকে ফাঁড়া যাবে তাতে নাজাসাত লাগলে উল্টা দিকের উপর নামায পড়া যাবে।
সপ্তম: মানুষের ঘাম পাক সে মুসলমান হোক অথবা অমুসলমান এবং কোন স্ত্রী লোক হায়েয ও নেফাসের অবস্থায় হোক না কেন তার ঘাম পাক। ঐ ব্যক্তির ঘামও পাক যার গোসলের দরকার।
অষ্টম: নাজাসাত জ্বালায়ে তার ধূয়া দিয়ে কোন কিছু রান্না করলে তা পাক হবে। নাজাসাত থেকে উথিত বাষ্পও পাক।

নবম: মিশক এবং মৃগনাভি পাক।

দশম: ঘুমন্ত অবস্থায় মুখ দিয়ে পানি বের হয়ে যদি শরীর এবং কাপড়েগ লাগে তা পাক থাকবে।

[হেদায়া বাংলা, অনুবাদক: আবু তাহের মিসবাহ]

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন