ক্ষুধা বাড়াচ্ছে শিশু অপরাধ

প্রকাশিত: ০৬ জানুয়ারী, ২০১৮ ০৯:৪৯:৩৭ || পরিবর্তিত: ০৬ জানুয়ারী, ২০১৮ ০৯:৪৯:৩৭

ক্ষুধা বাড়াচ্ছে শিশু অপরাধ

ক্ষুধা শব্দের প্রয়োজন হয় না আলাদা কোনো ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণের। এই অধিকারটি মূল্যের কাছে কখনো কখনো জীবনও তুচ্ছ মনে হয় কমলাপুর রেল স্টেশনের ভাসমান শিশু-কিশোরদের কাছে। এখানের অনেক শিশুই জড়িয়ে পড়ছে অপরাধ চক্রের সঙ্গে। যা ভবিষ্যতের জন্য হুমকি বলে মনে করেন অপরাধ বিজ্ঞানীরা।    

অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া কমলাপুর রেলস্টেশনের এক কিশোর নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানতে গিয়ে বলছিল, কোনো কাজ পেলে খুব আগ্রহের সঙ্গেই সেটা করতে চাই। অনেক সময় দেখা মালিক না করে দেন কিংবা কাজ থাকে না। কাজ না থাকলে কয়দিন আর না খেয়ে থাকা যায় এক সময় বাধ্য হয়েই খারাপ কাজে জড়াতে হয়।

ক্ষুধা, মানে না কোন ন্যায়- অন্যায় বা লাভ-ক্ষতির অংক। খাদ্যের স্বয়ংসম্পূর্ণতার দেশে ,কমলাপুর রেল স্টেশন যেনো বাইরের কোন পৃথিবী। প্ল্যাটফরমে হেটে বেড়ানো ছোট ছোট পায়ের গল্পগুলো এখানে আলাদা।

এক পকেটমার বলছিল, অনেক সময় দেখা যায় কাজ করতে গেলে অনেকেই কাজে নেন না। কিন্তু আমি তো আর না খেয়ে থাকতে পারব না। তাই পেটের জ্বালায় পকেট মারতে হয়।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট (বিআইডিএস) ও ইউনিসেফের ২০০৫ সালের গবেষণা অনুযায়ী দেশে ৯ লাখ ৭৯ হাজার ৭২৮ জন পথশিশু রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা শহরে রয়েছে ৭ লাখ পথশিশু।২০১৭ ডিসেম্বর শেষে দেশে এর সংখ্যা  ১৩ লাখ ছাড়িয়েছে ।আর ২০২৪ সাল নাগাদ এ সংখ্যা দাঁড়াবে ১৬ লাখ ১৫ হাজার ৩৩০ জনে।

অন্য একটি হিসাব মতে, বাংলাদেশে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা এখন প্রায় ৭৯ লাখ। আর এ শিশুদের প্রায় ৪৫ লাখ ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত। এসব শিশু শ্রমিকের মধ্যে ৬৪ লাখ গ্রামাঞ্চলে এবং বাকি ১৫ লাখ শহরে বিভিন্ন পেশায় কাজ করে। পিতা-মাতা, আত্মীয় কিংবা স্বজনহারা শিশুরা জীবন-সংগ্রামে নামে। অচেনা এ শহরে কাজের অভাবে খেয়ে না খেয়ে তাদের রাত কাটে রাস্তার ধারে বা সরকারি স্থাপনার খোলা বারান্দা বা রেললাইনের পাশে। অভিভাবকহীন এসব শিশুর পথচলা শুরু হয়েছে নিজেদের খেয়াল খুশি মত। এভাবে অধিকাংশ শিশু-কিশোর ভুল পথে পা বাড়াচ্ছে নেশা ও চুরি-ছিনতাইসহ অপরাধ জগতের অতল গহ্বরে।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্যমতে, পথশিশুদের ৮৫ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে মাদক সেবন করে। এর মধ্যে ১৯ শতাংশ হেরোইন, ৪৪ শতাংশ ধূমপান, ২৮ শতাংশ বিভিন্ন ট্যাবলেট এবং ৮ শতাংশ ইনজেকশনের মাধ্যমে নেশা করে থাকে। ঢাকা শহরে কমপক্ষে ২২৯টি স্পট রয়েছে, যেখানে ৯ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুরা মাদক সেবন করে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের তথ্যমতে, ঢাকা বিভাগে মাদকাসক্ত শিশুর প্রায় ৩০ শতাংশ ছেলে এবং ১৭ শতাংশ মেয়ে। ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ছেলে ও মেয়েশিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন জানায়, মাদকাসক্ত ৮০ শতাংশ পথশিশু মাত্র সাত বছরের মধ্যে অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক গবেষণা জরিপের মাধ্যমে জানা গেছে, মাদকাসক্ত শিশুদের ড্রাগ গ্রহণ ও বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত ৪৪ শতাংশ পথশিশু, পিকেটিংয়ে জড়িত ৩৫ শতাংশ, ছিনতাই, নেশাদ্রব্য বিক্রয়কারী, আন্ডারগ্রাউন্ড সন্ত্রাসীদের সোর্স এবং অন্যান্য অপরাধে জড়িত ২১ শতাংশ শিশু।

দিন দিন সারা দেশে বাড়ছে এসব পথশিশুর সংখ্যা। তাদের দ্বারা বাড়ছে অপরাধ। সেই সঙ্গে বাড়ছে মাদক সেবনকারীর সংখ্যা। ইউনিসেফ বাংলাদেশে সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুদের কল্যাণে কাজ শুরু করেছে। ঢাকার লালবাগ, সদরঘাট, মোহাম্মদপুর, মহাখালী বাসস্ট্যান্ড, গুলশান, বাড্ডা, মিরপুর ও কারওয়ান বাজার এলাকায় তাদের পরিচালিত স্কুল এদের জীবনমান পরিবর্তনে আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

মৌলিক অধিকারের প্রথম এই প্রয়োজনটি যখন চ্যালেঞ্জের, তখন এই অধিকার আদায়ের নিশ্চয়তা পেতে নানা অপরাধে জড়াচ্ছে এখানকার ভাসমান শিশুরা। অনেকসময় ফেরার উপায় থাকে না তা দৃশ্যমান।

এক কিশোর বলছিল, আমরা একা কেউ এ কাজ করতে পারি না। আমাদের সঙ্গে বড় ভাইয়েরা আছেন। তাদের নির্দেশ মতোই কাজ করতে হয়। বড় অংশটাই তারা নিয়ে নেন। এই পথ ছাড়তে চাইলে নানা হুমকি দেয়া হয়।

এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর বক্তব্যও গতানুগতিক।

রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইয়াছিন ফারুক মজুমদার বলেন, তাদের জন্য কিশোর আদালত রয়েছে। আমরা নিয়মিতভাবে তাদের আটকের পর মামলা ও চার্জশিট দিয়ে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পথশিশু প্রকল্পের পরিচালক ড. আবুল হোসেন বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে তাদের অ্যাগ্রেসিভ না করে ভালো পথে ফিরিয়ে নিয়ে আসা।

অন্যদিকে অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব শিশু কিশোরদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার ক্ষেত্রে সমাজ ও রাষ্ট্রের দুটি প্রতিষ্ঠানেরই দায় রয়েছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন, কিশোর অপরাধ সংশোধন কেন্দ্রগুলোর অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। ওই জায়গা থেকে বের হয়ে আসার পর কে তার মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাবে সেটারও একটা প্রশ্ন থেকে যায়। রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়েরই এ বিষয়ে দায় রয়েছে।

তারপরও এসব শিশু কিশোরদের জন্য শুধু শাস্তি বা সংশোধনের মতো স্বল্প মেয়াদের পরিকল্পনা নয়, সঙ্গে প্রয়োজন স্বাভাবিক জীবনে ফেরার নিশ্চিত সুযোগও।

দেশকে এগিয়ে নিতে গেলে কিংবা ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণ করতে হলে এ পথশিশুদের মূল্যায়ন করতে হবে যত্নসহকারে। তাদের দৈহিক ও মানসিক শক্তির সদ্ব্যবহার করার সুযোগ দিয়ে সমাজের মূল ধারায় তাদের পুনর্বাসিত করতে হবে। সরকারের উচিত পথশিশুদের সম্পর্কে সচেতন হওয়া। প্রতিটি পথশিশুর জন্মনিবন্ধন করা। তবে এসব কাজ করা সরকারের একার পক্ষে হয়তো সম্ভব না, সে ক্ষেত্রে যে সংস্থাগুলো পথশিশুদের নিয়ে কাজ করছে সরকারের উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো। সরকারের পাশাপাশি ওই সংগঠনগুলো যদি সম্মিলিতভাবে কাজ করে এবং এ পথশিশুদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাসহ শিক্ষা, চিকিৎসা, খাদ্য, বস্ত্র ইত্যাদির ব্যবস্থা করে, তাহলে এ পথশিশুদের মধ্য থেকেও আমরা পেতে পারি অনেক ভালো কিছু। পথশিশুদের রক্ষা করা, তাদের উন্নয়নে কাজ করা ঈমানি দায়িত্ব। প্রত্যেকটি শিশুর মাঝে রয়েছে অমিত সম্ভাবনা। এই পথশিশুদের পরিচর্যা করলে তারা বনসাঁই থেকে বটবৃক্ষে পরিণত হবে।

আমাদের স্মরণ রাখতে হবে যে, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব শিশুর রয়েছে সমান অধিকার। সে অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রিয় নবী (সা.) যেমন সদা সজাগ ও সচেতন ছিলেন তেমনি সে আদর্শ অনুসরণে আমাদেরও আন্তরিক হতে হবে এই হোক পথশিশুদের নিয়ে আমাদের অঙ্গীকার।

প্রজন্মনিউজ২৪.কম/মাসফি

 

 

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন