‘বাংলায় ব্রিটিশদের সুপরিকল্পিত গণহত্যা বা মহা-হলোকাস্ট’ কি ও কেন?

প্রকাশিত: ২৩ মার্চ, ২০১৭ ০৭:৩৮:৩৫

একরাম উদ্দীন সুমন

আজকের এই সময়ে বৃটিশদের সাথে এ উপমহাদেশের যোগাযোগ, সহযোগিতা অনেক ভাল। বৃটিশদের মিশনারী কাজ দেখে মনে হয় সবকিছুই মানবতার কল্যাণে। কালো চামড়ার প্রতি তাদের এই সময়ের ভালবাসা প্রশংসানীয়। তবে পৃথিবীর ইতিহাস সত্য ও মিথ্যার দ্বন্দ্বের ইতিহাস। সত্য ইতিহাস হচ্ছে সভ্যতার প্রকৃত দর্পণ। আর প্রকৃত ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়া ছাড়া কোনো জাতি উন্নতি ও অগ্রগতির সোপানগুলো অতিক্রম করতে পারে না। কিন্তু বলা হয় শক্তিমান ও বিজয়ীরাই ইতিহাস লেখে। ভারত উপমহাদেশের বৃহত্তর বাংলায় ১১৭৬ বাংলা সনের তথা ১৭৬৯-৭০ খ্রিস্টাব্দের মহা-দুর্ভিক্ষকে অনেক গবেষকই ব্রিটিশদের পরিকল্পিত গণহত্যা বলে মনে করছেন। সেই থেকে ১৮টি দশক তথা ১৮০ বছর ধরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা বৃহত্তর বাংলা ও ভারতের নানা অঞ্চলে ক্ষুধাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে প্রায় দশ কোটি মানুষকে হত্যা করেছে বলে তারা প্রামাণ্য নানা তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেছেন।

বলা হয় ১৭৬৯ থেকে ১৭৭৩ সালের খরায় নিহত হয়েছিল এক কোটি বাঙ্গালি। বৃহত্তর বাংলার এক তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা কমে যায় এর ফলে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজরা একদল বিশ্বাসঘাতক ও লোভী কর্মকর্তা আর ব্যবসায়ীর সঙ্গে ষড়যন্ত্র পাকিয়ে প্রহসনের এক যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে পরাজিত ও শহীদ করার ৫ বছরের মধ্যেই ঘটানো হয় এই কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ। এ দুর্ভিক্ষে বাংলার মানুষ যখন ক্ষুধার জ্বালায় মরছিল তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তারা লন্ডনে তাদের মনিবদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে জানিয়েছিল যে তারা বাণিজ্য হতে ও বিপুল পরিমাণ খাদ্য রপ্তানি করে সর্বোচ্চ মাত্রার মুনাফা অর্জন করেছে!

এ সময় ইংরেজরা পুতুল সরকার হিসেবে মিরজাফরকে নামেমাত্র নবাবের  পদে রাখলেও রাজস্ব আদায় ও ব্যয়ের পূর্ণ কর্তৃত্ব পায় তাদের কোম্পানি। আর এই সুযোগে কোম্পানির লোকেরা খাজনা আদায়ের নামে অবাধ লুণ্ঠন ও অত্যাচার শুরু করে দেয়। বিপুল অংকের খাজনা পরিশোধ করতে গিয়ে কৃষকরা অর্থহীন ও শস্যহীন হয়ে পড়েছিল। ফলে তাদের চাষাবাদের ক্ষমতা রহিত হয়ে যায়। এ অবস্থায় আগেই সব শস্য বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ার পর খরা দেখা দেয়ায় কৃষকরা সপরিবারে মারা যায় অনাহারে। ব্রিটিশরা বাংলার ক্ষমতা দখলের পর থেকে এ অঞ্চলে ত্রিশ থেকে ৪০টি ছোট-বড় দুর্ভিক্ষ হয়েছে। এসব দুর্ভিক্ষে নিহতের যেসব সংখ্যা ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী শাসকরা উল্লেখ করে গেছে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে। বাংলায় ব্রিটিশ শাসকদের মাধ্যমে সর্বশেষ বড় দুর্ভিক্ষটি ঘটানো হয় ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে। ব্রিটিশদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী এ তিন বছরে কমপক্ষে চার কোটি মানুষ মারা যায় অনাহারে।

১৯৪২ সালের মে মাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে জাপানি সেনারা বার্মা দখল করে নেয়। ওদিকে সুভাস চন্দ্র বসুর নেতৃত্বে স্বাধীনতাকামী ভারতের জাতীয় সেনাদলও পূর্ব দিক থেকে ভারতে হামলা করতে পারে বলে ব্রিটিশ দখলদাররা আশঙ্কা করছিল। এ সময় নিষ্ঠুর ব্রিটিশরা পোড়ামাটির নীতি গ্রহণ করে। এ কূটচাল অনুযায়ী জাপানি সেনারা যাতে খাদ্য পেতে না পারে সে জন্য সব খাদ্য কিনে নেয় ব্রিটিশরা। অনেক ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সেনারা খাদ্য লুট করে ও বহু স্থানীয় অধিবাসীকে হত্যা করে। জাপানিদের হাতে বিতাড়িত ব্রিটিশ সেনারা আশ্রয় নিতে থাকে কোলকাতা ও চট্টগ্রামে। ব্রিটিশ সরকার তাদের জন্য খাদ্য কিনতে থাকায় খাদ্যের দাম আকাশস্পর্শী হয়ে ওঠে।

জাপানি সেনারা যাতে বঙ্গোপসাগরে নৌকা ব্যবহার করতে না পারে সে জন্য জেলেদের প্রায় ৭০ হাজার নৌকা আটক করে ব্রিটিশ সরকার। ফলে একদিকে যেমন মাছ ধরা অসম্ভব হয়ে পড়ে তেমনি ধান ও পাট বাজারে আনাও কৃষকদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে সাধারণ মানুষের অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়ে। বিমানবন্দর, সেনা-ঘাঁটি ও শরণার্থী শিবিরের মত নানা স্থাপনা নির্মাণের জন্য ব্রিটিশরা প্রায় দুই লাখ বাঙ্গালির জমি কেড়ে নেয়। ফলে তারা হয়ে পড়ে গৃহহারা।

ব্রিটিশ সরকার ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে বাংলায় খাদ্য পাঠানোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। জাপানিরা সম্ভাব্য হামলার সময় যাতে খাদ্য না পায় সে জন্য এই বর্বর পদক্ষেপ নেয় দখলদার ব্রিটিশ সরকার। এদিকে ব্রিটিশ সরকার সেনাদের ব্যয়ভার মেটানোর জন্য ব্যাপক পরিমাণ কাগুজে নোট ছাপায়। ফলে দেখা দেয় মুদ্রাস্ফীতি। অন্য কথায় জনগণের কাছে থাকা অর্থের ক্রয়মূল্য কমে যায়। এভাবে দেখা দেয় কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ। কিন্তু দখলদার ব্রিটিশ সরকার তা স্বীকার করেনি এবং জরুরি অবস্থাও ঘোষণা করেনি, ত্রাণ সাহায্য দেয়া তো দূরের কথা।

যুদ্ধের আগে দখলদার ব্রিটিশ সরকার প্রায় দুই কোটি টন খাদ্য কিনেছিল। ৪২-৪৩ সনে রেকর্ড মাত্রায় উদ্বৃত্ত খাদ্য ছিল বলেও ওই সরকার স্বীকার করেছিল। বাংলার শোচনীয় অবস্থার কথা ব্রিটেনের সংসদে তোলা হয়। ফলে ৪৩ ও ৪৪ সনে ভারতে মাত্র প্রায় ৫ লাখ টন খাদ্য পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। অথচ কেবল ৪৩ সনে ব্রিটেনের ৫ কোটি নাগরিকের জন্য কেনা হয়েছিল এক কোটি টন খাদ্য।ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চার্চিল বার বার ভারতে খাদ্য রপ্তানি করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিল।যদিও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে প্রায় ২৫ লাখ ভারতীয় ব্রিটেনের সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়। বলা হয় সেই দুর্ভিক্ষে বাঙালীদের মৃত্যুতে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জেনারেল উইনস্টন চার্চিল উল্লাস করেছিল!

অস্ট্রেলিয়ান প্রাণ-রসায়নবিদ ড. গিদেন পলইয়া তৎকালীন বাংলার ঐ দুর্ভিক্ষকে ‘মানবসৃষ্ট গণহত্যা’ বলে অভিহিত করেছেন। কারণ চার্চিলের নীতিই ঐ দুর্যোগের জন্য দায়ী ছিল। ১৯৪২ সালেও বাংলায় বাম্পার ফলন হয়েছিল। কিন্তু ব্রিটিশরা বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য ভারত থেকে ব্রিটেনে নিয়ে যায়। যার ফলে এখানে ব্যাপক খাদ্যাভাব দেখা যায়।

বর্তমান সময়ের পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, বিহার এবং বাংলাদেশে ঐ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। এই কৃত্রিম দুর্ভিক্ষে অনাহারে ধুকে ধুকে মরতে থাকা মানুষের ছবি এঁকে বিখ্যাত হয়েছিলেন শিল্পী জয়নুল আবেদিন।

মধুশ্রী মুখার্জির লেখায় ঐ দুর্ভিক্ষ-পীড়িত মানুষদের কথা উঠে এসেছে। দুর্ভিক্ষে নিহতদের পরিবার সদস্য এবং দুর্ভিক্ষে বেঁচে যাওয়া মানুষদের জবানিতে ঐ চরম সময়ের কথা উঠে এসেছে।

চার্চিলের ঐ গোপন যুদ্ধ নিয়ে তিনি লিখেন: ‘মা বাবারা তাদের ক্ষুধার্ত ছেলে-মেয়েদেরকে কুয়াতে ও নদীতে ফেলে দিতো। অনেকে ট্রেনের সামনে নিজেকে ফেলে দিয়ে আত্মহত্যা করতো। ক্ষুধার্ত মানুষ ভাতের মাড় চেয়ে ভিক্ষা করতো। শিশুরা পাতা, ফুল, ঘাস এবং বিভিন্ন তৃণমূল খেত। মানুষ এতই দুর্বল ছিল যে তারা তাদের প্রিয়জনদের দাফন পর্যন্ত করতে পারতো না।’

দুর্ভিক্ষে বেঁচে যাওয়া এক ব্যক্তি মুখার্জিকে বলেন, ‘শেষকৃত্য করার মত কারও গায়ে শক্তি ছিল না। বাংলার গ্রামগুলোতে মরদেহের স্তূপ থেকে কুকুর শিয়ালরা তাদের ভুরিভোজ করতো। মায়েরা খুনিতে পরিণত হয়েছিল, গ্রামগুলো হয়ে পড়ে পতিতা-পল্লী। আর বাবারা ছিল কন্যা সন্তান পাচারকারী।’

মনি ভৌমিক নামের একজন বিখ্যাত চিকিৎসাবিদ, সেই দুর্ভিক্ষ নিয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানান, তাকে এক মুঠো খাবার দেয়ার জন্য তার নানী তার অল্প খাবারটুকুও তাকে দিয়ে দিতেন। এতে তিনি না খেয়ে মারা যান।

১৯৪৩ সালে ক্ষুধার্ত মানুষের দল কলকাতায় এসে ভিড় জমায় যাদের বেশিরভাগই রাস্তায় মারা যায়। এরকম ধ্বংসযজ্ঞের মাঝে হৃষ্টপুষ্ট ব্রিটিশ সেনাদের উপস্থিতিকে ‘ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে শেষ রায়’ হিসেবে দেখেন জওয়াহারলাল নেহরু।চার্চিল খুব সহজেই এই দুর্ভিক্ষটি এড়াতে পারত। এমনকি কয়েক জাহাজ খাবার পাঠাইলেই অনেক উপকার হতো। কিন্তু একে একে দুজন ভাইসরয়ের আবেদনকে একগুঁয়েমির সাথে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এমনকি তিনি তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির আবেদনের প্রতিও কর্ণপাত করেননি।

নিষ্ঠুর চার্চিল বাঙালীদেরকে মৃত্যুর মিছিলে রেখে খাদ্য শস্য ব্রিটিশ সেনা ও গ্রিক নাগরিকদের জন্য পাঠাচ্ছিল। তার কাছে ‘ভুখা বাঙালীর না খেয়ে থাকার চেয়ে সবল গ্রিকদের না খেয়ে থাকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।’ তার এই মতকে সমর্থন দিয়েছিল তৎকালীন ‘ভারত ও বার্মা বিষয়ক’ ব্রিটিশ মন্ত্রী লিওপল্ড এমেরি।এমেরি ছিল একজন কড়া উপনিবেশবাদী। তারপরও তিনি চার্চিলের ‘হিটলারের মত মনোভাবের’ নিন্দা করেছিল। চার্চিল শস্য পাঠানোর জন্য এমেরির জরুরি আবেদন এবং তৎকালীন ভাইসরয় আর্চিবাল্ড ওয়াভেল এর প্রার্থনার উত্তর দেয় একটি টেলিগ্রামে। সেখানে চার্চিল লিখেছিল, গান্ধী কেন তখনো মরেন নি! ওয়াভেল লন্ডনকে অবহিত করে যে ঐ দুর্ভিক্ষটা ‘ব্রিটিশ শাসিত অঞ্চলে মানুষের উপর নামা সবচেয়ে বড় দুর্যোগ’। তিনি বলেন, যখন হল্যান্ডে খাদ্যাভাব দেখা দেয় তখন বলা হয় ‘খাদ্য-জাহাজ অবশ্যই সরবরাহ করা হবে। এর উল্টো উত্তরটিই বরাদ্দ থাকে ইন্ডিয়াতে খাবার সরবরাহের বেলায়।’

চার্চিল কি অজুহাতে এখানে খাবার পাঠানোর অনুমতি দেয়নি? বর্তমানে চার্চিলের পরিবারের সদস্য ও তার সমর্থকরা বলার চেষ্টা করেন যে ব্রিটেন জরুরী খাদ্য সরবরাহ কাজে জাহাজগুলোকে নিযুক্ত করতে চাচ্ছিল না। কারণ যুদ্ধের জন্য সব জাহাজ প্রস্তুত রাখতে হয়েছিল। কিন্তু মধুশ্রী মুখার্জির লেখায় সব প্রমাণ বের হয়েছে, সব রহস্য উদঘাটিত হয়েছে যে তখন ঠিকই ব্রিটেনের জাহাজ অস্ট্রেলিয়া থেকে খাদ্য শস্য নিয়ে ইন্ডিয়ার পথ দিয়ে ভূমধ্যসাগরের দিকে রওনা হতো।

ভারতীয়দের প্রতি চার্চিলের বিদ্বেষ একটি জানা ঘটনা। চার্চিল তার ওয়ার কেবিনেট বা যুদ্ধকালীন মন্ত্রীসভার বৈঠকে এই দুর্ভিক্ষের জন্য ইন্ডিয়ানদেরকেই দায়ী করে। ‘এরা খরগোশের মত বাচ্চা পয়দা করে’ -এমন অশালীন মন্তব্যও বের হয়েছে তার মুখ থেকে।ভারতীয়দের প্রতি তার মনোভাব এমেরির কাছে তুলে-ধরা তার বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়। চার্চিল বলেছিল ‘আমি ইন্ডিয়ানদের ঘৃণা করি। তারা একটি জঘন্য ধর্মের জঘন্য মানুষ (বিশ্রী ধর্মের বিশ্রী মানুষ’)’। চার্চিল অন্য এক সময় বলেছিল ‘ভারতীয়রা হচ্ছে জার্মানদের পর সবচেয়ে জঘন্য মানুষ।’

মুখার্জির মতে, ‘ভারতের প্রতি চার্চিলের মনোভাব ছিল একেবারে চরম এবং তিনি ইন্ডিয়ানদেরকে ভীষণ ঘৃণা করতেন। তারা যে আর ইন্ডিয়াকে বেশিদিন নিজেদের করে রাখতে পারছে না -এই অভাব-বোধ থেকেই তার এই তীব্র ঘৃণা জন্মাতে পারে। চার্চিল হাফিংটন পোস্টে লেখেন, অ-শ্বেতাঙ্গ লোকদের পেছনে গম খরচ করা অনেক খরচের ব্যাপার, তাও আবার বিদ্রোহীদের পেছনে যারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছে স্বাধীনতা দাবি করে আসছে। চার্চিল তার সংরক্ষিত খাদ্যশস্য যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয়দের খাওয়ানোকেই শ্রেয় মনে করলেন।’

১৯৪৩ সালের অক্টোবর মাস। তখন দুর্ভিক্ষ চরম সীমায়। ওয়াভেলকে নিয়োগ উপলক্ষে একটি বিশাল ভোজ-উৎসবে চার্চিল বলেছিল, ‘আমরা যখন পেছনের বছরগুলোর দিকে তাকাই তখন দেখতে পাই একটি অঞ্চলে তিন প্রজন্ম পর্যন্ত কোন যুদ্ধ নেই, দুর্ভিক্ষ পালিয়ে গেছে। শুধু সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠিত যুদ্ধ আমাদেরকে সেই পুরনো স্বাদ দিচ্ছে…মহামারি আর নেই..ইন্ডিয়ান ইতিহাসে এই সময়কালটা একটি সোনালী অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে। ব্রিটিশরা তাদেরকে শান্তি দিয়েছিল, শৃঙ্খলা দিয়েছিল এবং দিয়েছিল গরীবদের জন্য ন্যায়বিচার এবং বিদেশী আক্রমণের শঙ্কা থেকে মুক্তি।’!!!

নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এই দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলায় চার্চিলের পলিসি আসলে ভারতের প্রতি ব্রিটিশদের আগের পলিসিরই অনুকরণ। ভিক্টোরিয়া শাসনকালের শেষের দিকে গণহত্যা বিশেষজ্ঞ মাইক ডেভিস দেখান যে ব্রিটিশদের ১২০ বছরের ইতিহাসে ৩১ টি ভয়ানক দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। অথচ ব্রিটিশদের আসার আগের দুই হাজার বছরে ১৭টি দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল।

তার বইয়ে ডেভিস ঐ দুর্ভিক্ষের গল্পগুলো বলছিলেন যেখানে ২৯ মিলিয়ন ইন্ডিয়ান (প্রায় তিন কোটি ইন্ডিয়ান) মারা গিয়েছিল। ঐ লোকগুলো আসলে ব্রিটিশ পলিসির কারণে মারা গিয়েছিল। ১৮৭৬ সালে খরার কারণে যেখানে ডেকান বা দাক্ষিণাত্যের মালভূমিতে কৃষকেরা সর্বস্বান্ত হচ্ছিলেন সে বছর ইন্ডিয়াতে ধান ও গমের নেট উদ্বৃত্ত হয়েছিল। কিন্তু ভাইসরয় রবার্ট বুলওয়ার লিটন জোর দেন যে ইংল্যান্ডে শস্য রপ্তানি করা থেকে কোন কিছুই তাকে বিরত রাখতে পারবে না।

১৮৭৭ ও ১৮৭৮ সালে দুর্ভিক্ষের চরমসীমায় শস্য ব্যবসায়ীরা রেকর্ড পরিমাণ শস্য রপ্তানি করেছিল। যখন কৃষকরা না খেয়ে মরছিল তখন ‘সবধরনের ত্রাণ কাজকে নিরুৎসাহিত করার জন্য’ সরকার থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। যখন লাখ লাখ ইন্ডিয়ান মারা যাচ্ছিল তখন লিটন ভারতীয়দের কষ্ট লাঘবের কোন চেষ্টাই করেনি। বরং ইন্ডিয়ার সম্রাজ্ঞী হিসেবে রাণী ভিক্টোরিয়ার অভিষেক আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এক সপ্তাহব্যাপী ঐ ভোজন উৎসবে ৬৮ হাজার অতিথি আপ্যায়িত হয়েছিল যেখানে রাণী জাতির কাছে ‘সুখ, সমৃদ্ধি ও কল্যাণের’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

১৮৯০’র দিকের দুর্ভিক্ষে প্রায় ১৯ মিলিয়ন ভারতীয় (প্রায় দুই কোটি) মারা গেছে বলে অনুমান দ্য লেনসেট সাময়িকীর। ১৯০১ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই সাময়িকীতে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। মৃত্যুহার এত বেড়ে যাওয়ার পেছনে কারণ ছিল ব্রিটিশরা দুর্ভিক্ষকালীন ত্রাণ বিতরণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।

ডেভিস বলেন, ১৮৭২ থেকে ১৯২১ পর্যন্ত এই সময়কালটিতে ভারতীয়দের গড় আয়ু ২০ শতাংশ কমে এসেছিল। তাই এটা খুব বিস্ময়ের ব্যাপার না যে, হিটলারের প্রিয় সিনেমা ছিল ‘দ্য লাইবস্ অব এ বেঙ্গল ল্যান্সার’ যেখানে দেখানো হয়েছিল গোটা কয়েক ব্রিটিশ কিভাবে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে দাসত্বের শৃঙ্খলে আটকে রেখেছিল। নাৎসি নেতা ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এডওয়ার্ড ওড (আর্ল অব হ্যালিফ্যাক্স) এর সাথে বলেন যে, তার প্রিয় সিনেমা ওটা কারণ ‘এভাবেই একটি উচ্চতর জাতির আচরণ করা উচিত’ এবং এই ছায়াছবি দেখা নাৎসিদের জন্য বাধ্যতামূলক বলা হতো। যেখানে ব্রিটেন অন্যান্য জাতিসমূহের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছে সেখানে ইন্ডিয়া এই গণহত্যার বিষয়টি কার্পেটের তলায় লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। মাও মাও হত্যাকাণ্ডের জন্য কেনিয়ার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছে ব্রিটেন। অন্যান্য জাতিও আমাদের জন্য ভালো উদাহরণ উপস্থাপন করে রেখেছে। যেমন ইহুদিবাদী ইসরাইল কথিত গণহত্যা বা হলোকাস্টের কথা বলে এখনো  মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার আদায় করছে জার্মানির কাছ থেকে এবং তারা জার্মানির কাছ থেকে সামরিক সহায়তাও আদায় করে নিচ্ছে। যদিও অনেকেই মনে করেন যতটা প্রচার করা হয় তার দশ ভাগের একভাগ ইহুদিকেও হত্যা করেনি হিটলারের নাৎসি বাহিনী।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নানকিং এ ৪০ হাজার খুন হয় এবং অসংখ্য নারী ধর্ষিত হয়। এবং তারপর এক মজার ঘটনা ঘটলো ইউক্রেনে। ইউক্রেনিয়ানরা তাদের দেশে দেখা দেয়া দুর্ভিক্ষের পেছনে স্টালিনের অর্থনৈতিক নীতিকে দায়ী করেছেন। এমনকি তারা এর নতুন নামকরণ করেছেন। নামটা হলোকাস্টের অনেক কাছাকাছি ‘হলোদমোর’। উল্লেখ্য ১৯৪৩ সালের দিকে মিত্র বাহিনীর হয়ে ইউরোপ, আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে ২৫ লক্ষ ভারতীয় সেনা যুদ্ধ করেছিল। ব্রিটেনের তেমন কোন খরচ ছাড়া-ই বিশাল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ, কাঁচামাল সরবরাহ করা হয়েছে এখান থেকে। ইউরোপে জাহাজে করে পাঠানোর ক্ষেত্রেও ব্রিটেনের তেমন খরচ করতে হয়নি। ভারতের কাছে ব্রিটেনের যে ঋণ তা দু’দেশের কেউই অবজ্ঞা করতে পারবে না। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক টিম হার্পার ও ক্রিস্টোফার বেইলির মতে, ‘ভারতীয় সেনা, বেসামরিক শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের কল্যাণেই ১৯৪৫ সালের বিজয় সম্ভবপর হয়েছিল। তার মূল্য হচ্ছে খুব দ্রুত ভারতের স্বাধীনতা।’২৫০ বছরের ঔপনিবেশিক লুটপাটের ক্ষতিপূরণের জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ নেই পুরো ইউরোপেও। অর্থের কথা না হয় বাদই দিলাম একটা ক্ষমা প্রার্থনা করার মত সৎ সাহসও কি নাই ব্রিটিশদের? অথবা তারা কি চার্চিলের মত নিজেদেরকে এই আত্মপ্রবঞ্চনা দিয়েই রাখবে যে, ভারতে ইংরেজদের শাসন ছিল একটা ‘স্বর্ণযুগ’ (গোল্ডেন এজ)?

বলা হয় হিটলার লাখ লাখ ইহুদিকে হত্যা করেছিল জাতিগত বিদ্বেষ বা ঘৃণার কারণে। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার কেন কোটি কোটি বাঙালীকে হত্যা করেছিল? ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে যাওয়ার পরও বাংলা ও ভারতে অনেক দুর্ভিক্ষ হয়েছে। কিন্তু এসব দুর্ভিক্ষে যত মানুষ মারা গেছে তার সংখ্যা ব্রিটিশদের সৃষ্ট কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ ও বর্বর আচরণে নিহত মানুষের এক দশমাংশেরও কম হবে।

নবাবদের আমলে, মোঘল শাসনে ও সুলতানি যুগে কখনও এমন নিষ্ঠুরভাবে খাদ্য-শস্যকে গুদামে রেখে সাধারণ জনগণকে হত্যা করেনি কোনো সরকার। ব্রিটিশ শাসকদের এসব অপরাধ মানবজাতির অতীতের সব অপরাধের নৃশংসতাকেও ছাড়িয়ে গেছে। তাই অনেকেই বলেন, মানবতার বিরুদ্ধে সেইসব অপরাধের জন্য ব্রিটিশ শাসকদের বিচার করা উচিত ছিল আন্তর্জাতিক যুদ্ধ-অপরাধ আদালতে ঠিক যেভাবে জার্মান নাৎসিদের বিচার করা হয়েছিল আন্তর্জাতিক যুদ্ধ-অপরাধ আদালতে। আজও নাৎসিদের খুঁজে বেড়ানো হয় বিচার করার জন্য।

বৃহত্তর বাংলায় যে হলোকাস্ট চালিয়েছিল ব্রিটিশ দখলদাররা সে জন্য কি ব্রিটেনের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা কি উচিত নয়? বাঙ্গালী জাতির যদি মান-সম্মানবোধ বলে কিছু থেকে থাকে তাহলে ৪২-৪৩ সনে ক্ষমতায় থাকা চার্চিল ও তার আগে ক্ষমতায় থাকা ব্রিটিশদের সব অপরাধের ক্ষতিপূরণ আদায় করার জন্য তাদের সক্রিয় হতে হবে। সাদা চামড়ার ইহুদিদের হত্যার জন্য যদি জার্মান নাৎসিদের বিচার হতে পারে তাহলে কালো চামড়ার বাঙ্গালীদের ওপর গণহত্যার বিষয়টি কি তাদের জাতীয় ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না? এ নিয়ে কেনো আজও একটি স্মৃতি-স্তম্ভও গড়া হয়নি?

[তথ্যসূত্র: ‘নতুন ঢাকা ডাইজেস্ট’-এ প্রকাশিত ‘ভারতের ভুলে যাওয়া গণহত্যা’, ১১৭৬ সালের মনন্তর (উইকিপিডিয়া) ও Anil Chawla’র লেখা ‘THE GREAT HOLOCAUST OF BENGAL’]

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন