নকশী কাঁথা তৈরিতেই চলে জামিলার পরিবার

প্রকাশিত: ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ ০৯:২১:১৯ || পরিবর্তিত: ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ ০৯:২১:১৯

শারমিন সরকার : জামিলা বেগম বাড়ীর দহলিজে দু’পা টেনে বসে আছেন। গুনগুন আওয়াজ আসছে কারো কানে। কাঁথায় তার আঙ্গুলের নান্দনিক ছোঁয়ায় ফুটে উঠছে ফুল, পাখি, পান ,যাতি,পালকী, নৌকা, পদ্ম ইত্যাদি নজরকারা সব নকশার অপূর্ব সমাহার। বয়স তার পঞ্চাশের উর্ধ্বে, তবুও নিপুণ দক্ষতায় ধরে রেখেছেন দীর্ঘ দিনের লালিত ঐতিহ্য।

আলাপচারিতায় জানা যায়,  কাঁথাশিল্প তার কোনো প্রথাগত বিদ্যা নয়। পরিবারের প্রবীণদের কাছ থেকেই কিশোরী বয়সে কারুশিল্পের কলাকৌশল শিখে নিয়েছেন তিনি । দিনের পর দিন তা রপ্ত করে  হয়ে উঠেছেন পারদর্শী। ভালবেসে মনের জোর নিয়ে  আজও করে যাচ্ছেন তার ভালো লাগার কাঁথা তৈরিরর কাজটি।

কাঁথা শব্দটির উৎস স্পষ্টভাবে জানা না গেলেও পিছনের ইতিহাস থেকে ধারণা করা হয়, সংস্কৃত শব্দ কন্থা ও প্রাকৃত শব্দ কথ্থা থেকে কাঁথা শব্দের উৎপত্তি। মিশর গ্রিস ব্যবিলন প্রভৃতি দেশে খ্রিস্টপূর্ব তিন হাজার বছরের ইতিহাস থেকে সূচিশিল্পের নিদর্শন পাওয়া যায়। তাছাড়া পাঁচশ বছর আগে কৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত শ্রী শ্রী চৈতন্য চরিতামৃত বইয়ে কাঁথার কথা প্রথম পাওয়া যায়।

হাজার বছর আগেও নকশী কাঁথা দেশ বিদেশের খ্যাতি অর্জন করেছিল। সে সময় মহিলারা হাতি, ঘোড়া, বাঘ, ফুল, পাখি সহ নানা চিত্র ফুটিয়ে তুলতো নকশি কাঁথায়। তখনকার দিনে নতুন জামাইকে বা নাত বউকে উপহার দেয়ার জন্য নানি কিংবা দাদীরা নকশি কাঁথা সেলাই করতেন।

বাংলাদেশের নকশী কাঁথা ও অন্যান্য লোকশিল্প সম্পর্কে প্রথম লিখেছিলেন দীনেশ চন্দ্র সেন ও   গুরুসদয় দত্ত, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কাঁথার সংগ্রহও দেখার মতো। এছাড়া বাংলা একাডেমীর সংগ্রহশালাতেও রয়েছে নকশি কাঁথা।

কাঁথা কী দিয়ে তৈরি হয় ? এ বিষয়ে কবি জসীমউদ্দীন বলেছেন, সাধারণত পুরাতন কাপড়ের পাড় হতে সুতো তুলে অথবা হাট হতে তাঁতিদের কাছ থেকে নীল, লাল, হলুদ প্রভৃতি সুতো কিনে এনে কাপড় সেলাই করা হয়। ঘরের মেঝেতে পা ফেলে পায়ের আঙ্গুলের সঙ্গে সুতোর এক কোণা জড়িয়ে এক একটি গুচ্ছ সুতো পাক দেওয়া হয়।

পাক দেয়া হলে তাদের এক একটি আঙ্গুলের মধ্যে আটকিয়ে দুটো পাক দেয়া সুতো একত্র করে উল্টো পাক দেয়া হয়। এভাবে সুতো তৈরি হলে তাদের হাতের কব্জিতে জড়িয়ে আবার পাকিয়ে রাখা হয়। কাঁথা সেলাইয়ের সময় যা ইচ্ছেমত কাজে লাগানো যায়।

প্রখ্যাত শিল্পী কামরুল হাসান নকশি কাঁথা সম্পর্কে বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, তখনকার দিনের মা বোন খালা চাচী ফুফুরা সংসারের কাজ সাঙ্গ করে দুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরে পাটি বিছিয়ে পানের বাটাটি পাশে নিয়ে পা মেলে বসতেন কাঁথা সেলাই করতে। পাড়া-পড়শিরাও আসতো গল্প করতে। এমনি এক একটি কাঁথা সেলাই কত গল্প, কত হাসি, কত কান্নার মধ্যে দিয়ে শেষ হতো তা বলা দুরুহ।

শুধু কতগুলো সূক্ষ সেলাই আর রং-বেরঙ্গের নকশার জন্যই নকশী কাঁথা বলা হয় না। বরং কাঁথার প্রতিটি সুচের ফোঁড়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক একটি কাহিনী, পরিবেশ, জীবন গাঁথা, বলা যেতে পারে নকশিকাঁথা এক একটি জীবন।

জমিলা বেগমের নকশী কাঁথার স্তূপের উপরে হাত বুলাতে বুলাতে তাম্বুল রাঙা ঠোঁটে একগাল হেসে বলেন, নকশি কাঁথা সেলানো তো সহজ কাজ নয় ।এক একটা কাঁথা সেলাতে এক থেকে দুই মাস সময় লাগে, আবার কখনো বড় কাথা সেলাই করতে এক বছর সময় লেগে যায়। তবে একটি কাথার সেলাইয়ের কাজ শেষ হয়ে গেলে অনেক ভাল লাগে।

তাছাড়া কাঁথার ধরনের উপর ভিত্তি করে  কাঁথা প্রতি এক থেকে পাঁচ হাজার বা এর বেশী টাকায় বিক্রি হয়। কাঁথা তৈরি করে তিনি পরিবারের হাল ধরার সাথে যেমন অর্থনৈতিকভাবে আজ স্বাবলম্বী তেমনি গ্রামের অনেক নারী তার কাজে অনুপ্রানিত হয়ে জীবিকা নির্বাহের জন্য বেছে নিয়েছেন শিল্পটি।

হয়ে উঠেছেন তার মত আত্মনির্ভরশীল, এটা দেখে শান্তি পান তিনি। বয়স বাড়ছে, একসময় হয়তো তিনি থাকবেন না। তবে  তিনি চান তার মনের মধ্যে লুকানো বিরহ সুখের স্বপ্নে আঁকা যে  গ্রামীণ রুপ বৈচিত্র তুলে ধরে নকশী কাঁথার বুক জুড়ে তা যেন হাজার বছর চলতে থাকে বাংলার ঐতিহ্যে পরবর্তী প্রজন্মের হাতের বুননে।

প্রজন্মনিউজ২৪.কম/মোরশেদ মুকুল/কেএমএল

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ