চোখের পানিতে পবিত্র জুমাতুল বিদা

প্রকাশিত: ০২ জুলাই, ২০১৬ ০২:৩২:৫৪

চোখের পানিতে আমিন, আমিন আল্লাহুম্মা আমিন ধ্বনির মধ্য দিয়ে দুনিয়া ও আখেরাতের শান্তি কামনা করে পবিত্র জুমাতুল বিদা পালিত। জুমার নামাজে অংশ নিতে মানুষের ঢল নেমেছিল জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ রাজধানীসহ সারাদেশের মসজিদগুলোতে। বায়তুল মোকাররমে অর্ধলাখ মুসল্লি জুমার নামাজ আদায় করেন।

নামাজ শেষে মোনাজাতে অংশ নেন মুসল্লিরা। প্রায় ১০ মিনিট দীর্ঘ মোনাজাতে বায়তুল মোকাররম মসজিদ এবং আশপাশের এলাকায় নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। খানিক পর পর শুধু ভেসে আসে আমিন, ছুম্মা আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন ধ্বনি।

পেশ ইমাম মিযানুল ইসলাম মোনাজাত করেন। তার কণ্ঠে জুমার নামাজে অংশ নেয়া মুসল্লিরা দুহাত তুলে দোয়ায় অংশ নেন। মোনাজাত চলাকালে অশ্রুসিক্ত নয়নে সর্বশক্তিমান আল্লাহর নিকট নিজেকে শপে দিয়ে পানা চান মুসল্লিরা। অনুতপ্ত মানুষের কান্নার আওয়াজে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।

মোনাজাতকালে ইমাম মিযানুল ইসলাম বলেন, ‘হে আল্লাহ, হে আল্লাহ আমরা জানি না, আজকে জুমাতুল বিদা, জুমাতুল বিদা আমাদের জীবনে কারো যদি শেষ জুমা হয়, আমাদের জুমার নামাজকে কবুল করে নাও (এ কথা বলার পর কান্নায় ভেঙে পড়েন মুসল্লিরা)। যারা হাত তুলেছে প্রত্যেকের দোয়া তুমি কবুল করে নাও। প্রত্যেকের মোনাজাত তুমি কবুল করে নাও।’ 

‘আল্লাহ। হে আল্লাহ, আমাদের বাবা-মা আত্মীয়-স্বজন গ্রামে-গঞ্জে দেশে-বিদেশে যে যেখানে আছে, সবাইকে তুমি হেফাজত করো। হে আল্লাহ, প্রত্যেকের মনের আশা পূরণ করে দাও। হে আল্লাহ, আমাদের বাংলাদেশের জন্য তোমার খাস রহমত নাজিল করে দাও। হে আল্লাহ, আমাদেরে মাতৃভূমি বাংলাদেশকে তুমি হেফাজত করে দাও মাওলা। সুখ, শান্তি সমৃদ্ধি দান করো। আল্লাহ তোমার পক্ষ থেকে সব ধরনের বরকতের ফয়সালা করে দাও। আল্লাহ আমাদের সবার ঈমানী জিন্দিগী নসিব করে দাও।’

‘হে আল্লাহ, তোমার কাছে একসঙ্গে ফরিয়াদ করছি, হে আল্লাহ আমাদের ময়মুরব্বী, আমাদের বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজনরা কবরে শায়িত আছেন, তাদের জীবনের গুনাখাতা মাফ করে দাও, কেয়ামত পর্যন্ত তাদের মাফ করে দাও। আল্লাহ কেয়ামত পর্যন্ত সকল মুসলমানের কবরের আজাব তুমি মাফ করে দাও। তাদের কবর তুমি জান্নাতের বাগিচা বানাইয়া দাও।’

‘হে আল্লাহ যারা হাত তুলেছে, তাদের মনের আশা তুমি পূরণ করে দাও। হে আল্লাহ, হে আল্লাহ, যারা অসুস্থ তাদেরকে সুস্থ করে দাও। আমাদের মনের আশাগুলো পূরণ করে দাও। আল্লাহ আমাদের ঈমানকে মজবুত কর। আমাদের গুনাহকে মাফ করে দাও। সারা দুনিয়াকে হেফাজত করো। সামনে ঈদুল ফিতর, ঈদুল ফিতর উদযাপন করার তৌফিক আমাদের দান করে দাও।’

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে রাজধানীর নাখারপাড়া থেকে জুমার নামাজ আদায় করতে এসেছেন ব্যবসায়ী হাফিজুর রহমান। তিনি বাংলামেইলকে বলেন, ‘আমি বিগত চার বছর ধরে এখানে রমজানের প্রথম এবং শেষ শুক্রবার জুমার নামাজ আদায় করে থাকি। জাতীয় মসজিদ জুমার নামাজ শেষে হাজার হাজার মুসল্লিদের সঙ্গে দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে দোয়া চেয়েছি। দেশের মানুষের শান্তি এবং মঙ্গল কামনা করেছি।’

ধানমণ্ডি শংকরের বাসিন্ধা জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তা মনির আহমেদ রমজানের শেষ জুমার নামাজ আদায় করতে বায়তুল মোকাররম মসজিদে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘মসজিদে জায়গা না পেয়ে রাস্তায় নামাজ আদায় করেছি। নামাজ শেষে মোনাজাতে সারাবিশ্বের মুসলমানরা যেন ভালো থাকে, মুসলমানদের উপর যে নির্যারতন চলছে, আল্লাহ যে তা থেকে হেফাতজ করে এই কামনা করেছি।’

তার সঙ্গে থাকা ব্যাংক কর্মকর্তা আসাদুর রহমান বলেন, ‘বাবা-মা আত্মীয়-স্বজনের জন্য দোয়া চেয়েছি। দেশের মানুষের মঙ্গল এবং শান্তি কামনা করেছি।’

শনির আখড়া থেকে মোস্তাফিজুর রহমান দুই ছেলেকে নিয়ে জাতীয় মসজিদে জুমার নামাজ পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘অনেকদিন ধরে ছেলেরা বলছিল, বায়তুল মোকাররমে জুমার নামাজ পড়বে, তাই নিয়ে এসেছি। তাদের নিয়েই আজ নামাজ আদায় করেছি।’

আজ ছিল রমজানের ২৫তম দিন, চতুর্থ ও শেষ জুমা। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে আজ অর্ধলাখ মুসল্লি একসঙ্গে জুমার নামাজ আদায় করেছেন। তবে নামাজের আগ মুহূর্তে বৃষ্টির কারণে বহু মুসল্লিকে ফিরে যেতে হয়।

এদিকে আজান দেয়ার আগ থেকেই বায়তুল মোকাররমে বিভিন্ন বয়সের মুসল্লিরা স্রোতের মতো আসতে থাকে। আজানের অন্তত এক থেকে দেড় ঘণ্টা আগে থেকেই মুসল্লিরা আসতে শুরু করে। দুপুর সোয়া ১২টায় জুমার নামাজের আজান দেয়া হয়। দুপুর সাড়ে ১২টার মধ্যেই মসজিদের মূল ভবনের নিচ তলা থেকে সাত তলা পর্যন্ত কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।

এরপর দক্ষিণ প্লাজা, পূর্ব প্লাজা এবং উত্তর গেটের সমানের রাস্তা, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ভবনের সামনের রাস্তা, দক্ষিণের গেটে এবং উত্তর গেট এবং পল্টন রাস্তায়ও মুসল্লিরা বসে পড়েন। আর গ্রাউন্ড ফ্লোরে নারী মুসল্লিরা জুমার নামাজ আদায় করেন। এসময় রাস্তায় যান চলাচলও বন্ধ করে দেয়া হয়। 

দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে জুমার নামাজ হয়। ইমামতি করেন জাতীয় বায়তুল মোকাররমের পেশ ইমাম মিযানুল ইসলাম। আরবি খুতবার আগে রমজানের তাৎপর্য ও গুরুত্ব তুলে ধরে বয়ান করেন পেশ ইমাম।

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ