জানা অজানা ইসলামিক প্রশ্ন ও উত্তর

প্রকাশিত: ০৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ ১১:১৮:৪৮

প্রশ্ন : এক লোকমা হারাম খেলে ৪০ দিনের ইবাদত কবুল হয় নাহাদিসটি কি সহিহ?

উত্তর : না, এটি সহিহ হাদিস নয়, বানোয়াট একটি হাদিস। এটি একেবারেই জাল, মিথ্যা হাদিস। এক লোকমা হারাম খেলে ৪০ দিনের ইবাদত কবুল হবে না— একেবারেই মিথ্যা, বানোয়াট হাদিস। সহিহ তো প্রশ্নই আসে না। এই মর্মে রাসূল (সা.)-এর কোনো হাদিস সাব্যস্ত হয়নি।

প্রশ্ন : অনু বা জাররা পরিমাণ অহংকার থাকলে সে জান্নাতে যাবে নাবুঝব কীভাবে যে আমাদের অহংকার রয়েছে কি না?

উত্তর : অহংকার আছে কি না সেটা বোঝা খুব সহজ। নিজেকে একটু পর্যালোচনা করলেই আপনি সেটা বুঝতে পারবেন। আপনি যদি দুটি কাজ করেন, তাহলে বুঝবেন আপনার অহংকার আছে। প্রথমত হচ্ছে, আপনি যদি হককে কবুল না করেন। এটা খুব সহজেই আপনি পরীক্ষা করতে পারবেন। কাউকে যদি দেখেন যে, সে হককে কবুল করছে না, তাহলে বুঝতে হবে যে তাঁর মধ্যে অহংকার আছে। তবে হকটা হক হিসেবেই হতে হবে, হক কবুল করার বিষয়টি খায়েশ অনুযায়ী হলে চলবে না। আপনি বলছেন যে, এটা কবুল করল না, এ জন্য আপনি মনে করলেন এই লোক অহংকারী, ব্যাপারটি এমন নয়। প্রকৃত হক বা সত্যকে কেউ ইচ্ছা করে কবুল করতে না পারলে বুঝতে হবে অহংকার তাঁকে বাধা দিচ্ছে।

দ্বিতীয় হচ্ছে, মানুষদের প্রতি অবজ্ঞা, অবহেলা, তুচ্ছজ্ঞান। মানুষদের প্রতি দুর্ব্যবহার করা, ছোট করার চেষ্টা করা। যদি এটি কোনো লোকের বক্তব্য বা আচরণের মাধ্যমে অথবা কোনো ইঙ্গিতের মাধ্যমে, কোনো লেনদেনের মাধ্যমে বোঝা যায়, তাহলে বুঝতে হবে তাঁর মধ্যে অহংকার রয়েছে। সেটা আপনার মধ্যে থাকলে আপনিই সেটা বুঝতে পারবেন।

আর এই বিষয়টিকে সত্যিকার পরিচর্যা করার জন্য যে কাজটি আপনাকে করতে হবে সেটি হলো, আপনি সব সময় খেয়াল রাখবেন যে, ‘আমি একটু বড়’ এই ভাবটি আপনার মধ্যে জাগ্রত হচ্ছে কি না, এই অহমিকা ভাব, বড়ত্বের ভাব আসছে কি না। এই ভাবটি যদি আপনার অন্তরের মধ্যে আসে, তাহলে আপনি মনে করবেন যে, অহংকার এখনো রয়ে গিয়েছে। এর মাত্রা হয়তো কম-বেশি হতে পারে, কিন্তু অহংকার এখনো রয়ে গিয়েছে।

 কিন্তু যদি দেখেন যে কোনো ব্যক্তির অবস্থান এবং আপনার অবস্থান অন্তরের মধ্যে সমান মনে হচ্ছে, তাহলে বুঝবেন যে আপনার অন্তর থেকে আসলেই অহংকার চলে গিয়েছে, আপনার অন্তর অহংকার থেকে মুক্তি লাভ করতে পেরেছে।

প্রশ্ন : যদি কেউ রাগবশত তাঁর স্ত্রীকে তিন তালাক দেন, কিন্তু পরে সংসার করতে চান, তাহলে এটা কি সম্ভব?

উত্তর : তিন তালাক তো একসঙ্গে কেউ দিতে পারবেন না। তিন তালাক একসঙ্গে দেওয়ার বিধান ইসলামে নেই। একবারে এক তালাক দিতে পারবেন। সুতরাং, এক তালাক যদি কেউ দিয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর জন্য পরবর্তী সময়ে সংসার করা বৈধ ও জায়েজ। তিনি রাগ করে দেন বা যেভাবেই দেন না কেন, যদি কেউ তাঁর স্ত্রীকে এক তালাক দেন, স্ত্রীকে আবার ফেরত নিতে পারেন। তাঁর জন্য দ্বিতীয়বার সংসার করা জায়েজ রয়েছে।

একসঙ্গে তিন তালাক দেওয়ার বিধান ইসলামী শরিয়তের মধ্যে বৈধ নয়। কেউ যদি একবারে তিন তালাক বা পাঁচ তালাক দেন, তাহলে সেটা এক তালাক হিসেবেই গণ্য হবে। একবারে একাধিক তালাক দেওয়ার বিষয়টি শুদ্ধ নয়। সেটা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশনা ও কোরআনের নির্দেশনার পরিপন্থী। সহিহ বুখারি হাদিসের মধ্যে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য এসেছে।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সময় যাঁরা তিন তালাক দিয়েছেন, তাঁদের এটাকে রাসূল (সা.) এক তালাক হিসেবেই বিবেচনা করেছেন। তিন তালাক একসঙ্গে দেওয়ার অধিকার ইসলাম কাউকে দেয়নি। সুতরাং এ কাজটি শুদ্ধ নয়।

প্রশ্ন : মানুষ মারা যাওয়ার পর কবরে যে আজাব হবে, তা কোনো মানুষ বুঝতে পারে নাতবে পশু-পাখিরা নাকি বুঝতে পারেকথা কতটুকু সত্য?

উত্তর : হ্যাঁ, কথাটি সত্য। মানুষ অনেক কিছু বুঝতে না পারলেও কিছু কিছু মাখলুকাতকে আল্লাহতায়ালা কিছু জিনিস বুঝতে দেন। মাখলুকাতের মধ্যে কেউ কেউ বুঝতে পারে মর্মে বর্ণনা পাওয়া গেছে। কবরে আজাবের বিষয়গুলো পশুজগত অনেকটা বুঝতে পারে। তবে সেই বুঝটা কোন ধরনের বুঝ, সে সম্পর্কে হাদিসে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই।

তারা কি বুঝতে পারে, এটা আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালাই সবচেয়ে ভালো জানেন। এ বিষয়টি আমাদের বুঝতে দেওয়া হয়নি। কারণ কবরের আজাব যদি মানুষ সত্যিকারভাবে বুঝতে পারত, তাহলে মানুষের দুনিয়াবি জীবন সম্পূর্ণ বিপন্ন হয়ে যেত, বিষণ্ণ হয়ে যেত। মানুষ এত বেশি চিন্তায় পড়ে যেত যে, তার জীবনযাত্রা অচল হয়ে যেত। এ জন্যই হয়তো আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা মানুষের কাছ থেকে এই ক্ষমতা উঠিয়ে নিয়েছেন।

যেমন, আমরা গুনাহ করলেও গুনাহের ভার কী, এর আকার কী, তার কিছুই আমরা বুঝতে পারি না। কিন্তু সেগুলো তো আমরা বহন করে যাচ্ছি। অনুরূপভাবে কবরের আজাবটাও একই পর্যায়ের। আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা মেহেরবানি করেছেন। তাঁর বান্দারা পার্থিব জীবনটা যাতে করে যাপন করতে পারে, এই জীবনটা যাতে সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত না হয়, এ জন্য মেহেরবানি করেছেন, অনুগ্রহ করেছেন যে আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা এটাকে গোপন করে দিয়েছেন।

কিন্তু আল্লাহ মাখলুকাতের মধ্যে কাউকে কাউকে এর কিছু রূপ উপলব্ধি করার ক্ষমতা দিয়েছেন। যতটুকু ক্ষমতা দিয়েছেন, এটা তারাই বুঝতে পারে। তবে এ কথা স্পষ্টভাবে হাদিসের মধ্যে আসেনি যে, তারা আসলে কী বুঝতে পারে। হয়তো কোথাও কোথাও কোনো কবরের আজাবের বিষয়ে তারা বুঝতে পারে। সবটাও বুঝতে পারে কি না, তা হাদিসের মধ্যে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়নি।

প্রশ্ন : কোন দোয়া বা কোন সুরা বেশি বেশি পড়লে রোগ নিরাময় হয়?

উত্তর : রোগ নিরাময়ের জন্য অনেক দোয়াই রয়েছে। রাসুল (সা.) অনেক দোয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। ‘ওয়া ইজা মারিদতু ফা হুয়া ইয়াশফি-নি’ এটাও পড়তে পারেন। যেসমস্ত দোয়া রাসুল (সা.)শিক্ষা দিয়েছেন সেগুলোও পড়তে পারেন। ‘রাব্বি আন্নি মাস্‌সানিয়াদ দুর্‌রু, ওয়াআন্তা আরহামুর রাহিমিন’ এটা পড়তে পারেন।

তবে সুনির্দিষ্ট কোনো সুরার কথা রাসুল (সা.) হাদিসে বলে যাননি বা উল্লেখ হয়নি যে, এই সুরা পড়লে রোগ নিরাময় হবে। কোরআনে কারিম তেলাওয়াত করুন, তেলাওয়াত করে আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, দেখবেন যে আল্লাহ সুবাহানাহুতায়ালা রোগ নিরাময়ের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন।

প্রশ্ন :  ইসলামে জন্ম নিয়ন্ত্রণ জায়েজ আছে কি না? জায়েজ হলে কী পদ্ধতিতে জন্ম নিয়ন্ত্রণ করা যাবে? এটা জানতে চাচ্ছি

উত্তর : ভাই আপনি চমৎকার একটি প্রশ্ন করেছেন। আমি সন্তানদের খাওয়াব কীভাবে, পরাব কীভাবে, এই চিন্তা থেকে যদি কেউ জন্ম নিয়ন্ত্রণ করেন, তাহলে সেটি সম্পূর্ণ হারাম। কারণ রিজিকের মালিক হলেন আল্লাহ রাব্বুলআলামিন, রিজিকদাতা আল্লাহতায়ালা।

কিন্তু আমাদের সম্মানিত স্কলাররা বলেছেন, জন্ম নিয়ন্ত্রণ শুধু দুটি অবস্থায় করা যাবে। প্রথমত, এই মুহূর্তে যদি স্ত্রীর গর্ভে সন্তান আসে, তাহলে বড় ধরনের বিপদ হতে পারে, অর্থাৎ শারীরিক কারণে এই অবস্থায় জন্ম নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, আগে যে সন্তানটি হয়েছে তাঁর অধিকার রয়েছে দুই বছর বুকের দুধ পান করার। ‘মায়েরা সন্তানদের দুধ পান করাবে দুই বছর’। এই দুই বছরের মধ্যে যদি মা গর্ভধারণ করেন, তাহলে আগের সন্তান অসুস্থ হয়ে যেতে পারে অথবা তাঁর অধিকার ক্ষুণ্ণ হতে পারে।

এই দুটি কারণে জন্ম নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপারে ওলামায়ে কেরাম বলেছেন যে, এই দুই কারণে জন্ম নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। কিন্তু খাওয়ানো, পরানোর কথা ভেবে জন্ম নিয়ন্ত্রণ করা জায়েজ নেই। এটি হারাম কাজ। ইসলামে যৌক্তিক কারণে, শরিয়া সম্মত কারণে জন্ম নিয়ন্ত্রণের অবকাশ রয়েছে।

প্রশ্ন : কফি পান করা হালাল নাকি হারাম?

উত্তর : কফি আসলে একটা পানীয়, যেটা এক ধরনের দানা থেকে তৈরি করা হয়ে থাকে। এই দানা যদি আপনি কাঁচা খান, সেটাও জায়েজ। আর এটা যদি আপনি সেদ্ধ করে খান, গুঁড়া করে খান, সেটাও জায়েজ। এর মধ্যে কোনো ধরনের নিষিদ্ধ বিষয় নেই। কারণ, মাদকতার কোনো অংশ এই কফির মধ্যে নেই।

প্রশ্ন : মসজিদের দেয়ালে, নামাজের জন্য ব্যবহৃত সুতরার গায়ে মৃতদেহ বহনকারী খাটের উপর ‘আল্লাহুলেখা থাকেএর তাৎপর্য কী? 

উত্তর : এটি একেবারেই তাৎপর্যহীন। এর কোনো গুরুত্ব এখানে নেই। এই সমস্ত বস্তুর মধ্যে আল্লাহু লেখা। এটা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নাম ‘ইসমুল জালালা’-এর মর্যাদা অনেক বেশি। সুতরাং এটাকে কাঠের মধ্যে, চেয়ারের মধ্যে তারপর সুতরার মধ্যে, দেয়ালের মধ্যে, খাটিয়ার মধ্যে লেখা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সত্ত্বার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।  আল্লাহ সুবানাহুতায়ালার সত্ত্বার বিষয়টি আরোও অনেক বিশাল, অনেক বড়। তাই এ ক্ষেত্রে এই কাজটি শুদ্ধ নয়। এই কাজটি ভুল।

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ