জেলা থেকে জেলান্তর আর মজার অনুভুতি

প্রকাশিত: ২৭ জানুয়ারী, ২০১৭ ০৩:৩৩:১৪

 ২৯ শে ডিশেম্বর ২০১৬’র দিনটি তার শেষ প্রান্তে উপনীত। দিনের আলো বিকিরণকারী তেজস্বী সূর্য্যটা আলো গুটিয়ে তার রবের আরশে প্রণিপাতের উদ্দেশ্যে ছুটছে। আমাদের বাহন উপস্থিত। সবাই বিপুল উৎসাহে দেশের পূর্ব প্রান্ত থেকে দক্ষিণ প্রান্তে যাত্রার চুড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছি। কেউবা ব্যানার সম্বলিত বাসের সাথে সেলফি তুলে নিজ নিজ ফাইলে পোস্টাচ্ছে। মাগরিবের আযান ধ্বনিত হচ্ছে চারপাশ থেকে। মাগরিবের সালাত আদায়ান্তে সবাই বাসে স্ব স্ব আসন গ্রহণ করলে সেটি চট্রগ্রামের উদ্দেশ্যে রাজশাহী টুঢাকা হাইওয়ে ধরে ছুটতে থাকে। লক্ষ্য রাতাবসানে সূর্য্য উদয়ের পূর্বেই চট্রগ্রামের লালদিঘীতে ‘হোটেল ফয়জিয়ায়’ পৌঁছা। কিন্তু সফরের নিত্য সঙ্গী জ্যাম আমাদের যাত্রাকে টেনে লম্বা করেই ছাড়ল। ১ম জ্যাম টাঙ্গাইলে প্রায় দু‘ঘন্টা ব্যাপী। ২য় জ্যাম রাত দেড়টায় মুন্সিগঞ্জে মেঘনার পাড়ে; প্রায় তিন ঘন্টা ব্যাপী। যাত্রী বিড়ম্বনার এ তিক্ত সময়টিতেও জনগনের রাজা পুলিশ মাছের রাজা ইলিশ বহনকারী ট্যাক্সিক্যাব থেকে চাঁদা নিতে ছাড়ছে না। 

গাড়ির স্লো গতি, ছোট-বড় জ্যাম আর পুলিশের চাঁদাবাজি, এমন ত্রিশঙ্কু অবস্থার মধ্য দিয়ে বিশ ঘন্টার ব্যবধানে ১.১৫ মিনিটে চট্রগ্রামে পৌঁছাই। অল্পতেই জুমার সালাত মিস। জোহরের সালাত পড়তে গিয়েও ক্বিবলা বিড়ম্বনা। প্রথমবার উত্তরে, দ্বিতীয়বার কথাতে পূর্ব দিকে, এবারও মিসটেক। তৃতীয়বার গিয়ে কেবলা নিশ্চিত হল। ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে সবাই বাসে চেপে বসলাম। আসর হয়ে গেছে। গন্তব্য কর্ণফুলী নদীর মোহনায় অবস্থিত পতেঙ্গা বীচ। শাহ আমানত আন্তর্যাতিক এয়ারপোর্ট রোড হয়ে বীচে পৌঁছাতে মাগরিব ঘনিয়ে এলো। গাড়ি জ্যামে আটকা পড়তেই আমরা পাঁচজন নেমে ছুটলাম বীচের দিকে। কাছেই পতেঙ্গা বীচ। তখনও কিছুদূরে নোঙ্গর করা জাহাজগুলো দেখা যাচ্ছিল। স্পীড বোটে চড়ার ইচ্ছা বস করতে না পেরে পাঁচজন একটি বোট ঠিক করলাম। স্পীড বোটের উল্কা গতি দেখেছি কিন্তু এতে চড়া হয়নি। দেখতে পাওয়া জাহাজগুলোতেও যাবে না। পাঁচজন ১৫০ টাকা। জনপ্রতি ৩০ টাকা। বোটে উঠতে গিয়ে জুতা-মুজা নিয়ে বিড়ম্বনা। আশরাফ ভাই বাটুল দ্য গ্রেটের মত ডান হাত দিয়ে সাড়াসি বাঁধন চেপে আমাকে উচিয়ে ধরে বোটে উঠালেন। বোটটি ভোঁ গতিতে মিনিট দুয়েকের মধ্যেই একটা চক্কর দিয়ে ফিরে এলো।

আমাদের বাকিরা বীচে পৌঁছে আবছা অন্ধকারে জাহাজে জালানো আলোগুলো ছাড়া কিছু দেখতে পাচ্ছিল না। কেউ বোটে ওঠার সাহস করল না। বীচে ঠিক পানির কাছ ঘেঁষে একটু চড়াইয়ে পাতানো কিছু ভ্রাম্যমান দোকানে কাকড়া ভেজে-ভুনিয়ে রাখা হয়েছে। কয়েকবার জোড়েসোড়ে কাকড়ার কাছে ভিড়েও তা স্পর্শ করার সাহস পাইনি কেউই। ‘আগে তুই শুরু কর, নাহ আগে তুই শুরু কর’ এভাবে পাঁচজনই পরস্পরে কাঁদা ছুড়াছুড়ি করে ফিরে আসতে হয়েছে। এদিকে কিশোর বিক্রেতা সামুদ্রিক কাকড়া ভাজির টেস্টি তত্তের উপর এমন বয়ান ঝারছিল যেন কাকড়ার প্রতি আমাদের শংশয়পূর্ণ এহেন আচরন বদলে গিয়ে গপাগপ গিলতে থাকি। রাঙ্গামাটির পথে: ৩১ তারিখ ভোর ৬.০০ টায় চট্রগ্রাম লালদিঘীর ফয়জিয়া হোটেল থেকে রাঙ্গামাটির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরী সড়ক হয়ে দুপারে পাহাড়বেষ্টিত বায়লাদেশ উইমেন্স এসোসিয়েশনের পাশ দিয়ে হাইওয়ে ধরে গাড়ি ছুটতে থাকে । লক্ষ্য বাইজিদ বোস্তামি রোড হয়ে কথিত সেই মাযারে ঢুঁ মেরে রাঙ্গামাটি পৌঁছা। আমরা সকাল সকাল সেই মাজারে পৌঁছালাম। এখনও জমে উঠেনি। কোলাহলও নেই, অনেকটা জনশুণ্য। ঘুম থেকে উঠা ঝামড়ানো চোখে দুই খাদেম বসে আছে। যতটা জাঁকজমক শুনেছিলাম ততটা নয়। হয়তো তখন সকাল ৬.৩০ মিনিট তাই। সাজানো মাজারের চুম্বুকাংশে যেতে সিঁড়ি মাড়িয়ে কিছুটা উঁচুতে উঠতে হয়।

মূল আকর্ষনে উঠতে গিয়েই বাজে বিপত্তি। জুতা পায়ে দিয়ে উঠা যাবে না। খুলে হাতে নিয়েও উঠা যাবে না। দেশের সর্বোচ্ছ বিদ্যাপীঠের অন্যতম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজে অনার্স শেষ করেও তো আমরা এমন আদব- কায়দা শিখিনি। একজন খাদেম বললেন: জুতা নিচে রেখে উঠেন আমরা দেখছি, ফিরে এসে জনপ্রতি ৪/৫টাকা করে দিয়েন দানের সওয়াব পাবেন। হাজার হাজার টাকা খরচ করে বাবার এখানে আসেন দু’চার টাকা আর কি? কে শুনে তার ওয়াজ! এমন লেকচারের পরওয়া না করেই আমাদের কয়েকজন জুতা খুলে হাতে নিয়ে সিড়ি মারিয়ে হনহন করে উর্দ্ধমুখী হতে থাকে। যেন তারা কিছুই শুনতে পায় নি। জুতা যে ওরা মেরে দিবে না তারই বা ভরসা কি? এত্তবড় বেয়াদবি! এবার ক্ষেঁপে গিয়ে একজন বয়স্ক মোছারু মুরুব্বী হুমকী দিয়ে বসলেন- ‘উপরে উঠলে কিন্তু আর ফিরতে পারবেন না। এই ফেরা কি গাইবী ভাবে বাঁধাগ্রস্ত হবে নাকি বাবা তার সুপার ন্যাচারাল শক্তি প্রয়োগে জুতাধারীদেরকে শায়েস্তার ব্যবস্থা করবেন এটা অবশ্য স্পষ্ট নয়। নাকি তাদের গাজার টাকা না পাওয়ার অভিমানটা ক্ষোভে রুপান্তরিত হয়েছিল কে জানে?

আরেকজন আমাদের গণস্রোত দেখে একটু হালকা করলেন। জলদগম্ভীর স্বরে বললেন, টাকা দিতে হবে না, আপনারা জুতা নিচে রেখে যান। আহা! বাবার প্রতি কতই না তাদের স্বার্থবাজী শ্রদ্ধা? বাবা যে তাদের প্রবল প্রতাপের সাথে জান্নাতে নিয়েই ছাড়বে??? শেষমেশ হয়তো দু‘একজন করুণা করে শ’দুয়েক করে পয়সা দিয়েছিল। আদব নং দুই বাবার মাজারের ছবি ধারণ করা যাবে না। একজনকে চুপিসারে ছবি তুলতে দেখে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেন খাদেম সাহেব। রাগে গিজগিজ করে বলেন,‘এরা মানুষ না, বড় বেয়াদব।’মাজার সংলগ্ন লম্বালম্বি পুকুড়টিতে বিলুপ্ত প্রজাতির কাসিমগুলো ছিল দেখার মত। নাম বোস্তামী কাছিম। যাদের বৈজ্ঞানিক নাম Aspideretes nigricans। কর্ডাটা পর্বের এ প্রাণীগুলো শুধু এখানেই টিকে আছে। এই দূর্লভ প্রজাতির কচ্ছপগুলো পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না। ১৯৯৮ সালে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব কনজারভেশন অব নেচারের অন্যতম বিপন্নপ্রায় প্রাণীর তালিকায় বোস্তামী কাছিমের নাম উঠে আসে। ২০০২ সালে পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক সংস্থা, আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (IUCN) কর্তৃক বোস্তামী কচ্ছপকে চড়মভাবে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। তাই এই কচ্ছপের ওপর ২০০৭ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেল এক ডকুমেন্টারি তৈরি করে নিয়ে যায়।

বাংলাদেশের ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনের তফসিল-১ অনুযায়ী এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত। মজার বিষয় হলো,স্বয়ং বাইজিদ বোস্তামীকে নিয়েই। তিনি কি আদৌ সেখানে কবরস্থ হয়েছিলেন? নাকি ভুয়া ইতিহাস সৃষ্টি করে জমকালো ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে তাঁকে তথায় আমাদানি করা হয়েছে? বিষয়টি ঐতিহাসিকদের কথায় স্পষ্ট হয়। ঐতিহাসিকগণ চট্রগ্রামে অনেক আরব বনিকগণের আগমনের ব্যাপারটি জোড়েসোড়ে লিখলেও বায়জিদ বোস্তামীর আগমনের কথা শক্তভাবেই না করেছেন। তাই চট্রগ্রামের নাসিরাবাদে একটি পাহাড়ের পাদদেশে নির্মিত কথিত মাজারটি শুধুই ধারনা আশ্রিত একটি অনুকৃতি বৈ কিছুই নয়। বিখ্যাত পারসিয়ান পর্যটক বায়জিদ বোস্তামী রহ. (জন্ম:৮০৪- মৃত্যু:৮৭৪) ইরানের শাহরউদ প্রদেশের বাস্তাম নামক শহরে জন্মগ্রহণ করেন। এজন্যেই তাঁর নামের শেষে বোস্তামী লকবটি শোভা পাচ্ছে। তাঁর জীবনকর্ম সম্পর্কে প্রামাণিক তথ্যাদি নগন্যই পাওয়া যায়। কল্পকথার মধ্যে কিছু হল: চট্রগ্রামে বায়জিদ বোস্তামী এসেছিলেন।

দীর্ঘ সময় অবস্থানের পর তাঁর প্রস্থানের সময় ভক্তবৃন্দ তাঁকে থেকে যাবার অনুরোধ করেন। এমতাবস্থায় তিনি তাদের ভালোবাসা ও ভক্তিতে মুগ্ধ হয়ে কনিষ্ঠ আঙ্গুল কেঁটে কয়েক ফোটা রক্ত মাটিতে ফেলেন এবং ঐ স্থানে উনার নামে মাজা গড়ে তুলবার কথা বলে যান। কেউ কেউ বলেন, বায়জিদ বোস্তামী স্বশরীরে চট্রগ্রামে আসেন নি। তাঁর কয়েকজন শিষ্য এসেছিলেন। তারাই বায়জিদ বোস্তামীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রমাণে মাজারটি বানিয়েছেন। সবই খেয়াল- খুশি আর অনুমানভিত্তিক। হাটহাজারী থেকে সোজা পূর্বে মেখল, গহিরা, রাউজান ও মানিকছড়ি মাড়িয়ে রাঙ্গামাটি জেলায় প্রবেশ করতে হয়। আর এ পথটিই চট্রগ্রাম টু রাঙ্গামাটি মহাসড়ক। আমাদের গাড়ির চাকা ঘুরছে রাঙ্গামাটির দিকে। আমরা রাঙ্গামাটির পর্যটন ঘাটে পৌঁছলাম ঠিক যখন ঘড়ির কাটা এগারোটা ছুঁই ছুঁই। সবাই যে যার মত সকালের নাস্তা সেড়ে শ্যালো মিশিনের বোটে উঠলাম। কেউ বোটের অভ্যান্তরে কেউবা ছাদে। বসে আর দাঁড়িয়ে। সাপের মত এঁকে বেঁকে চলা পাহাড়বেষ্টিত নয়নাভিরাম হ্রদগুলো এতটাই উপভোগ্য ও দৃষ্টিনন্দন তা কখনো ভাবিনি। যেন সতত প্রবাহিত স্বর্গীয় নহর।

সচ্ছ পানির দু’ধারে দাড়িয়ে থাকা সবুজ অরণ্যে ঘেরা পাহাড়গুলো এক সপ্নীল দৃশ্যের অবতারণা করেছে। লেকের পানি যেমন শান্ত, নিস্তরঙ্গ, তেমনি লেকের অবহাওয়াও একেবারে মৌন। কখনো দু’একটি স্পীড বোট সাঁই করে আমাদের কাঁচকলা দেখিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে। কখনো বা সেনাবাহিনীর টহল বোট কিছু দূর দিয়ে যাচ্ছে, আমাদের হাতের ইশারার জবাবে তাঁরাও হাত নাড়ছে। ‘শুভলং’- এর পাহাড়ি ঝরনা বরকল উপজেলার একটি দর্শনীয় স্পট। দীর্ঘ পাহাড়ের উঁচু প্রান্ত থেকে পানি ধারা অব্যহতভাবেই নিচে গড়িয়ে পড়ছে। পানির উৎস দেখতে আমরা ক’জন সর্বশক্তি ব্যয় করে উপরে উঠার চেষ্ট করলাম। এই ঝরনার নির্মল জলধারা বরাবরই দর্শনার্থীদের হৃদয়ে এক ভিন্ন অনুভুতির কাঁপন তোলে। ভরা বর্ষার সময়ে মূল ঝরনার জলধারা প্রায় ৩০০ ফুট উঁচু থেকে পাহাড়ের নিচে আছড়ে পড়ে এবং অপূর্ব সূরের মূর্ছনায় পর্যটকদের বিমোহিত করে। এক পর্যায়ে গিয়ে আটকে গেলাম। উপরে উঠার রাস্তা হঠাৎ করে একেবারে খাঁড়া হয়ে লম্বা লম্বি মাথার উপরে উঠে গেছে। প্রায় একতলা বিল্ডিংয়ের সমদূরত্ব শিকড় আকড়িয়ে উঠতে হবে। এমন রিস্কি পথে না গিয়ে সেখানেই কিছু সময়ক্ষেপণ করে নিচে নামতে থাকলাম।

এবারও ভীতি আশংকা রোমাঞ্চ নিয়ে কচ্ছপ গতিতে নামতে থাকলাম। খুবই রিস্কি। পাঁয়ের পদস্খলনে জীবনের পদস্খলন ঘটাও সেখানে খুবই সাভাবিক। আব্দুল্লাহ, ওবাইদুল্লাহ, এনামুল ও সুলাইমানরা ততক্ষণে সেই ডেঞ্জারাস পয়েন্ট পেড়িয়ে শীর্ষে উঠে গেছে। একধরনের বিজয়ী চিৎকার কানে আসছে। উপরে চেয়ে দেখলাম তাদেরকে অনেক ছোটই দেখাচ্ছে।

-বজলুর রশীদ

চলবে....

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন