রঙিন পোশাকের পেছনে সাদা-কালো জীবন

প্রকাশিত: ১৭ জুন, ২০১৬ ০৬:৩৩:৫৪

দোকানে দোকানে মেশিনের খটখট; কাপড়ে কাপড়ে রঙের বাহার; জরি, চুমকির ছড়াছড়ি।

দর্জিবাড়ির এসব ‘কারখানা’ থেকেই বন্দরনগরীর বিপণি বিতান আর নামি-দামি টেইলার্সের দোকানে পৌঁছে যাবে ঝলমলে নতুন পোশাক; জমে উঠবে ঈদ। আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার চোখে-মুখে খেলে যাবে খুশির ঝিলিক।

অবশ্য তাতে খলিফাদের সাদা-কালো জীবন আলোকিত হবে না খুব একটা। আনন্দের এ কারিগরদের কাছে কখনো কখনো ঈদের আনন্দ মানে ভবিষ্যতের দেনার দায়।   

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের মো. সোলাইমান চট্টগ্রামের খলিফাপট্টিতে দর্জির কাজ করছেন গত বিশ বছর ধরে। ঈদে বাড়ি ফেরার মত গাড়ি ভাড়া আর বাজার সদাইয়ের খরচ মেটানোর পর ছেলেমেয়েদের জন্য নতুন জামা কেনার টাকা থাকবে কি না- তা তিনি এখনও জানেন না।

সোলাইমান জানালেন, পট্টির অধিকাংশ দর্জি বা তাদের সহকারীদের মজুরি মেলে কাজের ভিত্তিতে। কেউ কেউ মাস গেলে বাঁধা বেতন পেলেও টাকার অংকে তা সামান্য।  

 

স্বাভাবিকভাবেই ঈদে কাজের চাপ বাড়ে; দিন-রাত খেটে বানিয়ে দিতে হয় জামা। সেজন্য ওভার টাইম বলে কিছু নেই খলিফাপট্টিতে।

 

নেই ঈদ বোনাসও। ব্যবসা ভালো হলে মালিক কখনও বখশিশ দেন। তবে সেটা একান্ত তারই মর্জি।  

আর এ কারণে ঈদের মত উৎসব এলে পরিবারের জন্য বাড়তি খরচ করতে গিয়ে খলিফাদের পা দিতে হয় মালিকের কাছ থেকে আগাম নেওয়ার ফাঁদে।

“এমনিতেই তো মজুরি কম। ঈদ বোনাসও দেয় না। সেই জন্য মালিকের কাছ থেকে অগ্রিম নিতে হয়। পরে ওই টাকা শোধ করতে হয় কাজ করে। আমাদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে যায়,” বলেন সোলাইমান।

খলিফাপট্টির সেলিম গার্মেন্টের এই কর্মী বলেন, বিপণি বিতানে ঝলমলে পোশাকের ‘গলাকাটা’ দাম নেওয়া হলেও সেগুলো বানানোর জন্য্য তারা নামমাত্র মজুরি পান।

“এক ডজন ফ্রক সেলাইয়ের জন্য পাই চারশ টাকা। তার উপর থাকে না বিদ্যুৎ। সময় মতো কাজ শেষ করতে পারি নাই বলে গত মাসে রুজি কম হইছে।”

আনন্দের বদলে ঈদ সোলাইমানের জন্য নিয়ে এসেছে বাড়তি দুশ্চিন্তা।

“স্ত্রী-সন্তানের জন্য নতুন কাপড় না হোক, সেমাই-চিনিতো কিনতে হবে। সেটাই কীভাবে করব বুঝতে পারছি না।”

শেষ পর্যন্ত আবারও মালিকের কাছ থেকে অগ্রিম নেওয়ার কথা ভাবতে হচ্ছে বলে জানালেন এই দর্জি।

পট্টির পাঁচশ ছোট-বড় দোকানের কয়েক হাজার কারিগরের জীবন সোলাইমানের মতোই সাদা-কালো; অভাব, অগ্রিম আর অসহায়ত্বের ফ্রেমে বন্দি।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর আইয়ুব আলী সওদাগর নামের এক দর্জিসহ কয়েকজন কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে এসে সেলাইয়ের কাজ শুরু করেন। ধীরে ধীরে ওই এলাকার নামই হয়ে ওঠে খলিফাপট্টি। 

ঈদ এলে গলির পাশে সারি সারি দোকানে দিনরাত কাজ চলে। এখানকার পোশাক দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয় বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান।   চল্লিশ বছর ধরে কাজ করছেন এমন কারিগর যেমন এই পট্টিতে আছেন, তেমনি আছে বালক বয়সী অনেকে, যাদের বলা হচ্ছে শিক্ষানবীস। দশ বছর বয়সী রিয়াদ তেমনই একজন।

 

অটোরিকশা চালক বাবার আয়ে সংসার চলে না বলে বছরখানেক আগে রিয়াদকে সেলাই শিখতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় খলিফা পট্টিতে। তাতে কাজ শেখার পাশাপাশি অল্প কিছু আয়ের ব্যবস্থা হয়েছে তার পরিবারের।

রিয়াদের স্বপ্ন, কিছু টাকা জমলে আবারও সে স্কুলে যাবে; তবে কাজ শেখা বন্ধ করবে না।

“কাজ শিখা একদিন নিজেই কারখানার মালিক হমু। ভাই-বোন নিয়া আর অভাবে থাকতে হইবে না।”

তবে বেশিরভাগেরই এই স্বপ্ন পূরণ হয় না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বল্প মজুরি আর দাদনের ‘দুষ্ট চক্রে’ জড়িয়ে পড়ে তাদের জীবন।

“অগ্রিম নিলে কারিগরার পরে সেই মালিকের কাছে কাজ করতে বাধ্য। এ সুযোগে মালিকরাও কম মজুরি দেয়, বেতন আটকে রাখে,” বলেন মাস্টার পদে কাজ করা মো. ইসমাঈল।যখন থেকে কাজ করছেন তখন থেকেই ‘এ চক্র’ দেখে আসার কথা জানিয়ে তিনি বরেন, “কেউ বের হতে পারে না, এভাবেই চলে।” 

 

এবার ঈদেও কাজ অনুযায়ী আয় হবে না বলে ‘শঙ্কা’ প্রকাশ করলেন দর্জি ওমর ফারুক।

“এ বছর আমাদের দোকানে কাজ কম। দিনে-রাতে পাঁচ-ছয়বার বিদ্যুৎ যায়। সব মিলিয়ে আমরা খুব একটা ভাল নেই।”

দর্জির কাজে থাকা তারেক জানালেন, মাসে পাঁচ হাজার টাকা বেতনে কাপড় সেলাই করেন তিনি। ঈদের বাড়তি কাজের জন্য কোনো ওভারটাইম নেই তাদের।

“ঈদের সময় মালিকদের ইচ্ছে হলে পাঁচ-ছয়শ টাকা বোনাস দেয়। নইলে দেয় না। এইভাবে তো দশ বছর গেল।”

মালিকদের দাবি, দোকানের আয় না বাড়ায় খলিফাদের মজুরি বাড়াতে পারছেন না তারা।

খলিফাপট্টি বণিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো হুমায়ুন কবির বলেন, “আয় বেশি হলে কর্মীদের বেশি মজুরি দেওয়া যেত। বিদ্যুতের সমস্যা আর বাজারে প্রতিযোগিতা বেশি। সব মিলিয়ে আমাদের কারখানাগুলো চাপে আছে।”

তবে ঈদের শেষ কয়েক দিনে ‘ব্যবসা বাড়বে’ বলে আশা এই ব্যবসায়ী নেতার। তখন খলিফাদেরও মজুরির বাইরে ‘কিছু টাকা’ দিতে পারবেন বলে তিনি আশা করছেন। 

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন