শেখ মো: আবু নোমান রনি

বিভক্তি নয় ঐক্য : প্রসঙ্গ জাতীয়তা

প্রকাশিত: ২৬ মে, ২০১৬ ০৫:১২:০৮

১.

আপনি বাঙালি নাকি মুসলিম? এদেশে বহূল প্রচলিত এক প্রশ্ন। যে প্রশ্নের চূড়ান্ত লক্ষ্য কোন সমাধানে পৌঁছানো নয়, বরং বিভ্রান্তির গোলকধাঁধাঁয় ফেলে একটি জাতিকে আটকে রাখা, আত্মপরিচয়ের সংকটে ফেলে পশ্চাদপদতার ঘূর্ণাবর্তে বেঁধে রাখা।

“আপনি ইংরেজ না খ্রীষ্টান”, “আপনি আরবীয় না মুসলিম ?”, “আপনি চিনা না বৌদ্ধ ?, “আপনি ভারতীয় না সনাতনী ?” পৃথিবীর কোন জাতিকে এমন প্রশ্ন করা হয় বলে জানা যায় না। ভৌগলিকতার ভিত্তিতে পৃথিবীতে নানা জাতি-উপজাতি রয়েছে, আবার সেসব জাতির বিশ্বাসেরও নানান বৈচিত্র রয়েছে। তাই বলে কাউকে বলতে শোনা যায় না “আপনি মোঘল, পাঠান, পাঞ্জাবী নাকি মুসলিম?” “আপনি তুর্কি, পার্সি, ইরানি নাকি মুসলিম?” মজার বিষয় হল বাঙালিদের-ই কেবল প্রশ্ন করা হয় “তুমি বাঙালি নাকি মুসলিম? আরও অবাক করা বিষয় হল প্রশ্ন পেয়েই বাঙালি সম্প্রদায় প্রশ্নের যৌক্তিকতা না ভেবেই সাথে সাথে প্রশ্নের উত্তর (?) নিয়ে তাদের পাণ্ডিত্য জাহির করা শুরু করেন; আর জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় দেশটাকে বিষিয়ে তোলেন। অন্য কোন জাতির জন্য যে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দরকার হয়না বাঙালি জাতি সেই প্রশ্ন করার কারণ নিয়ে ভেবেও দেখে না। তারা প্রশ্ন পেয়েই উত্তরের খোঁজ শুরু করেন, এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন করেন না । অনেকটা চিলে কান নেওয়ার মত। কানে হাত না দিয়ে চিলের পিছনে ছোটা আর কী! অনেকে জাতীয়তার ব্যবচ্ছেদ করে করে জাতির বিভাজনকে ত্বরান্বিত করে গর্ববোধ করেন। নিজেদের বোকামীর খোঁজ্ও রাখেন না।

নৃতাত্ত্বিকভাবে বাঙালির জাতিগত মৌলিকত্ব বলে কিছু নেই। এটা ঐতিহাসিক সত্য। এ সত্যের বাইরে গিয়ে আমাদের অন্য কোন চিন্তা করার সুযোগ নেই। বাঙালি জাতি সংকর জাতি- একই সাথে জাতিগত  এবং বিশ্বাসগত ।

    এই অঞ্চলের অধিবাসীদের ভৌগোলিক বা উৎপত্তিগত যে জাতীয়তা তা মৌলিক নয়। প্রমাণের ভিত্তিতে রচিত ইতিহাস থেকে জানা যায়, বাঙালি জাতির সাথে বিভিন্ন জাতির মিশ্রণ ঘটেছে বহুবার, বহুভাবে। খ্রীষ্টপূর্ব সময়ে আর্য সম্প্রদায় থেকে শুরু করে হূন, শক, দ্রাবিড় প্রভৃতি জাতি, পরবর্তীতে মোগল, পাঠান, তুর্কি প্রভৃতি জাতি এবং সর্বশেষ ইংরেজ, ফরাসি, পর্তুগীজ, ওলন্দাজ জাতির মিশ্রণ ঘটেছে বাঙালির রক্তে। তিন হাজার বছর বা তার্ বেশি সময় পূর্বে এ অঞ্চলে যে জাতির বসবাস ছিল, আর বর্তমানে যে বাঙালি জাতি রয়েছে নিশ্চয়ই তারা এক নয়। হাজার বছরের ইতিহাসে ঘটেছে নানা পর্যায়ভেদ। যুগে যুগে নানা জাতি ও উপজাতির সংস্পর্শে এসে বাঙালি পেয়েছে এক বৈচিত্রময় নৃতাত্বিক গড়ন। এই সব নানা বৈচিত্রের বৈশিষ্ট্য নিয়েই বাঙ্গালি জাতি। এসব অস্বীকার করার কোন যৌক্তিকতা নেই, প্রয়োজনও নেই।

কালের পরিক্রমায় এ অঞ্চলের অধিবাসী বাঙালিদের ধর্ম বিশ্বাসেও নানা বিবর্তন ঘটেছে। নদী-মাতৃক এ অঞ্চলে প্রথম পর্যায়ে কোন মনীষী বিশেষ কোন ধর্ম  প্সরচার করেছিলেন কী না তা জানা যায় না। তবে মুসলিম অনেক গবেষকের মতে হযরত নুহ আ: এর সময়কালে যে প্লাবন হয়েছিল তার পরবর্তি সময়ে তার-ই সুযোগ্য পুত্র ’বঙ’ এ অঞ্চলে এসছিলেন। বঙ্গ বা বাংলা নামকরণ নুহপুত্র বঙ থেকে হয়েছে বলে তারা দাবী করেন। আধুনিক গবেষকদের মতেেএ অঞ্চলে সর্বপ্রথম প্রকৃতি-নিয়ন্ত্রিত ‘লৌকিক ধর্মে’র প্রচলন ঘটে। পরবর্তীতে বাঙালি জাতি বিভিন্ন সুফি-সিদ্ধ পুরুষের প্রচারিত নানা আদর্শ ও বিশ্বাস গ্রহণ করে। প্রামাণিক ইতিহাস থেকে জানা যায়, খ্রিষ্টীয় সনের প্রথম দিকে বাঙালি জাতির উপর বৌদ্ধ ধর্মের নিরঙ্কুশ প্রভাব ছিল। বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদ রচিত হয়েছে ‘বৌদ্ধ সহজিয়া সাধুদের দ্বারা। পরবর্তীতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক নানা কারনে বাংলার বৌদ্ধ সমাজের একটা বড় অংশ হিন্দু সনাতনী বিশ্বাসে ধর্মান্তরিত হয়। প্রায় একই কারণে কয়েক শতাব্দী পরে এ অঞ্চলের বাঙালিরা হিন্দু ধর্ম থেকে মুসলিম ধর্মে রুপান্তরিত হয়। বৌদ্ধদের নির্যাতন এবং হিন্দুদের বর্ণ-প্রথার নিপীড়ন মূলক ধর্ম-ব্যবস্থার বিপরীতে তুলনামূলক উদার ও সাম্যবাদী ধর্ম হিসেবে বাংলা-অঞ্চলে ইসলামের দ্রুত বিস্তার ঘটতে থাকে। পলাশির প্রান্তরে বাংলার স্বাধীন শেষ নবাব সিরাজুদ্দৌলার পতনের পর ইংরেজ বেনিয়াদের পৃষ্ঠপোষকতায় চলে খ্রীষ্টান ধর্মে দিক্ষিত করার মিশনারী কাজ। তবে ইংরেজ জাতি এ প্রচেষ্টায় খুব অল্পই সফল হতে পারে।

            হাজার বছরের বিশ্বাসগত ও জাতিগত নানা মিশ্রণের পরে একবিংশ শতকের দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাভাষী যে মানব জাতি তাকেই আমরা বাঙালি বলে চিন্হিত করি। হিন্দু সনাতনী ধর্ম আর মুসলিম ধর্ম এ অঞ্চলের দুটি প্রধান ধর্ম-বিশ্বাস। বাঙালি জাতির বিবেচনায় এ দুটি ধারার মধ্যে মুসলিমেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং তাদের অধিকাংশের বসবাস বর্তমান বাংলাদেশে। আবার বাংলাদেশের হিসেবে বিবেচনা করলে এদেশে ধর্ম বিশ্বাসের দিক থেকে মুসলিম জাতীয়তাবোধ-ই প্রধান ও প্রবল।

২.

১৯৭১ সালের স্বাধীনতার মাধ্যমে বাংলাদেশ নামে যে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র জন্মলাভ করেছে সে রাষ্ট্রের বিবেচনায় এদেশের জনগোষ্ঠী ভাষা-বিচারে প্রধানত বাঙালি এবং বিশ্বাসগতভাবে প্রধানত মুসলিম। আর তাই যে কোন বিবেচনায় এ দুটি উপাদানের গুরুত্ব অপরিসীম। যে কোন একটিকে বাদ দিয়ে অথবা কম প্রাধান্য দিয়ে বিবেচনা করা হবে আত্মঘাতী। এরকম প্রবণতায় ক্ষতি হবে বাংলাদেশের আর লাভবান হবে বাংলাদেশ-বিরোধী শক্তি।

বাংলাদেশের জাতীয়তার প্রশ্নে যারা বিভক্তি মূলক প্রশ্নের অবতারণা ঘটান তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী। তারা আর যাই হোক এদেশের শুভাকাংক্ষী নয়। এদের উপর সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। বাংলা ভাষা, বাঙালি জাতি, হিন্দু-মুসলিম বিশ্বাস এ জাতিগোষ্ঠীর অবিচ্ছেদ্য অংশ। এসব বিষয় আলাদা ভাবে বিবেচনা করার কোন সুযোগ নেই। এই উপাদানগুলোর কোন একটিকে আলাদা করে বিবেচনা করলে বাংলাদেশের জাতীয়তায় ভাঙ্গনের সৃষ্টি হবে । আর লাভবান হবে সুবিধাবাদী-সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী। ঐসব গোষ্ঠীকে চিন্হিত করে তাদেরকে প্রতিরোধ করার এখনই সময়। কেননা, জাতিগত প্রশ্নে দ্বিধান্বিত জাতি কখনো ঐক্যবদ্ধ থেকে উন্নতি লাভ করতে পারেনা। বাংলাদেশের পরে স্বাধীনতা পেয়েও পার্শ্ববর্তী অনেক রাষ্ট্র জাতিগত ঐক্যের মাধ্যমে যখন উন্নয়নের রোল মডেল হয় তখন আমাদের হাতড়ে বেড়াতে হয় বিতর্কিত এসব প্রশ্নের উত্তর। বারংবার ব্যবচ্ছেদ করতে হয় আমাদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের। আত্মবিনাশি চিন্তাকে দূরে রেখে আমাদের হতে হবে ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের প্রতীক। এই দ্বিধা ও বিভক্তি কাটিয়ে উঠতে পারলেই বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা কেউ রুখতে পারবেনা। আর যতদিন তা না পারব ততদিন আমাদের বিজয় থাকবে অনিশ্চিত এবং অধরা।

                          লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ