জীবনের পরিণতি

প্রকাশিত: ১১ জানুয়ারী, ২০২০ ০৫:১১:৩৭ || পরিবর্তিত: ১১ জানুয়ারী, ২০২০ ০৫:১১:৩৭

আব্দুস সামাদ সাহেব আমার প্রতিবেশী। বয়স ৮০ উর্ধ্বে। স্টক করার কারণে শারীরিকভাবে যথেষ্ট দুর্বল হয়ে পড়েছেন। লাঠি ভর করে হাঁটেন তিনি। খুব ধীরে ধীরে হাঁটতে পারেন। ঠিক যেন শিশুদের মত। শিশুরা যেমন প্রথম হাঁটা শিখলে পড়ে যায় যায় অবস্থা, সামাদ সাহেবেরও একই অবস্থা।

সেদিন তিনি রাস্তা পার হবেন। মাত্র ৮ ফুট চওড়া একটি রাস্তা। দ্-ুএকটা রিক্সা চলে রাস্তা দিয়ে। এদিক-সেদিক তাকিয়ে রাস্তা পার হওয়া শুরু করেন। কিন্তু  তার চলার গতি এত মন্থর  যে আধা কিলোমিটার দূরের রিক্সাও রাস্তা পার হতে হতে তার কাছে চলে আসবে। তাই হলো। সামাদ সাহেব রাস্তার মাঝে কিন্তু রিক্সা চলে এলো। এনেকেই ভাবছে এখন কী হবে? যাহোক রিক্সাগুলো পাশ কাটিয়ে চলে গেল। সামাদ সাহেব রাস্তা পার হলেন।


কোন একটি সরকারী কলেজে অফিসিয়াল কোন পদে চাকরি করতেন তিনি। কলেজের দূরত্ব বাসা থেকে ৪-৫ কিলোমিটার হবে। এখন তিনি অবসরে  আছেন। বেতন বেশি পেতেন না। তারপরও চার সদস্য বিশিষ্ট সংসার ভালোই চলতো। যেহেতু কম বেতনে চাকরি করতেন তাই বাসা থেকে প্রতিদিনই হেঁটে গিয়ে অফিস করতেন তিনি।

বিভিন্নভাবে  সংসারের খরচ বাঁচিয়ে কিছু টাকা জমিয়ে কামরাঙ্গীরচরে কিছু জায়গা কিনলেন। ইতিমধ্যে বড় ছেলের লেখাপড়া শেষ হয়। সে একটি প্রাইভেট ফার্মে চাকরি নেয়। ফলে সংসারে যথেষ্ট সচ্ছলতা আসে। আবার কিছু টাকা জমিয়ে তার কেনা জায়গায় ঘর তুলে। সেখানে তারা বসবাস করতে থাকে এবং কয়েকটা রুম ভাড়া দেয়।

বড় ছেলেটি বিয়ের উপযুক্ত হওয়ায় তাকে বিয়ে করানো হয়। যথেষ্ট আর্থিক সচ্ছলতা থাকার পরও তাদের ঘরে ঝগড়াঝাটি লেগেই থাকত। কারণ আমার জানা নেই। যদিও এটা তাদের একান্তই পারিবারিক ব্যাপার তারপরও একদিন তাদের কাজের ছেলেটির কাছে ঝগড়ার কারণ জানতে চাইলে সে আমাকে অবাক হওয়ার মত উত্তর দিল। সে আমাকে জানালো, ওনারা নাকি গল্প করে। সেটাই ঝগড়ার মত মনে হয়। উত্তরটা শুনে যথেষ্ট হাসি পেল।

ইতোমধ্যে ছোট ছেলেরও পড়া-লেখা শেষ হয়। সেও একটি প্রাইভেট ফার্মে চাকরি নিল। ছোট ছেলেকেও বিয়ে করালেন। উভয় ছেলের ঘরেই নতুন মেহমানের আগমন ঘটলো। প্রাকৃতিক নিয়মনুসারে উভয় ছেলের সংসার আলাদা করে দিলেন। আব্দুস সামাদ সাহেব রিটায়ার্ডে চলে আসলেন। বাড়িটা অর্ধেক করে দুই ছেলেকে ভাগ করে দিলেন। সে নিজে ভাগের বাবায় পরিণত হলেন। মাসের ১৫ দিন এক ছেলের ঘরে এবং বাকী ১৫ দিন অন্য ছেলের ঘরে থাকতে লাগলেন।

এখন আর আগের মত গল্প হয়না। ছোট ছেলে ভালো বেতনে চাকরি করেন। সে তার ভাগের অংশে ছয় তলা ভবন তৈরি করল। আর বড় ছেলের বেতন একটু কম। তাই সে করেছে তিন তলা ভবন।

আব্দুস সামাদ সাহেব এখন বের হতে ভয় পান। প্রাকৃতিক প্রয়োজন ছাড়া তার আর কোন কাজ নেই। না আছে বাজার আর না আছে অফিস। শুধু জুমার নামাজ পড়ার জন্য কেউ হয়ত ধরে নিয়ে যায় মসজিদে। ঠিক ছোট বাচ্চাদের মতো। তারা যেমন বাবার হাত ধরে মসজিদে যায় তেমনি তিনিও কারো হাত ধরে মসজিদে যান। আব্দুস সামাদ সাহেবের এখন শুধু মৃত্যুর জন্য প্রতিক্ষা। কখন আসবে যমদূত আর মিলিত হবে পরমপ্রভূর সাথে। এটাই তো জীবনের পরিণতি।

মিনহাজ ভূঁইয়া

প্রাবন্ধিক

প্রজন্মনিউজ২৪/ সজীব

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন





ব্রেকিং নিউজ