চীন-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধ

প্রকাশিত: ০১ জানুয়ারী, ২০২০ ০১:০১:১৩ || পরিবর্তিত: ০১ জানুয়ারী, ২০২০ ০১:০১:১৩

দ্বিতীয় পর্বঃ একবিংশ শতাব্দীর উদীয়মান শক্তি চীন। IMF (International Monetary Fund-আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল) পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন। গত কয়েক দশকে বিশ্বে চীন একটি অর্থনৈতিক বিস্ময়ে পরিণত হয়েছে। ১৯৭৯ সালের পর থেকে বাণিজ্যিক উদারনীতির (Trade Liberalization) ফলেই চীনের এই বিস্ময়কর অবস্থানে আসা সম্ভব হয়েছে। বিশ্বব্যাংক চীনকে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল দেশ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন , “The fastest sustained expansion by a major History in country.”

যদি আমরা World GDP (Growth Domestic Product/ মোট দেশজ উৎপাদন-একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কোন দেশের বা অঞ্চলের ভেতরে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার মোট বাজার মূল্যকে বোঝায় , যা ঐ দেশ বা অঞ্চলটির অর্থনৈতিক আকার নির্দেশ করে)by country এর দিকে লক্ষ্য করি তবে দেখতে পাব চীন ১৯৯০ সাল পর্যন্ত জিডিপির দিক দিয়ে টপ-১০ এর তালিকায় ছিল না। ধীরে ধীরে ২০০০ সালের দিকে এসে চীন ৬ষ্ঠ অবস্থানে পৌঁছে যায়। ২০১১ সালে বিশ্বকে চমক লাগিয়ে চীন পৌছে যায় দ্বিতীয় অবস্থানে। কিন্তু তা ছিল আমেরিকার জিডিপির তুলনায় এক-তৃতীয়াংশেরও কম। ধীরে ধীরে এটি বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে দাড়িয়েছে ১,৪১,৪০,১৬৩ মিলিয়ন ডলারে। অপরদিকে আমেরিকার জিডিপি বতর্মানে ২,১৪,৩৯,৪৫৩ মিলিয়ন ডলার। এভাবেই দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে চীন। যা আমেরিকার জন্য হুমকিস্বরূপ।

চীন তার মহাপরিকল্পনা দ্বারা ভবিষ্যতেও বিশ্বমঞ্চে একক পরাশক্তি হওয়ার প্রয়াস চালাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় চীন হাতে নিয়েছে ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ পলিসি (বর্তমানে BRI-Belt and Road Initiative) । যা বাস্তবায়িত হলে চীন বিশ্বে সবচেয়ে বড় বাজার গড়ে তুলতে পারবে। ২০৪৯ সালে গণচীনের শতবর্ষ উৎযাপন উপলক্ষ্যে এই সময়ের মাঝেই তা বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা চীনের। একইভাবে Made in China-2025 policy নিয়েও দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে চীন। এই পলিসির উদ্দেশ্য হচ্ছে ২০২০ সালের মাঝে ৪০% ও ২০২৫ সালের মাঝে বিশ্ববাজারের ৭৫% পণ্যই থাকবে চীনের। যা অর্থনৈতিক দিক দিয়ে চীনকে একমাত্র পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। যার ফলে তাকে দমিয়ে রাখা এখন আমেরিকার অত্যাবশ্যক কাজে পরিণত হয়েছে। নতুবা আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাবে চীন।

বিখ্যাত ঐতিহাসিক ও দার্শনিক থুসিডিডিস (Thucydides) তার “ঐHistory of Pelloponnesian War" গ্রন্থে তৎকালীন গ্রীসের এথেন্স ও স্পার্টার যুদ্ধের কারন ও ঘটনা বর্ণনা করেন। স্পার্টা পূর্ব থেকেই একটি পরাশক্তি ছিল এবং এথেন্স নতুন একটি শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার ফলেই মূলত যুদ্ধ বাঁধে। Graham T. Allison  তাঁর “Destained of War" এই ঘটনাকে ‘থুসিডিডিসের ফাঁদ’ (Thucydides Trap) বলে আখ্যায়িত করেন। Allison বলেন, “যখন একটি উদীয়মান শক্তি অপর একটি প্রতিষ্ঠিত শক্তির জন্য হুমকিস্বরূপ হয় তখন সেই দুই শক্তির মাঝে যুদ্ধ অনিবার্য।” তেমনিভাবে চীন একটি উদীয়মান শক্তি হিসেবে আমেরিকার নিকট হুমকিস্বরূপ তাই এই দুই শক্তির মাঝেও যুদ্ধ অনিবার্য।

এখনকার যুদ্ধ ও যুদ্ধের কলাকৌশল আধুনিক। তা প্রাচীন যুগের মতো নয়। কারণ মানুষ অবগত হয়েছে অসী অপেক্ষা মসী অধিকতর শক্তিশালী। প্রাচীন ও মধ্যযুগে মানুষ সম্মুখ সমরে লড়াই করতো আর ব্যবহার করতো ঢাল, তলোয়ার, তীর-ধনুক, শূল, বর্শা, হাতি, ঘোড়া ইত্যাদি। আধুনিককালের শুরুর দিকে ষোড়শ শতকে পিস্তল আবিষ্কৃত হওয়ার পর ‘সম্মুখ সমর’ আরেকটু ভয়ানক দিকে মোড় নিল। ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের পর ধীরে ধীরে আবিষ্কৃত হতে লাগল আধুনিক সব যুুদ্ধাস্ত্র। ট্যাংক, মেশিনগান, রেলগান, যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ, ব্যালিস্টিক মিসাইল, আরো কত কী! আধুনিক এসব অস্ত্র মানুষকে আরো ভয়ানক দিকে ধাবিত করলো। ফলশ্রুতিতে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো ভয়ানক যুদ্ধও সংঘটিত হলো। ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যত মানুষ মারা গিয়েছে তা ১৭৯০-১৯১৩  (যেমনঃ ক্রিমিয়ার যুদ্ধ, নেপোলিয়ন যুদ্ধ) সালের যুদ্ধগুলো থেকেও দ্বিগুন। এরপর বলতে হয় পারমানবিক অস্ত্রের ভয়াবহতার কথা। ১৯৪৫ সালের ৬ই আগষ্ট জাপানের হিরোশিমায় ‘লিটল বয়’ এবং ৯ই আগষ্ট নাগাসাকিতে ‘ফ্যাটম্যান’ নামক পারমানবিক বোমা নিক্ষেপ করে আমেরিকা। এভাবেই পারমানবিক অস্ত্রের ভয়ানক থাবার শিকার হয় জাপান। যুদ্ধাস্ত্র যতই আধুনিক হলো, ভয়াবহতা ততই বেড়ে চলছিল।

সজীব হোসেন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

sojibhossendu@gmail.com

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন





ব্রেকিং নিউজ